নান্টু বলল, ফরহাদ ঘুমিয়ে পরেছিস?
ফরহাদ বলল, না।
নান্টু আগ্রহের সঙ্গে বলল, বিয়ের পর অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করবি।
কি রকম?
যেমন তোর ভাবীর কথাই ধর। সে মশারি ফেলে ঘুমুতে পারে না। মশা যদি তাকে খুবলে খেয়েও ফেলে সে মশারি ফেলবে না। মার কাছ থেকে ছেলেও এই অভ্যাস পেয়েছে।
অর্নবও মশারি ফেলে ঘুমুতে পারে না?
না। এদিকে সে আবার মশা ভয় পায়। মশাকে সে কি বলে জানিস?
কি বলে?
শিশা। ছোট বেলায় বলতো—এখনো বলে।
শিশা বলে কেন?
আর বলিস না। বাচ্চাদের সবই অদ্ভুত। অর্ণব নিঃশ্বাসকে কি বলে জানিস?
কি বলে?
নিঃশ্বাসকে বলে নিশ-নাশ। ইন্টারেস্টিং না?
অবশ্যই ইন্টারেস্টিং।
নান্টু বিছানায় উঠে বসে আগ্রহের সঙ্গে বলল, অর্ণবের মধ্যে একটা ব্যাপার দেখে আমি খুবই অবাক। কারো বিরুদ্ধেই তার কোন কমপ্লেইন নেই। ধর তুই তাকে অকারণে একটা আছাড় মারলি। সে কাঁদবে। কিন্তু কখনো কাউকে গিয়ে বলবে না–ফরহাদ চাচু আমাকে আছাড় মেরেছে। একবার কি হয়েছে শোন—অর্ণবকে বিছানায় নিয়ে শুয়েছি সে কাঁদছে। আমি যতই বলি কি হয়েছে। বাবা? সে উত্তর দেয় না—শুধু কাঁদে। শেষে অনেক আদর টাদর করার পর আঙ্গুল দিয়ে নিজের পা দেখালো। আমি তাকিয়ে দেখি গোবরে পোকার মত একটা পোকা তাকে কামড়াচ্ছে। বেচারা জানে একটা পোকা তাকে কামড়াচ্ছে কিন্তু সে বলবে না।
এটা কি ভাল?
ভাল নাতো বটেই? এটা হল তার স্বভাব। স্বভাবতো আর বদলানো যায় না। ছেলেটাকে নিয়ে আমি খুবই চিন্তায় থাকি। তাকে নিয়ে আজ তার মামা গেছে। ময়মনসিংহ। অর্ণবের যদি কোন অসুবিধা হয় সেতো তার মামাকে বলবে না। ধর সে পুকুরে গোসল করতে নামল তখন একটা কচ্ছপ তার আংগুল কামড়ে ধরল। সে কাঁদবে কিন্তু তার মামাকে বলবে না–কচ্ছপ আমাকে কামড়াচ্ছে। ফরহাদ সিগারেট খাবি?
না।
খা একটা সিগারেট। সিগারেট খেতে খেতে একটু গল্প করি।
আপনার মাথা ব্যথা কমেছে?
হ্যাঁ কমেছে। তুই বিয়ে করেছিস শুনে ভাল লাগছে বুঝলি—তখনই মাথা ব্যাথাটা হুস করে কমে গেল। নতুন সংসার শুরু করা খুবই আনন্দের ব্যাপার। রাতে বাসায় ফিরে যখন দেখবি তোর বউ ভাত না খেয়ে তোর জন্যে অপেক্ষা করে আছে—তখন কি যে ভাল লাগবে। আমার একটা ঘটনা বলি শোন। বিয়ের দশ দিনের দিন হঠাৎ স্কুল জীবনের এক ফ্রেণ্ডের সঙ্গে দেখা ইশতিয়াক। গল্প গুজব করতে করতে অনেক রাত করে ফেললাম। বাসায় ফিরলাম রাত দুটা দশে। দেখি তোর ভাবী না খেয়ে ভাত নিয়ে বসে আছে। এত আনন্দ হয়েছিল বুঝলি একেবারে চোখে পানি এসে গিয়েছিল। ফরহাদ।
জ্বি।
ঘুমিয়ে পর। বিয়ের টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা করিস না। ইনশাল্লাহ একটা কিছু ব্যবস্থা করে ফেলব।
জ্বি আচ্ছা।
আমার আবার ঘুম আসছে না। ছেলেটার জন্যে মনটা খারাপ লাগছে। নিজের একটা গাড়ি থাকতো হুট করে ময়মনসিংহ চলে যেতাম।
অর্ণবকে নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। মামার কাছে ও ভালই আছে।
ছেলেটা একেবারেই অন্য রকম হয়েছে। কি সুন্দর করে যে হাসে। হাসিটা একেবারে কলিজার মধ্যে গিয়ে লাগে। তুইতো বিয়ে করছিস। ছেলে মেয়ে হোক তখন বুঝবি ছেলেমেয়ের হাসি কি জিনিশ।
ফরহাদ ঘুমুতে পারছে না। বিছানাটা আরামদায়ক। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। সামান্য শীত শীত লাগছে। পায়ের কাছে চাদর আছে। চাদরটাও পরিষ্কার। নান্টুভাই একটা কোলবালিশও বের করে দিয়েছেন। ঘুমুবার জন্যে আয়োজন ভাল। কিন্তু ঘুম আসছে না। মাথা দপ দপ করছে। বিয়ের এই ঝামেলা হাতে নেয়া ঠিক হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। সংসারে নতুন একটা মানুষ নিয়ে আসার জন্যে অনেক প্রস্তুতি লাগে। তার কোন প্রস্তুতি নেই। আসমানী যে রাতে ঘুমুবে একটা ভাল বিছানা কি আছে? সুন্দর চাদর? দাদাজানের খাটটা সরাতে হবে? তিনি থাকবেন কোথায়? মঞ্জু তার ঘরে দাদাজানকে রাখবে না। রাগারাগি হৈ চৈ করবে। বুড়ো মানুষটা যাবে কোথায়? রাতে মশারি খাটাতে হবে—পুরানো মশারির কয়েক জায়গায় ফুটা আছে। সেফটিপিন দিয়ে ফুটা মেরামত করা হয়েছে তাতে মশা আটকায় না। গভীর রাতে মশার পিন পিন শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। আলসেমী লাগে বলে সে চোখ না মেলেই মটকা মেরে পড়ে থাকে। সামান্য রক্তইতো খাবে। খাক। খেয়ে শান্ত হোক। মশারা শান্ত হয় না। রক্ত খাবার পর তাদের নাচ গানের উৎসাহ আরও বাড়ে। তারা প্রবল উৎসাহে কানের কাছে উৎসব শুরু করে। ফরহাদ তখন চাদরে মুখ ঢেকে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। আসমানী নিশ্চয়ই এ রকম কিছু করবে না। সে বলবে, এই এত মশা ঢুকল কি করে। বাতি জ্বালাওতো মশা মারতে হবে।
সে হাই তুলতে তুলতে বলবে, বাতি জ্বালাতে পারব না। ঘুম চটে যাবে।
মশার কামড় খাব না-কি?
চাদরে মুখ ঢেকে শুয়ে থাক।
গরমের মধ্যে চাদরে মুখ ঢেকে শুয়ে থাকব কি? প্লীজ বাতিটা জ্বালাওতো। তোমার মত অলস মানুষ আমি দেখিনি।
তুমিতো আর অলস না। তুমি বাতি জ্বালাও।
আমি কি তোমার বাড়ি ঘর চিনি নাকি? সুইচটা কোথায়?
দরজার পাশে।
দরজাটা কোথায়?
সুইচের পাশে।
উফ কেন এত ফাজলামী করছ?
এই পর্যায়ে ফরহাদ বিছানা থেকে নামবে। সুইচ জ্বালাবে। দুজনে মিলে মশা মারবে এবং আসমানী বলবে—তুমি কি দয়া করে কাল একটা নতুন মশারি কিনবে? সে হাসি মুখে বলবে, না। আসমানী রাগী রাগী গলায় বলবে, কেন কিনবে না? টাকা নেই?
মশারি কেনার টাকা আছে তবে কিনব না।
