ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে বন্ধু আবার মিথিলার মল্লবীরকে দ্বৈরথ রণে আহ্বান জানাল। সেবারেও ওই মল্লযোদ্ধা অতি সহজেই আমার বন্ধুকে পরাস্ত করল। বার বার তিনবার পরাজিত হয়ে বিরস বদনে বন্ধুবর মল্লভূমির বাইরে এসে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী মল্ল- হ্যাঁ, হ্যাঁ, তার নামটিও এখন মনে পড়েছে হৈহয়! হ্যাঁ, হৈহয় নামে ওই বিজয়ী মল্ল আমার বন্ধুকে মিথিলার মল্লভূমিতে অবতীর্ণ হওয়ার আগে পর্যাপ্ত পরিমাণে মাতৃদুগ্ধ পান করে আসার পরামর্শ দিল। পূর্বেই আমার মনে ক্রোধের সঞ্চার হয়েছিল বন্ধুর প্রতি বিদ্রুপের উক্তি সেই ক্রোধের আগুনে ঘৃতাহুতি দিল;- দর্শকের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জানালাম আমিও শ্রাবস্তীর নাগরিক এবং প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে চাই। মধ্যস্থ অনুমতি দিতেই মল্লভূমিতে বাহ্বাস্ফোট করে সদম্ভে অবতীর্ণ হলাম। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী আমাকে আলিঙ্গনবদ্ধ করতেই দর্শকদের মধ্যে কয়েকজন বিদ্রূপ করে বলল, শ্রাবস্তীর মল্পের জন্য এইবার চিকিৎসককে আহ্বান জানাতে হবে। তুমুল অট্টহাস্য আর বিদ্রুপাত্মক ধ্বনিতে আমার মাথায় আগুন জ্বলতে লাগল, তার উপর আমার প্রতিদ্বন্দ্বী যখন আমার গ্রীবা আকর্ষণ করে সবলে পেষণ করতে শুরু করল, তখনই আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। দারুণ ক্রোধে দক্ষিণ কবপুট দিয়ে তরবারি চালানোর ভঙ্গিতে তার ঘাড়ে আঘাত করলাম। সেই আঘাতেই ঘাড় ভেঙে তার মৃত্যু হল।
কর্ণদেব সাগ্রহে প্রশ্ন করল, তারপর?
বল্লভ বলল, তারপর আর কি? ওইভাবে আঘাত করা মল্লযুদ্ধের নিয়ম-অনুসারে অন্যায় নয়। আমাকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করা হয়েছিল বিধিসম্মতভাবে। মৃত্যুকে দৈব-দুর্ঘটনা বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল।
পরন্তপ বলল, এটা তো দুর্ঘটনাই বটে। তুমি তো ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করনি।
শায়ন আর কর্ণদেবের সঙ্গে কখন যে পরন্তপ আর শশকও গল্পের আসরে শ্রোতার ভূমিকা গ্রহণ করেছিল তা লক্ষ করেনি বল্লভ; পরন্তপের কথা শুনে সে বুঝল অনেকক্ষণ ধরেই তার কাহিনি মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেছে পরন্তপ শশক মৌন থাকলেও তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তিতে শ্রোতার কৌতূহল ও উত্তেজনা অতিশয় স্পষ্ট।
ইচ্ছা করে হত্যা করিনি বটে, বল্লভ বলল, কিন্তু নিজের দৈহিক শক্তি সম্পর্কে সচেতন থাকায় জানতাম, ওইভাবে আঘাত করলে প্রতিদ্বন্দ্বীর মৃত্যুর সম্ভাবনা আছে। তা সত্ত্বেও মুহূর্তের উত্তেজনায় দুর্ঘটনা ঘটল। আমি মল্লযুদ্ধের সূক্ষ্ম কলাকৌশল ভালোবাসি, হত্যার পক্ষপাতী নই। পেশাদার মল্লযোদ্ধা অবশ্য অনেক সময় প্রতিযোগীকে হত্যা করতে ইতস্তত করে না।
শায়ন বলল, পেশাদার মল্ল না হলেও তুমি এক নির্দোষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করেছ। হ্যাঁ, এটাকে হত্যাই বলব- তুমি নিজমুখেই স্বীকার করেছে ওইভাবে আঘাত করলে মৃত্যু ঘটতে পারে সে কথা তোমার জানা ছিল।
বল্লভ বলল, এটাকে সঠিকভাবে হত্যা বলা যায় না, তবে আমি তো নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলছি না।
-তাহলে দোষ স্বীকার করছ?
–অস্বীকার তো করিনি।
–অপরাধ করেছ। তার জন্য দণ্ডগ্রহণ করাও তো উচিত। তাই না বল্লভ?
বল্লভ সবিস্ময়ে বলল, তুমি কি বলছ শায়ন? বহুদিন আগের অনিচ্ছাকৃত এক অপরাধের জন্য আজ দণ্ডগ্রহণ করব?
বহুদিন ধরে কোনো অপরাধী যদি আইনকে ফাঁকি দেয়, তবে তার অপরাধের মাত্রা লঘু হয় না, শায়নের অস্বাভাবিক কণ্ঠস্বর সকলকে চমকিত করল, তার দুই চোখে জ্বলে উঠল অবরুদ্ধ রোষের হিংস্র দীপ্তি, বল্লভ! হৈহয়ের মৃত্যু-সংবাদ পেয়ে আমি শিশুর মতো ক্রন্দন করেছিলাম। ভেবেছিলাম, মল্লক্রীড়া করতে গিয়ে দৈবাৎ আঘাত পেয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তাকে যে হত্যা করা হয়েছে তা জানা ছিল না।
বল্লভ বিল স্বরে বলল, তুমি হৈহয়কে জানো? সে তোমার পরিচিত?
উত্তর এল, হৈহয় আমার ভাই। সহোদর নয়, মাতুলপুত্র।
গুহার মধ্যে নেমে এল অসনীয় স্তব্ধতা। কিছুক্ষণ পরে স্তব্ধতা ভঙ্গ করে জাগল শায়নের ভয়াবহ কণ্ঠস্বর, আমার শৈশব অতিবাহিত হয়েছে মাতুলালয়ে। বাল্যকালে হৈহয় ছিল আমার সর্বাপেক্ষা প্রিয় সঙ্গী। বল্লভ! তাকে তুমি হত্যা করেছ! আমি তোমাকে নিষ্কৃতি দেব না।
বল্লভ বলল, তুমি অনর্থক উত্তেজিত হচ্ছ। শায়ন! এটা দৈব দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়।
একটি দুর্ঘটনা আর একটি দুর্ঘটনার কারণ হবে, উপবিষ্ট অবস্থা থেকে দণ্ডায়মান হয়ে ভয়ঙ্কর স্বরে শায়ন বলল, বল্লভ! মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও।
শায়ন তরবারিকে কোষমুক্ত করল।
একবার শায়নের দিকে তাকিয়ে বল্লভ অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নিল। তার দুই হাত আগের মতোই স্থির হয়ে রইল জানুর উপর।
অধীর স্বরে শায়ন বলল, অস্ত্র নাও, বল্লভ!
মৃদুগম্ভীর স্বরে বল্লভ বলল, শায়ন! আমি যুদ্ধ করব না। ইচ্ছা করলে তুমি আমাকে হত্যা করতে পার।
ক্রুদ্ধস্বরে শায়ন বলল, নিরস্ত্র মানুষকে বধ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
বল্লভ বলল, আমার পক্ষেও তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়।–
-বল্লভ! কুঠার গ্রহণ করো।
–শায়ন! আমার বক্তব্য তুমি শুনেছ।
-তুমি যদি যুদ্ধ করতে না রাজি হও, তাহলে অবশ্য আমি তোমায় হত্যা করতে পারব না, শায়ন এগিয়ে এল, কিন্তু এই অসি দ্বারা তোমাকে এমনভাবে চিহ্নিত করে দেব, যা চিরকাল তোমার মনে থাকবে।
