শায়ন বলল, এখনই!… এত তাড়া কিসের?
উত্তর না দিয়ে কয়েকটি মণি-মাণিক্য ও হীরক তুলে নিল পরন্তপ, তারপর বলল, তোমরা দেখে নাও। কর্ণদেব আর আমি আমাদের অংশ গ্রহণ করছি। আশা করি তোমাদের আপত্তি নেই?
শায়ন সবিস্ময়ে বলল, কয়েকটি রত্ন নিয়েই তোমরা সন্তুষ্ট? তোমাদের নায্য অংশের সিকি পরিমাণও তোমরা গ্রহণ করা নি!
কর্ণদেবও বিস্মিতচক্ষে পরন্তপের দিকে চাইল। সেদিকে তাকিয়ে শায়ন বলল, কর্ণদেব! কয়েকটি মাত্র রত্ন নিয়ে তুমি তোমার প্রাপ্য অংশের দাবি ছেড়ে দেবে?
কর্ণদেব বলল, পরন্তপের সিদ্ধান্তের উপর আমি কথা বলব না।
পরন্তপ বলল, আমরা অল্পেই সন্তুষ্ট। যা নিয়েছি এর বেশি আর কিছু চাই না।
শায়ন বলল, তিনটি সিন্ধুকের মধ্যে একটি শশককে দিতে তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অপর দুটি সিন্ধুকের যাবতীয় বস্তু বল্লভ আর আমার মধ্যে ভাগ হবে?
পরন্তপ বলল, হ্যাঁ। আমাদের অংশ আমরা বুঝে নিয়েছি। অবশিষ্ট অংশ তোমার ভাগ করে নাও।
বল্লভ ও শায়ন পরস্পরের মুখের দিকে চাইল। অর্থের প্রতি দস্যু পরন্তপের এমন তাচ্ছিল্য ও বীতরাগ দেখে তারা আশ্চর্য হয়ে গেল।
শায়নকে উদ্দেশ করে বল্লভ বলল, ওরা যদি স্বেচ্ছায় ওইটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট হয়, তাহলে আমাদের কি বলার আছে? আমরা তো ওদের বঞ্চিত করছি না। কি বলো, শায়ন?
শায়ন বলল, যথার্থ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিশাল এই গুরুভার সিন্দুক দুটিকে আমরা কখন এবং কি উপায়ে স্থানান্তরিত করব?
বল্লভ বলল, সেবিষয়ে চিন্তা করার সময় পাওয়া যাবে। আপাতত আমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম করতে চাই। প্রায় সপ্তাহকাল ধরে যে পরিশ্রম করেছি, তার তুলনা নেই। এখন কার্যসিদ্ধি হয়েছে। মনও দুশ্চিন্তামুক্ত- অতএব নিশ্চিন্তে বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারব। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হচ্ছে যে, অনার্য প্রহরীদের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়নি! সেরকম কিছু ঘটলে হয়তো আমরা নরহত্য করতে বাধ্য হতাম। নররক্তে হস্ত রঞ্জিত না করেও অভীষ্ট সিদ্ধ হয়েছে বলেই বিশেষ করে আনন্দলাভ করছি।
শায়ন বলল, যুদ্ধ করলেই একসময়ে নরহত্যা করতে হবে। তুমিও যোদ্ধা। অসি বা ধনুর্বাণ নিয়ে তুমি যুদ্ধ না করলেও তোমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই তোমার অস্ত্রস্বরূপ ব্যবহৃত হয় কারণ, তুমি মল্লযোদ্ধা। মল্লযুদ্ধও যুদ্ধ। বল্লভ! তুমি কি কখনও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করেনি?
অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে বল্লভ বলল, জীবনে একবারই আমার হাতে প্রতিদ্বন্দ্বীর মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু আমি তাকে হত্যা করতে চাইনি।
শায়ন সোৎসাহে বলল, আমি যুদ্ধ করতে ভালোবাসি, যুদ্ধ দেখতে ভালোবাসি, যুদ্ধের গল্প শুনতেও ভালোবাসি। যে যুদ্ধে দৈবক্রমে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীর মৃত্যু হয়েছে, সেই যুদ্ধের কাহিনি আমি শুনতে চাই।
কর্ণদেব বলল, আমিও বল্লভের কাহিনি শুনতে উৎসুক।
পরন্তপ ও শশক কোনো অভিমত প্রকাশ না করলেও তাদের চোখমুখের ভাবভঙ্গিতে স্পষ্টই বোঝা গেল গল্প শোনার আগ্রহ তাদেরও কিছু কম নয়।
তবে শোন, বল্লভ শুরু করল, বেশ কয়েক বৎসর আগে আমি যখন কর্ণদেবের মতো অল্প ব্যস্ক কিশোর, সেই সময় আমায় এক বন্ধু এসে জানাল মহারাজ প্রসেনজিতের রাজ্য মিথিলায় যোদ্ধাদের জন্য এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে– তরবারি, ভল্ল, ধনুর্বাণ প্রভৃতি অস্ত্রধারী যোদ্ধাদের মতো মল্লবীরগণও ওই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। আমি বরাবরই একটু অলস প্রকৃতির, তাই সহসা দেশভ্রমণে ইচ্ছুক হলাম না। অনিচ্ছার আরও একটা কারণ ছিল নিজের প্রচণ্ড দৈহিক শক্তি সম্পর্কে আমি অত্যন্ত সচেতন ছিলাম, উত্তেজনার বশে প্রতিদ্বন্দ্বী মল্লকে যদি মর্মান্তিক ভাবে আহত করে ফেলি, সেই ভয়ে ওই প্রতিযোগিতায় আমি কখনো অংশগ্রহণ করতাম না। কিন্তু বন্ধুর সনির্বন্ধ অনুরোধে শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে মিথিলায় গমন করলাম। তবে শর্ত ছিল- ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হব না। বন্ধু বলল আমাকে প্রতিযোগিতায় নামতে সে অনুরোধ করবে না, আমার সাহচর্য পেলেই সে খুশি। আমার শর্তে রাজি হওয়ায় তার সঙ্গী হতে আমি আপত্তি করলাম না এবং নির্দিষ্ট দিনে মিথিলার মল্লভূমিতে উপস্থিত হলাম…।
যথাসময়ে অন্যান্য প্রতিযোগিতার সঙ্গে মল্লযুদ্ধও শুরু হল।প্রতিদিনই বিভিন্ন রাজ্যের মল্লগণ ওই স্থানে মল্লযুদ্ধে ব্যাপৃত হয়ে বিভিন্ন ও বিচিত্র রণকৌশল প্রদর্শন করত। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী মল্লকে পুরস্কৃত করার ব্যবস্থাও ছিল। কয়েকদিন মল্লযুদ্ধ দেখার পর একদিন হঠাৎ আমার বন্ধু দর্শকের ভূমিকা ত্যাগ করে সক্রিয়ভাবে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করল।
বন্ধুর প্রতিদ্বন্দ্বী মিথিলার স্থানীয় অধিবাসী। তার বয়স অল্প, কিন্তু অভিজ্ঞতা অল্প ছিল না। উক্ত মল্পের দেহটি ছিল সত্যই দর্শনীয় কবাটবক্ষ, সিংহকটি, আজানুলম্বিত বিশাল বাহুর সমানুপাতে গঠিত কদলীবৃক্ষের ন্যায় স্কুল পেশীবদ্ধ দুই উরু অসাধারণ শক্তির পরিচায়ক। মল্লটি যে শুধু শক্তির অধিকারী ছিল তা নয়– তার রণকৌশলও অপূর্ব। বন্ধুর সঙ্গে মল্লযুদ্ধ শুরু হতে না হতেই উক্ত যোদ্ধা বন্ধুবরকে পরাস্ত করল। চারদিক থেকে ধিক্কার-ধ্বনি শোনা যেতে লাগল। আবার বন্ধু দ্বিতীয়বার মল্লভূমিতে অবতীর্ণ হল। কয়েকমুহূর্তের মধ্যেই অদ্ভুত কৌশলে তাকে পুনরায় পরাজিত করল মিথিলার মল্লযোদ্ধা। দর্শকরা সোল্লাসে বিদ্রূপ বর্ষণ করতে লাগল। প্রতিযোগিতায় নামলে প্রতিদ্বন্দ্বীরা কে কোন্ দেশের অধিবাসী সেকথা ঘোষণা করা হয়– দর্শকবৃন্দ ব্যঙ্গ করে বলতে লাগল শ্রাবস্তী রাজ্যের মল্লগণ যে অতিশয় দুর্বল এই ব্যক্তিকে দেখেই তা বোঝা যায়– মিথিলার মল্লভূমিতে অংশগ্রহণ করার উপযুক্ত তারা নয়।
