আপনের কথা বুঝলাম না।
মতিন বলল, বাঁদর থেকে মানুষ হবার পর এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। বাদর হয়ে যখন আমরা কিচকিচ করতাম তখন একজন আরেকজনের কথা বুঝতাম। মানুষ হয়ে ভাষা শেখার পর কেউ কারো কথা বুঝি না।
স্ট্যাম্প ভেন্ডর বিরক্ত চোখে তাকাচ্ছে। মতিন উঠে পড়ল। হঠাৎ মনে হলো, তার যাবার কোনো জায়গা নেই। যাদের যাবার কোনো জায়গা নেই তারা। কোথায় যায়? নৌকায় করে বুড়িগঙ্গায় কিছুক্ষণ হাওয়া খেলে কেমন হয়? বুড়িগঙ্গা তেমন দূরেও না।
ঘণ্টায় পঞ্চাশ টাকা হিসেবে মতিন একটা ছইওয়ালা নৌকা ভাড়া করে ফেলল। নৌকার মাঝি বুড়ো। ধবধবে সাদা দাড়ি। বাবড়ি চুল। চেহারায় কোথায় যেন রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ ভাব আছে। অনায়াসে কল্পনা করা যায় বুড়ো রবীন্দ্রনাথ তার সোনার তরী নিয়ে বুড়িগঙ্গায় ভেসে বেড়াচ্ছেন।
মতিন বলল, বুড়ো মিয়া, আপনার নাম কী?
কুদ্দুস।
আপনি নৌকা নিয়ে আশেপাশেই সামান্য ঘোরাঘুরি করবেন।
আর কেউ আছে আপনের সাথে? না-কি আপনি একলা?
আমি একলা।
অনেকেই মেয়েছেলে নিয়া নৌকায় উঠে। নৌকার পর্দা ফালায়া রঙ ঢঙ করে, এইজন্যে জিগাইলাম।
আপনের নৌকায় পর্দা আছে?
জি আছে।
দুই দিকেই পর্দা আছে। নৌকা ছাড়ব?
ছাড়েন।
নৌকা বুড়িগঙ্গার মাঝামাঝি আসতেই মাঝি বলল, আর কিছু লাগব?
মতিন অবাক হয়ে বলল, আর কিছু লাগব মানে কী?
বিয়ার আছে। টাইগার বিয়ার। দুইশ টেকা কইরা কৌটা। রাখতে হয়। অনেকেই চায়।
আর কী আছে?
পুরিয়া আছে। পঞ্চাশ টেকারটাও আছে, আবার একশ টেকারও আছে। সুই নাই।
ফেনসিডিল নিশ্চয়ই আছে?
আমার কাছে নাই। চাইলে আইন্যা দিতে পারব।
আপনি কখনো খেয়েছেন?
তওবা! আমি কেন খাব?
নিজে খাবেন না, অন্যকে খাওয়াবেন।
বুড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কেউ কাউরে কিছু খাওয়ায় না। প্রত্যেকে তার খানা নিজে খায়।
মতিন বলল, বালিশ আছে আপনের কাছে?
বালিশ দিয়া কী করবেন?
শুয়ে ঘুমাব। অনেক দিন পানির উপর ঘুমানো হয় না।
বুড়ো পাটাতনের নিচ থেকে বালিশ চাদর বের করে দিল। বালিশ চাদর দুটোই পরিষ্কার।
বুড়ো বলল, আপনের কিছুই লাগব না?
মতিন বলল, না।
একটা বিয়ার খাইয়া শুইতেন, আরামের ঘুম হইত। বিয়ার হইল ঘুমের ওষুধ। ঠাণ্ডা ছিল। বরফের বালতিতে রাখা।
মতিন বলল, এমনিতেই ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। ঘুমের ওষুধ লাগবে। কুদ্স ভাই শুনেন, ঘুমিয়ে পড়লে জাগাবেন না। আমার পরিকল্পনা একটা লম্বা ঘুম দেয়।
মতিনের ঘুম ভাঙল সন্ধ্যায়। নৌকা প্রবল দুলছে। শোঁ শোঁ বাতাস, মুষলধারে বৃষ্টি। নৌকা বুড়িগঙ্গার অন্যপাশে থেমে আছে। মাঝি কুদ্দুস ছইয়ের ভেতর বসা। সে কাঁপছে। মতিনকে উঠে বসতে দেখে সে বলল, এমন এক ঘুম আপনে দিছেন যার হিসাব নাই। একবার ভাবলাম লোকটার কি মৃত্যু হয়ে গেছে? দিনের অবস্থা দেখছেন? তুফান ছাড়ছে।
মতিন বলল, চা খেতে পারলে হতো।
কুদ্দুস বলল, চা নাই। বিয়ার আছে। বিয়ার দেই?
মতিন বলল, বিয়ার আরেক দিন এসে খাব। নৌকায় কতক্ষণ আছি বলেন তো?
সাড়ে চাইর ঘণ্টা। হেই পারে যাইতে লাগবে এক ঘণ্টা। পাঁচ ঘণ্টায় আপনে আমারে দিবেন আড়াই শ। দিনের যে অবস্থা পঞ্চাশ টেকা বখশিস ধইরা তিনশ টাকা মিল কইরা দিয়েন।
আচ্ছা। চলেন রওনা দেই।
কী পাগলের কথা কন! বাতাস কেমন ছাড়ছে দেখেন না! বাতাস কমুক। ভাইজান করেন কী?
আমি একজন কবি।
আপনের দেশের বাড়ি কোনখানে?
উজবেকিস্তান। পাহাড়ি অঞ্চল।
আপনেরে দেইখা মনে হয় বাঙালি।
মানুষ দেখে কি কিছু বুঝা যায় বুড়ো মিয়া? মানুষ দেখে কিছু বুঝা যায় না।
এইটা সত্য কথাই বলছেন, মানুষ দেইখা কিছু বুঝার উপায় নাই।
বাতাসের জোর আরো বেড়েছে। নৌকা টালমাটাল করছে। মতিন বলল, বুড়ো মিয়া, নৌকা ডুবে যাবে না তো?
কুদ্দুস চিন্তিত গলায় বলল, গতিক তো সুবিধার দেখি না।
নৌকার দুলুনির সঙ্গে মিলিয়ে কবিতা তৈরি করা যায় না?
নদ্দিউ নতিম সাহেব এই অবস্থায় কী করতেন? কবিতা তৈরির চেষ্টা নিশ্চয়ই করতেন।
দুলছে হাওয়া
দুলছে নদী
এখন যদি
তলিয়ে যায় জলে
অপূর্ব কৌশলে…
নৌকা এখন খাবি খাওয়ার মতো করছে। ছইয়ের এক অংশ খুলে গেছে। কুদ্দুস বলল, ভাইজান, শক্ত কইরা ধরেন, ছই উইড়া গেলে নৌকা ডুবব।
ছই উড়ে গেল না, কিন্তু নৌকা পানিতে কাত হয়ে ডুবে গেল। কাদায় পানিতে মাখামাখি হয়ে মতিন ডাঙ্গায় উঠল। কুদ্দুস বলল, দুই হাত দিয়া মাথা চাইপা ধরেন। শিলাবৃষ্টি হইতেছে।
অনেকক্ষণ ধরেই কলিংবেল বাজছে। বৃষ্টি এবং বাতাসের শব্দে কলিংবেলের রিনঝিন ঢাকা পড়ে গেছে। কলিংবেলের শব্দটাকে বৃষ্টির শব্দের অংশ বলে মনে হচ্ছে। তারপরেও কী মনে করে মৃন্ময়ী দরজা খুলল।
মতিন বলল, আপনি কি আমাকে চিনেছেন? আমার নাম মতিন।
মৃন্ময়ী বলল, আপনার এই অবস্থা কেন?
মতিন বলল, বুড়িগঙ্গায় নৌকাডুবি। সাঁতরে উঠেছি। সাঁতারটা শেখা না থাকলে আজ আমার খবর ছিল।
হাত মনে হয় কেটেছে। রক্ত পড়ছে। আসুন ভেতরে আসুন।
মতিন ভেতরে ঢুকল। মৃন্ময়ী বলল, বাবার একসেট কাপড় যদি দেই, আপনি পরবেন?
পরব।
সরাসরি বাথরুমে চলে যান। আমাদের গিজার ফিজার নেই। পানি গরম করে দিচ্ছি। সাবান ডলে ভালোমতো গোসল করুন! বাথরুমে নতুন সাবান আছে।
আমার গরম পানি লাগবে না।
লাগবে। আপনি শীতে থরথর করে কাঁপছেন। বাথরুমে ঢোকার আগে কি এককাপ গরম চা খাবেন? চায়ের পানি গরম আছে। আমি এক্ষুনি দিতে পারব।
দিন।
