নিশুর চোখের দৃষ্টি কঠিন, গলার স্বর কঠিন। মতিন রিকশা থেকে নেমে পড়ল।
নিশুর উকিলের নাম সোবাহান খন্দকার। ভদ্রলোক কুঁজো হয়ে হাঁটেন। সারাক্ষণ পান খান। কথা বলার সময় চোখ পিটপিট করেন। একসময় ভালো ক্রিমিন্যাল লইয়ার ছিলেন, এখন বাজার পড়ে গেছে।
সোবাহান খন্দকার নিশুকে বললেন, বারোটার দিকে মামলা উঠবে। টাকা এনেছেন?
নিশু বলল, টাকা তো কাল রাতে মতিন আপনাকে দিয়ে এসেছে।
সোবাহান খন্দকার বললেন, আমার টাকার কথা বলছি না। মামলা উঠবে। তার খরচ। মতিন সাহেব কোথায়? তাঁকে দরকার ছিল।
উনি আসতে পারেন নি। কী দরকার আমাকে বলুন।
টাকা লাগবে।
টাকা লাগবে সেটা তো একবার বলেছেন। কত টাকা লাগবে?
ভালো অ্যামাউন্টই লাগবে।
কেন ভালো অ্যামাউন্ট লাগবে বলুন?
আপনি মেয়েমানুষ, সবকিছু আপনার সঙ্গে ডিসকাস করা সম্ভব না।
নিশু বলল, মামলাটা আমার। এখন থেকে কোর্টে আমিই আসব। কথাবার্তা যা বলার আমার সঙ্গেই বলতে হবে। টাকা-পয়সার লেনদেন আমিই করব। কত দিতে হবে?
পাঁচ।
পাঁচ কি শ?
আরে না, হাজার।
এত টাকা কেন?
একটা কাগজের কপি বের করতে হবে। আপনার যে মেডিক্যাল অ্যাকজামিনেশন করা হয়েছে তার কপি।
কপি তো দেয়া আছে।
যেটা দেয়া আছে সেখানে কিছু সমস্যা আছে। আমাদের আরেকটা কপি লাগবে।
কী সমস্যা আমাকে বুঝিয়ে বলেন।
সোবাহান খন্দকার বিরক্ত হয়ে বললেন, এত কিছু আপনাকে বুঝাতে গেলে আমি আমার নিজের কাজটা কখন করব? বারোটার সময় মামলা উঠবে। এখন বাজে এগারোটা। আমার নিজের তো একটা প্রিপারেশন আছে। টাকাটা দিয়ে চুপ করে থাকেন। মামলা কোর্ট থেকে নামুক, যা বুঝবার তখন বুঝবেন।
নিশু বলল, এত টাকা তো সঙ্গে আনি নি।
কত এনেছেন?
তিন হাজার।
তিন হাজারই দিন। বাকি টাকাটা আমার পকেট থেকে দিয়ে দিচ্ছি। মতিন সাহেবকে দিয়ে বাকি দুই হাজার আজ সন্ধ্যায় আমার চেম্বারে পাঠিয়ে দিবেন। মামলায় রেজাল্ট পেতে হলে পয়সা খরচ করতে হবে।
মামলা উঠেছে। মামলার একনম্বর আসামিকে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে। সে তার নিজের বক্তব্য পাখি পড়ার মতো বলল।
প্রফেসর সাহেবের মেয়ে নিশু তার বাবার মৃত্যুর পর উচ্ছখল জীবনযাপন শুরু করে। তার ফ্ল্যাটে সন্ধ্যার পর নানান ধরনের পুরুষ মানুষের আনাগোনা। গান-বাজনা। উনি দরজা জানালা সন্ধ্যার পর সবসময় বন্ধ করে রাখেন।
একদিন আমি উনাকে বললাম, নিশু আপা, ভদ্র অঞ্চলে আপনি বাস করেন। আপনার পিতা ছিলেন একজন সম্মানীত শিক্ষক। আপনি এইসব কী শুরু করেছেন?
উনি আমার কথায় খুবই রেগে গেলেন। আমাকে দেখে নিবেন, পুলিশে দিবেন, হেনতেন নানান কথা। তাতে আমার একটু রাগ উঠে গেল। আমি খারাপভাবেই বললাম, ভদ্র পল্লীতে আপনি কীভাবে নারী ব্যবসা করেন আমি দেখে নেব।
এর কয়েকদিন পরের ঘটনা। উনার বাড়ি থেকে রাত দুইটার সময় এক স্যুট-টাই পরা ভদ্রলোক বের হয়েছে। মুখ দিয়ে মদের গন্ধ। ঠিকমতো পা ফেলতে পারে না এমন অবস্থা। আমি আমার দুই বন্ধুসহ তাকে আটকালাম। মেজাজ খুবই খারাপ ছিল। চড় থাপ্পড় দিয়ে বললাম, তোর ঘরে মা-বোন নাই?
এই ঘটনার পরে নিশু আপা আমার কাছে এসে আপোসের প্রস্তাব দিল। আমাকে দুপুরে তার বাসায় খানা খেতে বলল।
আমি একা না গিয়ে আমার দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিলাম। আমরা খাওয়া দাওয়া করলাম। উনার জোরাজুরিতে সেক্স ও করলাম। উনি যে আমাদের তিনজনকে ফাঁসাবার জন্যে এই নাটক করেছেন–এইটা জানতাম না। এর বেশি আমার কিছু বলার নাই।
কোর্ট অ্যাডজর্নড হয়ে গেল। সোবাহান খন্দকার কপালের ঘাম মুছতে মুছতে নিশুকে বললেন, জেরা শুরু হলে তার অবস্থা কী হবে সে চিন্তাও করতে পারছে না। মোরব্বা বানিয়ে ফেলব।
নিশু বলল, পারবেন?
সোবাহান খন্দকার উচ্ছাসের হাসি দিয়ে হঠাৎ গলা নামিয়ে বললেন, আসামিপক্ষ থেকে একটা আপোসের প্রস্তাব আছে। বিবেচনা করবেন কি-না দেখেন।
নিশু অবাক হয়ে বলল, কিসের আপোস?
মামলায় এ পর্যন্ত আপনার যা খরচ হয়েছে আসামিপক্ষ সব খরচ দিয়ে দিবে, আপনারা মামলা তুলে নিবেন।
আপনার কাছে প্রস্তাব দিয়েছে?
জি। সিদ্ধান্ত আপনাদের। আমার কাজ সব কিছু জানানো।
আপনার কি ধারণা আমাদের আপোসে যাওয়া উচিত? মামলার অবস্থা কী।
অবস্থা ভালো। কনভিকশন হবেই, তারপরেও…
তারপরেও কী?
আরেক দিন কথা বলি। আমি খুবই টায়ার্ড! মতিন সাহেবকে দিয়ে দুই হাজার টাকা পাঠিয়ে দেবেন।
মতিন হাঁটতে হাঁটতে কোর্টভবন পর্যন্ত চলে এলো। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করল কোর্ট এলাকায়। কোর্ট কাচারি করা লোকজন মনে হয় ডাবের ভক্ত। চারদিকে কাটা ডাবের ছড়াছড়ি। সে বিশ টাকায় একটা ডাব কিনে খেল। স্ট্যাম্পের এক ভেন্ডরের পাশের টুলে কিছুক্ষণ বসে রইল। তার কাছে কেন জানি শান্তি শান্তি লাগছে। যদিও শান্তি শান্তি লাগার কারণ স্পষ্ট না। শান্তির কারণ কি এই যে, নিশুর ঝামেলা আর তাকে নিতে হচ্ছে না? দুএকদিন পরেই নিশুর রাগ পড়ে যাবে, তখন মতিন আগের মতো মামলা মোকাদ্দমা নিয়ে ছোটাছুটি করতে পারবে–এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই। নিশু একবার যেটা বলবে। সেটাই।
স্ট্যাম্পের ভেন্ডর মতিনের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার কী কেইস?
মতিন বলল, রেপ কেইস।
আসামি আপনের কে হয়?
অতি দূরসম্পর্কের আত্মীয়। যখন আমরা মানুষ ছিলাম না, বাঁদর ছিলাম, তখন একই গাছের ডালে লাফালাফি করেছি।
