বড় একটা কাপ ভর্তি চা এনে মতিনের হাতে দিতে দিতে মৃন্ময়ী বলল, রাত কটা বাজে জানেন?
না।
এগারোটা দশ। রাতের খাবার নিশ্চয়ই খান নি?
না।
আমি খেয়ে নিয়েছি, আপনাকে একা খেতে হবে। আমার ধারণা একা ভাত খেয়ে আপনার অভ্যাস আছে।
জি অভ্যাস আছে। বাড়িতে লোকজন নেই?
আছে। আমার ছোটখালা আছেন। আমার এক মামাতো ভাই আছে। তারা শুয়ে পড়েছে। আপনার অস্বস্তি বোধ করার কোনো কারণ নেই। আপনি যে কোনো একদিন যে আসবেন তা আমি যেমন জানি অন্যরাও জানে।
তাহলে তো ভালোই।
আপনি বাবার অফিসে গিয়ে যেসব কাণ্ডকারখানা করেছেন, বাবা সব গল্পই আমার সঙ্গে করেছেন।
আমি তেমন কোনো কাণ্ডকারখানা করি নি।
করেছেন। বাবাকে বই উৎসর্গ করে এমন সব কথা লিখেছেন যে, তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন।
উনি কাঁদেন নি।
বাবা কাঁদলে তার চোখে পানি আসে না। তাঁর গলা খসখসে হয়ে যায়। আপনি এত বড় লেখক, কিন্তু আপনার Observation দুর্বল।
আমি বড় লেখক?
না, আপনি না। নদ্দিউ নতিম।
মতিন খেতে বসেছে। মৃন্ময়ী হাসিমুখে তার সামনে বসে আছে। মতিন বলল, আমি মনে হয় বিরাট এক ঝামেলায় ফেলে দিয়েছি।
কিছুটা তো ফেলেছেনই। হঠাৎ যদি ছোটখালার ঘুম ভাঙে, তিনি এই দৃশ্য দেখলে খাবি খাবেন।
মতিন বলল, হঠাৎ গভীর রাতে এই বাড়িতে উপস্থিত হলাম কেন জিজ্ঞেস করলেন না?
আপনি মানুষকে চমকে দিতে পছন্দ করেন এইজন্যেই কাজটা করেছেন।
মতিন বলল, ভুল বলেছেন। অনেকদিন আগে আপনার বাবা আমাকে তার মেয়ের জন্মদিনে আসার জন্যে দাওয়াত দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, একসঙ্গে রাতে খাওয়া-দাওয়া করবেন। সিমের বিচি দিয়ে গরুর মাংস রান্না হবে। আজ সেই দিন। আজ আপনার জন্মদিন না?
মৃন্ময়ী হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
মতিন তাকিয়ে আছে। নিজেকে সামলে নিতে মৃন্ময়ীর কতক্ষণ লাগে তা তার দেখার ইচ্ছা। কেউ কেউ মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলায়। যেমন–নিশু। আবার কেউ কেউ আছে একবার কাঁদতে শুরু করলে কাঁদতেই থাকে। যেমন–তৌহিদা। এই বিষয়ে কি গিনিজ বুকে রেকর্ডের ব্যবস্থা আছে? থাকলে তৌহিদা নিজের জায়গা করে নিতে পারত।
মৃন্ময়ী নিশুর মতোই দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, সরি। আপনার কথা চট করে মনের ভেতরে গিয়ে লাগল। আপনাকে যে বাবা নিমন্ত্রণ করেছিলেন সেটা আমাকে বলেছিলেন। সিমের বিচি দিয়ে গরুর মাংস রাঁধতেও বলেছিলেন।
কই আজ তো সিমের বিচি দিয়ে মাংস রান্না হয় নি!
মৃন্ময়ী চোখ মুছতে মুছতে বলল, এই রান্নাটা বাবার খুব পছন্দের। আমি ঠিক করেছি যতদিন বেঁচে থাকব এই জিনিস খাব না।
আমি হলে উল্টোটা করতাম, উনাকে মনে করার জন্যেই বেশি বেশি খেতাম।
একেক মানুষ একেক রকম। কেউ মতিন উদ্দিন আবার কেউ নদ্দিউ নতিম। ভালো কথা, বাবা আপনার বই পড়েছেন। অল্প কয়েক পৃষ্ঠাই বাকি ছিল।
কিছু কি বলেছেন?
বলেছেন, তাঁর হয়ে আমি যেন আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেই। আপনি খাওয়া শেষ করুন, আমি ঠিক বাবার মতো আপনার মাথায় হাত রাখব।
মতিনের মাথায় হাত রেখে মৃন্ময়ী আবারো ফুঁপিয়ে উঠল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, আমার মনটা স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে। একটু পর পর কাঁদি। আপনি কি আমার মনটা ঠিক করে দিতে পারবেন?
মতিন বলল, আমি পারব না। আমার এক বন্ধু আছে। জঙ্গলে থাকে, সে পারবে। যাবেন তার কাছে?
আপনি বললে যাব। আপনি কি যেতে বলছেন?
হ্যাঁ।
নিশু ব্যাগ গোছাচ্ছে
নিশু ব্যাগ গোছাচ্ছে। একটি গোছানো হয়েছে। অন্যটিতে বই তোলা হচ্ছে। গাদা গাদা বই সে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছিল, একটাও পড়া হয় নি। মনে হয় ইহজীবনে আর পড়া হবে না। একটু দূরে খাটে পা ঝুলিয়ে তৌহিদা বসে আছে। সে নিশুর ব্যাগ গোছানো দেখে অবাক হয়েছে, কিন্তু জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছে না। কোনো কারণ ছাড়াই সে নিশুকে ভয় পায়। একটি প্রচ্ছন্ন কারণ অবশ্যি আছে। নিশু ধমক দিয়ে তৌহিদাকে ওষুধ খাওয়ায়।
তৌহিদা ক্ষীণ গলায় বলল, ব্যাগ গোছান কী জন্যে?
নিশু বলল, আমি চলে যাচ্ছি এইজন্যে।
কোথায় যাবেন?
মহিলা হোস্টেলে সিট পেয়েছি। সেখানে চলে যাব।
আর আসবেন না?
দেখা সাক্ষাতের জন্যে আসতে পারি। থাকার জন্যে আসব না। এখন থেকে তুমি হাত-পা ছড়িয়ে একা তোমার ঘরে ঘুমাবে।
আপনার মামলা কি শেষ?
মামলা শেষ না। মামলা চলছে। চলতেই থাকবে। একদিন সব আসামি খালাস পাবে। হাসিমুখে বাড়ি চলে যাবে। আরেকটা মেয়েকে রেপ করবে।
তৌহিদা বলল, সেই মেয়েটার নাম কী?
নিশু তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকাল। তৌহিদা কয়েক দিন হলো মন দিয়ে কিছুই। শুনছে না। তার রোগটা কি আরো বেড়েছে? নিশু বলল, পরের মেয়েটার নাম তো আমি জানি না। যে-কেউ হতে পারে। তুমিও হতে পার।
তৌহিদা উঠে দাঁড়াল। নিশুর চলে যাওয়ার খবরটা বুবুকে দিতে হবে। নিশু বলল, তৌহিদা, তুমি কি আমাকে এককাপ চা খাওয়াতে পারবে?
দুধ চা?
হুঁ, দুধ চা। কড়া হয় যেন। চা খেতে খেতে তোমার সঙ্গেও কিছু কড়া কড়া কথা বলব।
সালেহা গম্ভীর মুখে তৌহিদার কাছ থেকে নিশুর চলে যাবার খবর শুনলেন। বিরক্তমুখে বললেন, কাউকে কিছু না বলে চলে যাচ্ছে। বিরাট নিমকহারাম মেয়ে। যাবার আগে আমার সঙ্গে যেন দেখা করে যায়। তার ব্যাগ চেকিং হবে। টাকাপয়সা গয়না-টয়না নিয়ে চলে যেতে পারে। এই ধরনের মেয়েদের কোনো বিশ্বাস নাই।
তৌহিদা ক্ষীণ স্বরে বলল, নিশু আপা সেইরকম মেয়ে না।
