আপনার ধারণা ঠিক আছে, আমি একজন ফাজিল লেখক।
আমার জন্যে বই এনেছেন, আমার নাম লিখে দেবেন না! লেখকের অটোগ্রাফসহ বই পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার।
ম্যাডাম, আপনার নাম লেখা আছে।
কই লক্ষ করি নি তো?
মুনা আগ্রহের সঙ্গে বই-এর পাতা উল্টে এক জায়গায় থমকে গেল। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা—
মুনাকে
যার সঙ্গে প্রায় রাতেই
গহীন এক জঙ্গলে দেখা হয়।
নদ্দিউ নতিম
মুনা গম্ভীর গলায় বলল, এই লেখাটার মানে কী? আপনি আমার সঙ্গে রহস্য করবেন না। স্পষ্টভাবে বলবেন। দাঁড়িয়ে থাকবেন না। বসুন। আমি চা। দিতে বলছি। চা খান। সিগারেট খান। তারপর পুরো বিষয়টা ব্যাখ্যা করুন। প্রথমে বলুন, রূপবতী মেয়ে দেখামাত্র তার প্রেমে পড়ার বদঅভ্যাস কি আপনার আছে?
মতিন বলল, আমার নেই, তবে নদ্দিউ নতিম সাহেবের আছে। উনি বিরাট প্রেমিক পুরুষ। একজীবনে তিনি অনেক মেয়ের প্রেমে পড়েছেন।
মুনা বলল, খুকখুক কাশি আমার সামনে কাশবেন না। আমার সঙ্গে ঝেড়ে কাশবেন।
মতিন বলল, জি আচ্ছা। চা দিতে বলুন। চা খেয়ে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে ঝেড়ে কাশব।
মতিন পরপর দুকাপ চা খেল। এক পিস কেক খেল। ঘরে তৈরি পনিরের সমুচা খেয়ে সিগারেট ধরাতে ধরাতে তার স্বপ্নের কথাটা বেশ গুছিয়ে বলল। মুনা একবারও তাকে থামাল না। কথার মাঝখানে কোনো ব্যাখ্যা চাইল না। মতিন কথা শেষ করে বলল, আপনার সঙ্গে গহীন জঙ্গলে আমার দেখা হয় কথাটা এইজন্যেই লিখেছি। আপনি কি আমার গল্পটা বিশ্বাস করেছেন?
মুনা বলল, বিশ্বাস করলাম। সর্বশেষ স্বপ্ন কবে দেখেছেন?
গতরাতে দেখেছি।
স্বপ্নে আমার পোশাক কী ছিল?
মতিন জবাব দিল না।
আপনার কি মনে আছে, কী পোশাক ছিল? না-কি মনে নেই?
আমার মনে আছে।
মুনা বলল, আপনার মনে আছে কিন্তু আপনি বলতে চাচ্ছেন না, তাই তো?
জি।
মুনা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে বিদায়। আমি আপনার বই পড়ে দেখব। বইটা যদি ভালো লাগে আপনাকে জানাব। আমার কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেলে বুঝবেন বই আমার পছন্দ হয় নি।
জি আচ্ছা।
আপনার বান্ধবী নিশুকে নিয়ে মামলা চলছে। পত্রিকায় খুব লেখালেখি হচ্ছে। আমি কিছু কিছু পড়েছি। মামলার অবস্থা কী?
অবস্থা ভালো না।
আসামিরা সব ছাড়া পেয়ে যাবে?
জি।
রেপ কেইসের সমাপ্তি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরকম হয়। আপনারা ভালো কোনো লইয়ার দিচ্ছেন না কেন? কমলের বাবাকে নিন।
উনি এ ধরনের মামলা করবেন না।
বলে দেখেছেন?
জি-না।
আমি কি বলে দেব?
মতিন বলল, আমার লেখা বইটা যদি আপনার পছন্দ হয় তাহলে আপনি বলে দেবেন, আর যদি পছন্দ না হয় তাহলে কিছু বলতে হবে না।
মুনা শান্ত গলায় বলল, It is a deal.
মতিন এখন যাচ্ছে আজহার উল্লাহর কাছে। তাঁকে একটা বই দেবে। আজ মতিনের বই বিতরণ দিবস। সেখান থেকে যাবে সালেহ ইমরানের কাছে। তাঁকে দেবে একটা। তাঁর পুত্র কমলকে দেবে একটা। তিনটা বই চলে যাচ্ছে। এক পরিবারের কাছে। মুনা পাচ্ছে একটা। পাঁচ বই পাঁচ জায়গায়। তার কাছে শূন্য। এই ভালো। এত কাল নদী কূলে যাহা লয়ে ছিনু ভুলে সকলি দিলাম তুলে থরে বিথরে–টাইপ ব্যবস্থা। বিথরে শব্দের মানে কী? ডিকশনারিতে কি এই শব্দ আছে? বিথারা বলে একটা শব্দ আছে। বিথর বলে কিছু কি আছে? নিশুকে জিজ্ঞেস করতে হবে।
আকাশ মেঘলা। আকাশ মেঘলা হলে হাঁটতে ভালো লাগে। মাথায় রোদ। কিংবা বৃষ্টি নিয়ে হাঁটা যায় না। তখন রিকশার খোঁজ পড়ে। মতিনের হাঁটতে ভালো লাগছে। রাস্তায় যানজট নেই। থাকলে ভালো হতো। যখন প্রচণ্ড যানজটে আন্ধা গিটু লেগে যায় তখন হাটতে বড়ই আরাম। মনে আলাদা। আনন্দ–তোমরা আটকা পড়ে গেছ, আমি মুক্ত বিহঙ্গ।
আজহার উল্লাহকে পাওয়া গেল না। অফিস থেকে জানা গেল তিনি গুরুতর অসুস্থ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তিনশ এগারো নম্বর কেবিনে আছেন। অবস্থা ভালো না। লোকজন চিনতে পারেন না।
ভরদুপুরে মতিন ঢাকা মেডিকেল কলেজে উপস্থিত হলো। আজহার উল্লাহ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। তার নাকে অক্সিজেনের নল। রোগীরা সাধারণত কাত হয়ে শুয়ে থাকে। তিনি সরলরেখার মতো সোজা হয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর বিছানার চাদর সাদা। গায়ে যে চাদর দেয়া আছে তার রঙ গাঢ় সবুজ। মতিনের পায়ের শব্দে আজহার উল্লাহ চোখ মেললেন। ঘাড় ফিরিয়ে মতিনকে দেখলেন এবং অস্পষ্ট গলায় বললেন, কেমন আছ?
মতিন বলল, আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন?
আজহার উল্লাহ বললেন, কেন চিনব না! তুমি বিখ্যাত উজবেক মরমী কবি। নদ্দিউ নতিম। আমি পনেরো দিন ধরে হাসপাতালে পড়ে আছি। প্রতিদিন ভাবি, সবাই দেখতে এলো–উজবেক কবি কেন আসল না?
আপনি একা কেন?
কিছুক্ষণ আগেও আমার মেয়েটা আমার সঙ্গে ছিল। আজ তার ইউনিভার্সিটিতে খুবই জরুরি কাজ, প্রজেক্ট সাবমিশন। সে চলে আসবে।
মতিন আজহার উল্লাহর বিছানার পাশে বসতে বসতে বলল, শুনেছিলাম আপনার শরীর খুবই খারাপ। কাউকে চিনতে পারেন না।
আজ সকাল থেকে শরীরটা ভালো। নেভার আগে প্রদীপ জ্বলে উঠে। আমারটা জ্বলেছে। আমার সময় শেষ। উজবেক কবির মৃত্যু-বিষয়ক কোনো রচনা আছে?
আছে।
শোনাও তো!
শিশু পুত্র আঁখি মেলি হেরিল এ ধরা
শ্যামল, সুন্দর স্নিগ্ধ, গীত গন্ধ-ভরা;
বিশ্বজগতেরে ডাকি কহিল, হে প্রিয়
আমি যতকাল থাকি তুমিও থাকিয়ো।
আজহার উল্লাহ বললেন, মারহাবা। খুবই সুন্দর। শিশু তার চারপাশের জগতকে বলছে–আমি যতকাল থাকি তুমিও থাকিও। তাই তো থাকে। যখন কেউ চলে যায় জগৎ সংসারও চলে যায়। এটা নদ্দিউ নতিম সাহেবের লেখা?
