দুঃস্বপ্নটা এরকম–ছায়াঘেরা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আমি যাচ্ছি। যতই যাচ্ছি ততই ছায়ার অংশ বাড়ছে। গাছপালা ঘন হচ্ছে। এক পর্যায়ে শোনা গেল প্রবল কোলাহল! যেন ভয়ঙ্কর কিছু হচ্ছে। ভয়ে আমি উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছি। যে দিকে যাচ্ছি সেদিকেই জঙ্গল ঘন হচ্ছে। একসময় দেখা যায় আমি আগের মতো দৌড়াতে পারছি না। পা বেঁধে বেঁধে যাচ্ছে। পায়ের নিচের মাটি জলজ শ্যাওলায় ঢাকা। আমি দৌড়াচ্ছি চোরাবালির উপর দিয়ে, এই সত্যটা একসময় টের পেয়ে আমি ভয়ে ও আতঙ্কে থমকে দাঁড়াই। আর তখনই আমার পা ডেবে যেতে থাকে। আমি চিৎকার করে ডাকি কেউ কি আছে আশেপাশে? আমাকে বাঁচাও। আমাকে বাঁচাও।
বেশিরভাগ সময় স্বপ্নের এই পর্যায়ে আমার ঘুম ভেঙে যায়। যখন ভাঙে না তখন স্বপ্নটা নতুন একদিকে মোড় নেয়। আমি অপরূপ রূপবতী এক তরুণীকে আসতে দেখি। সে এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। খুব কাছে না। আমি হাত বাড়ালে তাকে ছুঁতে পারি না, এমন দূরত্বে। তরুণী আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করে, আপনার কী হয়েছে?
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বলি, চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছি। আমাকে বাঁচান।
তরুণী হাসতে হাসতে বলে, চোরাবালির ইংরেজি কী?
আমি বলি, কুইক স্যান্ড।
জাপানি ভাষায় চোরাবালিকে কী বলে বলতে পারলে আপনাকে বাঁচাব।
জাপানি ভাষায় কী বলে জানি না।
তাহলে তো আপনার খুবই ব্যাড লাক। রুশ ভাষায় কী বলে বললেও হবে। জানেন?
আমি হতাশ গলায় বলি, না।
তরুণী হাসতে থাকে, আমি ডুবে যেতে থাকি। এই হলো স্বপ্ন।
তুই কি জানিস জাপানি কিংবা রুশ ভাষায় চোরাবালিকে কী বলে? জানলে আমাকে অতি দ্রুত জানাবি। যাতে পরের বার যখন এই স্বপ্ন দেখব তখন যেন তরুণীকে চোরাবালির জাপানি কিংবা রুশ পরিভাষা বলে উদ্ধার পেতে পারি।
ভালো কথা, এই তরুণী কিন্তু আমার পরিচিত। উনার নাম মুনা। উনি কমলের মা। আমি আমার জীবনে এই মহিলার মতো রূপবতী কোনো মহিলা দেখি নি। কিছুক্ষণ মহিলার দিকে তাকিয়ে থাকলে একধরনের ঘোর তৈরি হয়। ঈশ্বরগুপ্তের কবিতার মতো বলতে ইচ্ছা করে–
কে বলে শারদ শশী সে মুখের তুলা
পদনখে পড়ে আছে তার কতগুলা।
তুই একবার বলেছিলি আমি কখনো কোনো মেয়ের প্রেমে পড়তে পারব না। আমার ভেতর সেই জিনিস নেই। এখন দেখলি তো ঘটনা কী?
আজ আর না। তুই ভালো থাকিস। তোর হস্তীশাবক ভালো থাকুক। পৃথিবীর সর্বপ্রাণী ভালো থাকুক।
নদ্দিউ নতিম
মুনা অবাক
মুনা অবাক হয়ে বলল, আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?
মতিন বলল, জি।
মুনা বলল, Why me?
মতিন জবাব দিল না। মুনার হাতে ধবধবে সাদা রঙের সিগারেটের প্যাকেট। সিগারেটের নাম নিউ অর্লিন্স। মনে হচ্ছে মেয়েদের সিগারেট। মেয়েদের জন্যে প্রস্তুত সমস্ত পণ্যেই ডিজাইনের ব্যাপার থাকে। সিগারেটের প্যাকেটে বিশেষ ডিজাইন আছে। মুনার হাতের লাইটারটির রঙ টকটকে লাল। লাইটারের ডিজাইনও সুন্দর, ছোট্ট একটা কিউব। মুনা সিগারেট ধরাল। লাইটারে চাপ দেবার পর সুন্দর বাজনা বাজা শুরু হয়েছে। সামান্য সিগারেট ধরানোর মধ্যেও বিপুল আয়োজন।
মুনা বলল, আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন এই প্রশ্নের জবাব দেন নি।
মতিন বলল, চোরাবালির জাপানি কিংবা রুশ প্রতিশব্দ জানতে এসেছি।
উত্তর শুনে মুনা চমকাল না। সে মনে হয় উদ্ভট কোনো উত্তর শুনবে তার জন্যে প্রস্তুত হয়েই ছিল। সে সিগারেটের ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, জাপানি প্রতিশব্দ আমি জানি না, তবে রুশটা জানি। রুশ ভাষায় চোরাবালি হচ্ছে–জিবুচি পেসুক।
মতিন ডায়েরি খুলে প্রতিশব্দ লিখতে লিখতে বলল, ধন্যবাদ।
মুনা বলল, চা খাবেন?
মতিন বলল, জি-না।
মুনা বলল, জাপানি ভাষার প্রতিশব্দ জানতে চাইলে জেনে দিতে পারি। দশ মিনিটের ব্যাপার।
মতিন বলল, একটা হলেই চলবে।
আপনি কি শুধু এটা জানার জন্যেই এসেছেন?
জি।
যা জানার জন্যে এসেছিলেন তা জানা হয়েছে, এখন চলে যাবেন?
জি। আপনি অনুমতি দিলে উঠব।
যখন এসেছিলেন তখন আমার অনুমতি নিয়ে আসেন নি। হুট করে এসেছেন। যাবার সময় অনুমতি চাচ্ছেন কেন?
ভদ্রতা।
আমার সিগারেট শেষ হোক, তারপর যাবেন।
জি আচ্ছা।
আপনি শুধুমাত্র চোরাবালির রুশ এবং জাপানি প্রতিশব্দ জানতে আমার কাছে এসেছেন, এটা বিশ্বাস হচ্ছে না
মতিন বলল, আমি সত্যি কথাই বলছি। আরেকটা প্রশ্ন ছিল, মানুষ কেন ভয় পায়? কেন আনন্দ পায়? আপাতত চোরাবালিই যথেষ্ট।
মুনা বলল, ধরে নিলাম আপনার চোরাবালির প্রতিশব্দ জানা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু আমার কথা মনে হলো কেন? কেন আপনার ধারণা হলো আমি এই দুই ভাষা জানি? আমার চেহারায় কি রুশ ভাব আছে, না জাপানি ভাব আছে?
মতিন চুপ করে রইল।
মুনা বলল, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমি সময় নষ্ট করব না। কী জন্যে আপনি আমার কাছে এসেছেন জানতে চাচ্ছি না। আমার সিগারেটও শেষ হয়েছে। আপনি এখন যেতে পারেন।
মতিন উঠে দাঁড়াল। তার কাঁধে ঝুলানো কাপড়ের ব্যাগ থেকে–Autobiography of a Fictitious Poet বইটা বের করে মুনার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, আপনার জন্যে আমি আমার লেখা একটা বইয়ের অনুবাদ এনেছি। বইটা পেঙ্গুইন বের করেছে।
মুনা বিস্মিত গলায় বলল, পেঙ্গুইন বের করেছে?
মতিন বলল, জি।
আশ্চর্য ব্যাপার! ভোরবেলায় বেশ বড় চমক খেলাম। আপনাকে আমার কখনোই কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখক মনে হয় নি। লেখালেখি ফাজলামি মনে করে এমন একজন মনে হয়েছে।
