মতিন বলল, জি-না স্যার। এটা রবীন্দ্রনাথের কবিতা। নদ্দিউ নতিম সাহেবের সমস্যা হচ্ছে অনেকের অনেক বিখ্যাত কবিতাকে উনি তার নিজের মনে করেন।
মতিন, তুমি দুপুরে আমার সঙ্গে খাবে। জি আচ্ছা।
হাসপাতালের খাবার না। আমার মেয়ে আমার জন্যে খাবার নিয়ে আসবে। দুজনের জন্যে খাবার আনবে, আমরা তিনজন ভাগ করে খাবো।
জি আচ্ছা।
মতিন!
জি স্যার।
আমার একটা ছেলে ছিল, আট বছর বয়সে ছেলেটা মারা যায়। সে বড় হলে তোমার মতো রূপবান হতো। তোমার চেহারা যে রাজপুত্রের মতো এটা নিশ্চয়ই তুমি জানো। আয়নায় মুখ দেখো না?
দেখি।
কলেজে বা ইউনিভার্সিটিতে তোমার বন্ধুরা তোমাকে কী ডাকত? প্রিন্স ডাকত না? আমাদের সময় সুন্দর ছেলের নাম হয়ে যেত প্রিন্স।
আমাকে সবাই ডাকত মাকাল বাবু।
মাকাল ডাকত? হা হা হা। এই নামটাও তো খারাপ না। মাকাল বাবু, এক কাজ কর। আমাকে ধরাধরি করে আধশোয়া করে দাও। হাসপাতালের কাউকে ডাক, নাক থেকে যেন যন্ত্রপাতি খুলে ফেলে।
শরীর ভালো লাগছে?
খুব ভালো লাগছে না, কিন্তু আমার স্বাভাবিকভাবে বসতে ইচ্ছা করছে। কথা বলতে ইচ্ছা করছে। আমি চাই আমার মেয়ে এই দৃশ্য দেখে চমকে উঠুক। একটা হাসির গল্প বলো তো।
হাসির গল্প?
হ্যাঁ জোকস। এখন তো খবরের কাগজে জোকস ছাপা হয়। কোনোটা পড়ে হাসি আসে না। তুমি একটা বলো যাতে হাসি আসে।
মতিন বলল, আপনার মন আজ ভালো, যে গল্পই শুনবেন আপনার হাসি আসবে।
একটা বলো দেখি হাসি আসে কি-না।
দাঁড়ান মনে করি।
হ্যাঁ, মনে পড়েছে। রাজনৈতিক জোকস। প্রেসিডেন্ট বুশকে নিয়ে রসিকতা। প্রেসিডেন্ট বুশ তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইসকে বললেন, ইরাকের মানুষ মরল না বাঁচল এটা নিয়ে কারোরই কোনো মাথাব্যথা নেই। আগামী সাংবাদিক সম্মেলনে আমি এটা প্রমাণ করে দেব।
সাংবাদিক সম্মেলন শুরু হলো। জর্জ বুশ বললেন, আমি ঠিক করেছি ইরাকে সবকিছু নতুন করে হবে। প্রথমে আমি ইরাকের সব মানুষকে মেরে ফেলব। তারপর একটা রাজহাঁস মারব।
সব সাংবাদিক একসঙ্গে প্রশ্ন করল, রাজহাঁস কেন?
জর্জ বুশ কন্ডোলিসা রাইসের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখলে তো ইরাকিদের নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। সবার মাথাব্যথা রাজহাঁস নিয়ে।
আজহার উল্লাহ সাহেবের মেয়ে মৃন্ময়ী দুপুর দুটায় টিফিন কেরিয়ার করে খাবার নিয়ে এসে কেবিনের দরজার পাশে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তার গুরুতর অসুস্থ বাবা বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আছেন। তাঁর নাকে অক্সিজেনের নল লাগানো নেই। তার বাবার সামনে সিনেমার নায়কের মতো চেহারার এক যুবক। বসে আছে। দুজনেই গলা ছেড়ে হাসছে। এ-কী কাণ্ড!
আজহার উল্লাহ মেয়েকে দেখে হাসি থামিয়ে বললেন, মৃন্ময়ী মা, এ হলো। বিখ্যাত উজবেক কবি নদ্দিউ নতিম। তার আরেকটা নাম আছে, মাকাল বাবু। হা হা হা।
মতিন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার সামনে মায়া মায়া চেহারার শ্যামলা একটা মেয়ে। নাক চাপা। বড় বড় চোখ। চোখভর্তি বিস্ময়।
মৃন্ময়ী মতিনের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল, আপনার মন্ত্রটা কী বলুন তো? কোন মন্ত্র দিয়ে আপনি আমার বাবাকে ভালো করে ফেলেছেন? আপনি এত দেরিতে এসেছেন কেন? আগে আসতে পারলেন না?
আজহার উল্লাহ বললেন, উজবেকিস্তান থাকে। আসবে কী করে? হা হা হা।
মৃন্ময়ী বলল, বাবা, হাসি বন্ধ কর তো। তোমার হাসির ধরন ভালো লাগছে না।
তুই সুন্দর করে হেসে আমাদের দেখা। হা হা হা। কী বলো কবি সাহেব, ও হেসে দেখাক কী করে হাসতে হয়।
মতিন দুপুরে হাসপাতালে খাওয়া-দাওয়া করল। আজহার উল্লাহ সামান্য কিছু মুখে দিয়েই শুয়ে পড়লেন। তার জ্বর আসছে। জ্বর নিয়েই কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। মতিন মৃন্ময়ীর হাতে তার বইটা দিয়ে বলল, ঘুম ভাঙলে স্যারের হাতে দেবেন।
মৃন্ময়ী চোখ কপালে তুলে বলল, আপনার বই পেঙ্গুইন বের করেছে!
মতিন বলল, আমার বই না। নদ্দিউ নতিম সাহেবের বই। আমি কেউ না।
মৃন্ময়ী বলল, আবার কবে আসবেন?
জানি না।
বাবা যে আপনাকে কী পছন্দ করে! বাবা ঠিক করে রেখেছেন, সুস্থ হলেই তিনি আপনাকে নিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়িতে যাবেন। আপনি কি যাবেন?
অবশ্যই যাব।
আপনি কাউকে না বলতে পারেন না। তাই না?
ঠিক বলেছেন। কাউকে না বলতে পারি না।
মৃন্ময়ী বলল, যারা কাউকে না বলতে পারে না তারা আবার কাউকে হ্যাঁও বলতে পারে না।
মতিন ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এই কথাও সত্যি। মৃন্ময়ী, যাই।
মৃন্ময়ী সামান্য চমকাল। কেন চমকাল সে নিজেই জানে না।
আজহার উল্লাহ সেদিনই রাত এগারোটায় মারা গেলেন। শ্বাসকষ্ট শুরু হবার আগ পর্যন্ত তার হাতে ছিল মতিনের বই। তিনি বই পড়তে পড়তে বেশ কয়েকবার বললেন–মারহাবা। মৃন্ময়ী বলল, বাবা, তোমার কষ্ট হচ্ছে। তুমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাক।
আজহার উল্লাহ বললেন, শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে না মতিনের সঙ্গে আবার দেখা হবে। যদি দেখা না হয় তুই আমার হয়ে মতিনের মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দিবি। পারবি না?
মৃন্ময়ী বলল, পারব। অবশ্যই পারব।
আমার দেখা দশটা ভালো ছেলের মধ্যে সে একটা।
একবার তুমি বলেছিলে পাঁচটা ভালো ছেলের মধ্যে সে একটা।
তাহলে সেটাই ঠিক।
বাবা, আর কথা না। চুপ করে শুয়ে থাক।
আজহার উল্লাহ হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, দেখ তো কটা বাজে?
দশটা চল্লিশ।
