উকিলটা যখন থমকে দাঁড়ায় তখন নিশুও থমকে দাঁড়ায়। তাকে বাধ্য হয়ে দাঁড়াতে হয়, কারণ দৌড়াতে দৌড়াতে সে ক্লান্ত। তার পা ভেঙে আসে। সে বিশ্রাম নেবার জন্যে দাঁড়ায়। উকিলটার কথা বাধ্য হয়ে শুনতে হয়। তার কথার জবাব দেয়া অর্থহীন। এটা জেনেও সে জবাব দেয়।
হ্যালো মিস নিশু–হ্যালো!
কী চান?
আপনার স্বামীর মোবাইল নাম্বারটা বলুন তো?
আমি বিয়ে করি নি। আমার স্বামী নেই।
তাহলে মতিন সাহেবের নাম্বারটা দিন।
ওর নাম্বার আমার জানা নেই।
আপনি সত্যি বলার শপথ নিয়েছেন। এখন মিথ্যা বলতে পারেন না। মিথ্যা বললে আপনাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে।
কী শাস্তি?
ঐ তিনজনকে লেলিয়ে দেয়া হবে।
কোন তিনজন?
যারা আপনাকে রেপ করেছে। রেপ—ধর্ষণ। রেডি হয়ে যান। যাচ্ছে, ওরা যাচ্ছে। যাচ্ছে। গেট সেট রেডি, ওয়ান, টু, থি …
নিশু আবার দৌড়াতে শুরু করেছে। নিশুর পেছনে ঐ তিনজনও দৌড়াচ্ছে। নিশু চেষ্টা করছে জেগে উঠার। তার ঘুম ভাঙছে না। কী কষ্ট! কী কষ্ট! নিশু ঘুমের ঘোরে ডাকলো, মতিন, বাঁচাও! আমাকে বাঁচাও। মতিন! মতিন!
রাত দুটা বাজে। মতিন জেগে আছে। তার টেবিলে মোমবাতি জ্বলছে। সে চিঠি লিখতে বসেছে।
কঠিন গাধা!
হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো।
অনেক দিন পর তোকে লিখতে বসেছি। শুরুতে কিছুক্ষণ হ্যালো হ্যালো করে নিলাম। হ্যালো হ্যালো করার সুবিধা হচ্ছে–হ্যালো মানে কথা বলা। তোর কি মনে হচ্ছে আমি তোর সঙ্গে কথা বলছি?
ভুলে যাবার আগে একটা কথা জিজ্ঞেস করি, মানুষ ভয় পায় কেন? মানুষ আনন্দ পায় কেন?
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা চাচ্ছি না। অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। এই বিষয়ে এখন গবেষণা চলছে।
তারপর বল, তোর হাতির বাচ্চা কেমন আছে? হাতির আরেক নাম যে জলপশু এটা জানিস? হাতি একমাত্র প্রাণী যে জানে মাটির নিচে কোথায় মিষ্টি-পানি আছে। আফ্রিকানদের বিশ্বাস হাতি ইচ্ছা করলে আকাশ থেকে বৃষ্টি নামাতে পারে। হাতি বিষয়ে আরেকটা কথা একটা হাতি আট মাইল দূরের আরেকটা হাতির সঙ্গে Ultrasound-এর মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে।
হাতি সম্পর্কে এত কথা বলছি কেন? কারণ নদ্দিউ নতিম সাহেব ঠিক করেছেন হারিয়ে যাওয়া একটি হাতির বাচ্চা নিয়ে গল্প লিখবেন। গল্পটা বাচ্চাদের জন্যে। গল্পের নাম ইরকু। ইরকু হলো হাতির বাচ্চাটার নাম। গল্প লিখতে হবে এইজন্যেই পড়াশোনা।
পেঙ্গুইনের বইগুলি পেয়েছি। বই হাতে নিয়ে লজ্জা লজ্জা লাগল। প্রথম সন্তান হবার পর বাবা যেমন লজ্জা পান সেরকম লজ্জা। মায়েরা মোটেই লজ্জা পায় না। তারা অহষ্কার করে বাচ্চা সবাইকে দেখিয়ে বেড়ায়। বাবা বেচারা লজ্জায় মুখ নিচু করে থাকে। পিতৃসুলভ লজ্জায় এখন পর্যন্ত বইটা কাউকে দেখাই নি। নিশুকেও না।
নিশুর অবশ্যি বই দেখার মতো মানসিক অবস্থা নেই। সে তার মামলা নিয়েই বিপর্যস্ত। মামলার অবস্থা অবশ্যি ভালো। অপরাধীদের ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। জীবনের শেষ মুহূর্ত তাদের স্কুলে কাটাতে হবে। মন্দ কী? ঝুলন্ত মৃত্যু।
মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগছে না। একধরনের ক্লান্তি আমাকে গ্রাস করছে। ক্লান্তি বিষয়ে নদ্দিউ নতিমের একটা কবিতা–
ক্লান্তি ও ক্লান্ত
শান্তি ও শান্ত।
ক্লান্ত ও ক্লান্তি
শান্ত ও শান্তি।
এইখানেই Stop
Drag and Mop
Drag and Mop।
তোর কাছে আবোলতাবোল মনে হচ্ছে? কবিতাটা আবোলতাবোেল না। ভেতরে অর্থ আছে। তুই কি ভেতরের অর্থ খুঁজে বের করতে পারবি? পারলে তোর জন্যে পুরস্কার, না পারলে তিরস্কার।
কি পারবি?
জানি পারবি না। কারণ এতক্ষণ তোর সঙ্গে ফাজলামি করেছি। ছড়াটা অর্থহীন। ননসেন্স রাইমেও কিছু সেন্স থাকে। এখানে কিছুই নেই। আবোলতাবোল লিখেছি। চিঠিটাও আবোলতাবোল। চিঠিতে লিখেছি নিশুর মামলার অবস্থা ভালো। তা কিন্তু না। মামলার অবস্থা খারাপ। খুবই খারাপ। আসামিপক্ষের উকিল যেভাবে এগুচ্ছে তাতে মনে হয় নিশুই দোষী। গৃহস্থ পল্লীতে বাস করে মাদক এবং দেহব্যবসা চালাচ্ছিল। সুশীল নাগরিকদের স্বার্থে তাকে জেলে ঢুকিয়ে দেয়া প্রয়োজন। সে একা না, আমিও মক্ষীরানীর দালাল হিসেবে জেলে চলে যাব। আমার জন্যে ভালোই হবে। জেল জীবনের অভিজ্ঞতাটা দরকার। আচ্ছা, তুই কি মানুষের বন্দিদশা নিয়ে কখনো ভেবেছিস?
মানব শিশু শুরুতে থাকে মায়ের পেটে। এখানেই সে অতি ক্ষুদ্র কারাগারে বন্দি। সেই কারাগার কঠিন কারাগার আলো নেই বাতাস নেই। এই ভয়ঙ্কর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সে আসে পৃথিবী নামক কারাগারে। এই কারাগারটা আগের চেয়ে ভালো। আলো বাতাস আছে। অনেক বড়। পৃথিবী নামক কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সে যাবে অন্য এক কারাগারে। (লজিক তাই বলে) সেই কারাগারটা হবে পৃথিবীর চেয়েও অনেক বড়। অনেক সুন্দর। সেই কারাগারের পরেও কি কোনো কারাগার আছে?
ভালো লাগছে না। কিছুই ভালো লাগছে না। দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছা করছে। নির্জন কোনো দ্বীপে। যেখানে আমি ছাড়া দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই। অন্যের সমস্যা নিয়ে এখন আর ভাবতে ইচ্ছা করছে না। আমি এমন একটা জগতে চলে যেতে চাচ্ছি যেখানে… আচ্ছা থাক এসব। নিজের সমস্যা অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেবার মানে হয় না।
চিঠি শেষ করার আগে আমার একটা দুঃস্বপ্নের কথা তোকে বলি। এই দুঃস্বপ্নটা বেশ কয়েকবার দেখেছি। আরো মনে হয় দেখব।
