হাবিবুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সালেহা এরকম ছিল না। রোগে শশাকে সে বদলে যাচ্ছে। রোগটা যে কী তাও ধরা যাচ্ছে না। যে রোগ ধরা যায় সে রোগের চিকিৎসা হয়। রোগই ধরা যায় না, চিকিৎসা কী হবে? একটা সন্তান যদি তার পেটে আসত সব ঠিক হয়ে যেত। সেই চেষ্টাও কম করা হয় নি। চেষ্টা যে এখন বন্ধ হয়ে গেছে তাও না গোপনে গোপনে চলছে। তিনি নবীনগরের এক পীর সাহেবের কাছে গিয়েছিলেন। পীর সাহেব তাকে একটা দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন। চিল্লায় বসে এই দোয়া পড়তে হবে। সাতদিনের চিল্লা। এই সাতদিনে গায়ে তেল মাখা যাবে না, মাংস খাওয়া যাবে না। সময় সুযোগ হচ্ছে না বলে চিল্লায় যাওয়া যাচ্ছে না।
হাবিবুর রহমান খাট থেকে নামলেন। সালেহা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, যাও কোথায়?
বারান্দায় যাই। একটা সিগারেট খাব।
সিগারেট খাবে না-কি ছোট বৌ-এর সঙ্গে ঘষাঘষি করবে? কোথাও যেতে পারবে না। যেখানে বসে ছিলে সেখানে বসে থাক।
হাবিবুর রহমান বাধ্য ছেলের মতো খাটে উঠে বসতে বসতে বললেন, সালেহা, আমি সাতদিনের জন্যে ঢাকার বাইরে যাব।
সালেহা বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললেন, কেন?
একটা জরুরি কাজ আছে।
কাজটা কী?
কাজটা কী তোমাকে বলা যাবে না। শুধু তোমাকে না, কাউকেই বলা যাবে। বললে কাজটা হবে না।
হলে না হবে। কী কাজ বলো।
সাতদিনের জন্যে চিল্লায় বসব।
চিল্লা কী?
মসজিদে বসে এক মনে আল্লাহপাককে ডাকব।
উনাকে ডাকাডাকি করে বিরক্ত করার দরকার কী?
চিল্লায় বসে উনার কাছে কিছু চাইলে উনি দেন। সন্তান চাব। দেখি উনার দয়া হয় কি-না।
সালেহা কঠিন কোনো কথা বলতে গিয়েও বললেন না। নিজেকে সামলে নিয়ে ক্লান্ত গলায় বললেন, যাও, সিগারেট খেয়ে আস।
হাবিবুর রহমান বললেন, থাক শুয়ে পড়ি।
হাবিবুর রহমান বাতি নিভালেন। বিছানায় শুতে এলেন। সালেহা নিজের মনে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, আমার যদি একটা মেয়ে হতো এমন নাম রাখতাম যে নাম কেউ কোনোদিন রাখে না।
কী নাম?
আচার।
মেয়ের নাম রাখবে আচার?
হুঁ।
ঘর অন্ধকার। সালেহা হাসতে শুরু করেছেন। শব্দ করেই হাসছেন। আচার নামটা তিনি এই মুহূর্তেই ঠিক করেছেন। নামটা তার খুবই মনে ধরেছে। তার ইচ্ছা করছে তৌহিদাকে ডেকে আচার নামটা নিয়ে আলোচনা করতে। রাত এমন কিছু বেশি হয় নি। ইচ্ছা করলেই তৌহিদাকে ডাকা যায়। নিশু নামের মাগিটাকেও ডাকা যায়। সে আবার বিরাট জ্ঞানী। আচার নামটা কি এত বড় জ্ঞানীর পছন্দ হবে? সালেহা স্বামীর গায়ে ধাক্কা দিলেন। হাবিবুর রহমান ঘুম। ঘুম গলায় বললেন, কী?
তোমার ছোট বৌকে ডাক দিয়ে আন। তার সঙ্গে আমার কথা আছে।
আচ্ছা।
আচ্ছা কী? যাও।
হাবিবুর রহমান হু বলে শব্দ করে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। সালেহা চেষ্টা করেও স্বামীর ঘুম ভাঙাতে পারলেন না।
নিশু ঘুমুচ্ছিল। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছিল। ভয়ঙ্কর স্বপ্ন। তার গা ঘেঁষে কুকুরের মতো চেহারার কুৎসিত একটা জন্তু বসে আছে। জন্তুটার হাত মানুষের হাতের মতো। তবে হাতে অনেকগুলি করে সরু সরু আঙুল। জন্তুটা ত হাতভর্তি আঙুল দিয়ে নিশুর গা হাতাপিতা করছে। ভয়ে আতঙ্কে নিশু ধড়মড় করে জেগে উঠে দেখে ঘরে বাতি জ্বলছে। তার পাশে তৌহিদা বসে আছে। তৌহিদা তার গায়ে কী যেন মাখাচ্ছে। এই মহিলার মাথার ঠিক নেই, সে কী করছে কে জানে। নিশু হতভম্ব গলায় বলল, কী হচ্ছে?
তৌহিদা বলল, আপনার শরীরে তেল মাখাই।
কেন?
তৌহিদা সহজ গলায় বলল, বুবুর জন্যে তেল গরম করেছিলাম। বুবু তেল মাখবে না। তেল খামাখা নষ্ট হবে।
নিশু বলল, তেল নষ্ট হলে হবে। আমি গায়ে তেল মাখব না।
একটু দিয়ে দেই, আরাম লাগবে।
আমার আরামের দরকার নেই।
চুলে বিলি দিয়ে দেই?
চুলে বিলি দিতে হবে না। কয়টা বাজে?
একটা পাঁচ।
এত রাত পর্যন্ত জেগে আছ কেন? তুমি ঘুমাও।
তৌহিদা বলল, আমার ঘুমাতে ভালো লাগে না। জেগে থাকতে ভালো লাগে। জেগে থাকার মজা আছে। ঘুমের মধ্যে কোনো মজা নেই।
কী মজা?
জেগে থাকলে ভালো ভালো চিন্তা করা যায়। ঘুমের সময় নিজের মতো চিন্তা করা যায় না।
ভালো ভালো চিন্তাটা কী?
তৌহিদা লজ্জা লজ্জা গলায় বলল, আমি চিন্তা করি–বিয়ে করেছি, কিন্তু স্বামীর সঙ্গে থাকতে পারি না। এখন আমার দিন যায় কষ্টে। এই দিন থাকবে না। আমরা আলাদা বাসা ভাড়া করব। একটা কাজের মেয়ে রাখব। সে আমার বাবুর দেখাশোনা করবে। এখন আমার অনেক কষ্ট। তবে কষ্ট করলে কেষ্ট মিলে। ঠিক না আপা?
নিশু হাই তুলতে তুলতে বলল, ঠিক।
তৌহিদা বলল, কেষ্ট জিনিসটা কী আপা?
নিশু বলল, কেষ্ট হলো কৃষ্ণ। কষ্ট করলে কৃষ্ণকে পাওয়া যায়। অর্থাৎ আনন্দ পাওয়া যায়। কৃষ্ণ কে তুমি জানো না?
তৌহিদা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। নিশু বলল, রাতে ঘুমাতে যাবার আগে তোমার ঘুমের ওষুধ খাওয়ার কথা না?
তৌহিদা বলল, হ্যাঁ, দুটা করে নীল রঙের ট্যাবলেট। ঘুমের ওষুধ।
আজ খেয়েছ?
না।
গতকাল খেয়েছিলে?
না।
গত পরশু?
এখন থেকে ওষুধ থেমে ঘুমাবে। আমি নিজের হাতে তোমাকে ওষুধ খাওয়াব। যাও ওষুধ নিয়ে আস।
আচ্ছা।
তিনটা ট্যাবলেট আনবে। আমি একটা খাব। আমার ভালো ঘুম দরকার।
রাতে একবার ঘুম ভাঙলে নিশুর আর ঘুম আসে না। নীল রঙের ঘুমের ওষুধ খাবার জন্যেই হয়তো সে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছে। আরামের কোনো ঘুম না। কষ্টের ঘুম। ঘুমের মধ্যে সে দৌড়াচ্ছে। পুরনো ঢাকার চিপা গলির ভেতর। ছুটছে। গলি জনশূন্য। কয়েকটা কুকুর শুধু ঘোরাফেরা করছে। কুকুরগুলি সাইজে অনেক বড়। রঙ মিশমিশে কালো। অনেক রাত। নিশু ছুটছে, নিশুর পেছনে পেছনে কালো গাউন পরা উকিল দৌড়াচ্ছে। উকিলটা মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে মিস নিশু, আমার কথা শুনুন। কাস্টমারদের কাছ থেকে আপনি কত করে নেন, এটা আমার জানা দরকার। কারণ আপনার স্বামী বিষয়টা জানতে চাচ্ছে।
