আসামিপক্ষের উকিল কালো কোটের পকেট থেকে ধবধবে সাদা রুমাল বের করে মুখ মুছতে মুছতে বললেন–
আসামি পক্ষের উকিল : মিস নিশু, আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না। তার মানে কি এই যে, আপনার দেহব্যবসার প্রতি আপনার আত্মীয়স্বজনদের পরোক্ষ সম্মতি ছিল?
[ নিশু কাঠগড়ার হাতল শক্ত করে চেপে ধরল। তার হাত কাঁপছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ]
আসামীপক্ষের উকিল : আপনি আমার কোনো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না। শেষ প্রশ্নটির জবাব কি দেবেন? আপনার ফি কত? অর্থাৎ কাস্টমারদের কাছ থেকে আপনি কত টাকা নিতেন?
নিশু মাথা ঘুরে কাঠগড়ার ভেতর পড়ে গেল। উকিল সাহেব দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসলেন। রাজনীতিবিদদের মতো এই হাসি অনেকক্ষণ ধরে রাখলেন। কেউ যদি ছবি তুলতে চায় তাহলে যেন তুলতে পারে। ক্যামেরাম্যান জুম করতে চাইলে সে সুযোগও আছে।
সালেহার বুক থেকে ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে
সালেহার বুক থেকে ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে। রাত বারোটা দশ। হাবিবুর রহমান এত রাত পর্যন্ত জাগেন না। দশটা বাজতে না বাজতেই ঘুমিয়ে পড়েন। আজ জেগে বসে আছেন, তাঁর হাই উঠছে। তিনি হাই চেপে আছেন। সালেহা যদি দেখে তার এমন জটিল অবস্থাতেও একজন পাশে বসে হাই তুলছে তাহলে বিরাট ক্যাচাল বেঁধে যাবে। হাবিবুর রহমান তৌহিদার জন্য অপেক্ষা করছেন। তৌহিদা সরিষার তেলে রসুন দিয়ে চুলায় গরম করছে। রসুন-সরিষার তেল বুকে ডলা হবে। এতে যদি কিছু আরাম হয়। তৌহিদা এত দেরি করছে কেন কে জানে!
তৌহিদা ওষুধপত্র ছাড়াই এখন স্বাভাবিক আছে। মানসিক অসুস্থতার একটি মাত্র লক্ষণ তার ভেতর আছে। মতিনকে সে তার স্বামী হিসেবে জানে। তাকে সেই ভাবেই দেখে। মতিন তাঁর সঙ্গে বাস করছে না, মেসবাড়িতে থাকছে, এই বিষয়টিও সে সহজভাবে নিয়েছে। বেচারা কী করবে? এই বাসায় থাকার জায়গা কোথায়! নিশু নামের মেয়েটা বিপদে পড়ে থাকতে এসেছে। ছোট বাসা, বাড়তি রুম নেই। নিশু রাতে তার সঙ্গে এক খাটে ঘুমায়। মতিন তো আর দুজনের মাঝখানে ঘুমুতে পারে না। তৌহিদাকে কিছুদিন কষ্ট করতেই হবে। সব মানুষকেই জীবনের শুরুতে কিছুদিন কষ্ট করতে হয়। কষ্ট করলে কেষ্ট মিলে। সে কিছুদিন কষ্ট করবে, তারপর মতিনের সঙ্গে বাস শুরু হবে। আলাদা সংসার। নয়-দশ বছর বয়সের একটা কাজের মেয়ে রাখবে। মেয়েটা ঘরের টুকটাক কাজ করবে। তৌহিদা রান্নাবান্না করবে। একবছর পার না হতেই সে বাবু নিয়ে নিবে। স্বামী-স্ত্রীর সংসার কোনো সংসার না। সংসারে বাবু থাকতে হয়।
তৌহিদা তেলের বাটি নিয়ে সালেহার পাশে দাঁড়াতেই সালেহা কঠিন ধমক দিলেন, তেল আনতে এতক্ষণ লাগল? তেল এনেছে এক বালতি। আমি কি তেলে গোসল করব? জিনিস নষ্ট করতে গায়ে লাগে না!
হাবিবুর রহমান বললেন, আহা, বাদ দাও তো। চুপ করে থাক, তেলটা মালিশ করে দিক।
সালেহা বললেন, বাবারে বাবা! ছোট বৌ-এর উপর দ বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে। এতই যদি দরদ তাহলে আমার সামনে বসে আছ কেন? ছোট বৌকে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যাও। ঘরও তো খালি নাই যে কোনো ঘরে ঢুকবে। আরেক মাগি এসে চেপে বসেছে। এক কাজ কর, ঐ মাগিটাকেও বিয়ে করে ফেল। মাগিকে ডেকে আন, আমি সুপারিশ করব।
তৌহিদা সালেহার ছোট বৌ বিষয়ক কথাবার্তা ঠিক বুঝতে পারে না। বুবু কেন তাকে ভাইজানের ছোট বৌ বলে খোঁটা দেয়? এটা ঠিক না। ভাই হলো ভাই। ভাইয়ের সম্মান নষ্ট হয় এই ধরনের কোনো কথা বলা ঠিক না। তৌহিদার উচিত প্রতিবাদ করা। সে করে না। অসুস্থ মানুষের কথা ধরতে হয় না। বুবুর। শরীর অতিরিক্ত খারাপ।
তৌহিদা হাতে তেল মাখিয়ে বিছানার দিকে ঝুঁকে এলো। সালেহা ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নিয়ে তীব্র গলায় বললেন, তুই তেলের বাটি নিয়ে বিদায় হ। তোর স্বামীর … (মুদ্রণযোগ্য না) তেল মাখিয়ে দে।
হাবিবুর রহমান তৌহিদার দিকে তাকিয়ে চোখ ইশারা করলেন সে যেন চলে যায়। তৌহিদা তাই করল। সালেহা স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি বসে আছ কেন? ছোট বৌ-এর কাছে যাও। ছোট বৌ-এর সঙ্গে লটরপটর কর। নিজের বৌ, বাইরের কেউ তো না।
হাবিবুর রহমান হতাশ গলায় বললেন, নোংরা কথাগুলি না বললে হয় না?
সালেহা বললেন, তুমি নোংরা কাজ করতে পারবে, আমি নোংরা কথা বলতে পারব না?
হাবিবুর রহমান দুঃখিত গলায় বললেন, তুমি খুব ভালো করে জানো নোংরা কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি অতীতে কোনোদিন কোনো নোংরা কাজ করি নি, ভবিষ্যতেও করব না।
সালেহা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে বললেন, ওরে বাবারে, এত বড় মহা মানব আমার সামনে বসে আছে। তুমি কষ্ট করে তোমার বাম পা-টা এগিয়ে দাও। আমি তোমার শ্রী চরণ চেটে দেই।
হাবিবুর রহমান কিছু বললেন না। তিনি এখন অনেক স্বস্তি বোধ করছেন, কারণ সালেহার বুক থেকে ঘড়ঘড় আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। ঝামেলাটা সেরে গেছে। তাঁর মন বলছে কিছুক্ষণের মধ্যেই সালেহা শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। তিনিও ঘুমাতে পারবেন। এক ঘুমে রাত কাবার করে দেবেন। হাবিবুর রহমান স্ত্রীর দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, বুকের ব্যথাটা কি কমেছে?
সালেহা বললেন, কমলে তোমার কী?
একগ্লাস পানি খাও। পানি খেয়ে ঘুমাবার চেষ্টা কর।
পানি তুমি খাও] একগ্লাস না, এক বালতি খাও। পানি খেয়ে শরীর ঠাণ্ডা কর। তৌহিদাকে দেখে তোমার শরীর গরম হয়ে গেছে। শরীর ঠাণ্ডা করা দরকার।
