সালেহ ইমরান বললেন, তোমার সঙ্গে একটা জরুরি বিষয় নিয়ে আলাপ করতে চাই। টেলিফোনে আলাপটা ভালো হবে না। তুমি কি আসতে পারবে।
অবশ্যই পারব। জরুরি বিষয়টা কী?
মানুষ ভয় পায় কেন? আবার আনন্দই বা পায় কেন?
বিষয়টা আপনি জানতে চাচ্ছেন, না কমল জানতে চাচ্ছে?
কমল। তবে আমি নিজেও জানতে চাচ্ছি।
স্যার আমি যে-কোনো একদিন চলে আসব। আমার নিজের মতামতটা বলব, আবার নদ্দিউ নতিম সাহেবের মতামতটাও জেনে আসব।
আজ আসতে পারবে না?
জি-না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের মামলাটা কোর্টে উঠবে। আমার যদিও কিছু করার নেই, তারপরেও থাকা দরকার।
তোমার কিসের মামলা?
মামলাটা ঠিক আমারও না। নিশুর মামলা। একটা রেপ কেস। পত্রিকায় এই নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে।
সালেহ ইমরান বললেন, আমি দেশী কোনো পত্রিকা পড়ি না। টাইম পড়ি, নিউজ উইক পড়ি। দেশী পত্রিকা মানে খুন-খারাবি, ধর্ষণ।
ঠিক বলেছেন। তবে স্যার আমাদের দেশের পত্রিকাগুলি রেপ কেইস নিয়ে যেমন মাতামাতি করে টাইম, নিউজ উইকের মতো দামি পত্রিকা তারচেয়ে বেশি মাতামাতি করে। তারপরেও সাহেবদের পত্রিকা বলে কথা।
সালেহ ইমরান বললেন, তোমার কথায় সত্যতা আছে। টাইম, নিউজ উইকও খুন ধর্ষণ নিয়ে বিরাট হৈচৈ করে। দেশী পত্রিকা নিয়ে আমি যে কমেন্ট করেছি তার জন্যে সরি।
স্যার, সরি হবার কিছু নেই।
আছে। অবশ্যই আছে।
স্যার, আমি এখন কোর্ট রুমে ঢুকে যাব। আপনার সঙ্গে পরে কথা হবে।
সালেহ ইমরান বললেন, গুড লাক।
জজ সাহেবের মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে আছে। তার বিরক্তির কারণ দুটি মাছি। মাছি দুটি যুক্তি করে কাজে নেমেছে বলে তাঁর বিশ্বাস। এদের একটি যখন তাঁর সামনে রাখা কাগজপত্রে বসে অন্যটি তখন তাঁর নাকে বসার চেষ্টা করে। জজ সাহেব কঠিন দৃষ্টিতে মাছি দুটিকে দেখছেন মাথা নেড়ে নাকের মাছি সরাতেই সে উড়ে যাচ্ছে আবার সঙ্গে সঙ্গেই নথিপত্রে বসা মাছি উড়ে আসছে। জজ সাহেব চেয়ারে বসেও তেমন আরাম পাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না। তিনি একবার চেয়ারের ডান দিকের হাতলে কাত হয়ে বসছেন আবার কিছুক্ষণ পরেই বাম দিকের হাতলে কাত হয়ে বসছেন।
মতিন তাকিয়ে আছে জজ সাহেবের দিকে। যদিও তার তাকিয়ে থাকা উচিত নিশুর দিকে। নিশুকে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে। আসামিপক্ষের উকিল তাকে প্রশ্ন করা শুরু করেছেন। আসামিপক্ষের উকিলের ভাবভঙ্গি এমন যে সে কোনো প্যাকেজ নাটকে মহাজ্ঞানী ব্যারিস্টারের ভূমিকায় অভিনয় করছে। কঠিন কঠিন যুক্তি দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। একেকটা প্রশ্ন করে সে, আবার দর্শকদের দিকে তাকিয়ে মিচকা খালি হাসে। সেই হাসির অর্থ–কেমন, বুঝতেই কিছু প্যাকেজ নাটক হলে এই হাসিগুলি ক্লোজ-আপে ধরা হতো।
উকিল : আপনার নাম নিশু?
নিশু : জি।
উকিল : আপনি অবিবাহিতা?
নিশু : জি!
উকিল : কুমারী? [ মিচকা হাসি ]
নিশু : তার মানে? আমি তো একবার বলেছি আমি অবিবাহিতা।
উকিল : (মিচকা হাসি এখনো চলছে) অবিবাহিতা এক কথা, কুমারী ভিন্ন কথা। জগৎ সংসারে অনেক মেয়ে আছে যারা অবিবাহিতা, কিন্তু কুমারী না।
নিশু : আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?
উকিল : ম্যাডাম, তেমন কিছু বলতে চাচ্ছি না। আপনি যে ফ্ল্যাটে থাকেন সেখানে আপনার সঙ্গে কে থাকেন?
নিশু : কেউ থাকে না, আমি একা থাকি। আগে বাবা থাকতেন, বাবার মৃত্যুর পর একা থাকি।
উকিল : (মিচকা হাসির পর) একা থাকতে ভয় লাগে না?
নিশু : ভয় লাগবে কেন?
উকিল : ভয় লাগবে নাইবা কেন? ঢাকা শহর ভালো জায়গা না। চোর আছে, ডাকাত আছে, সন্ন্যাসী আছে, রেপিস্ট আছে। অনেকে বলে ভূত-প্রেতও আছে। রাতে যখন একা ঘুমাতে যান তখন ভয় লাগে না?
নিশু : না।
উকিল : তাহলে কি আমরা ধরে নেব রাতে কেউ না কেউ আপনার সঙ্গে রাত্রি যাপন করে বলেই আপনি ভয় পান না?
[ নিশুর পক্ষের উকিল এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে উঠে বলল—]
নিশুর উকিল : মাননীয় আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি–আমার মক্কেলকে অবান্তর প্রশ্ন করা হচ্ছে।
জজ সাহেব ফিরেও তাকালেন না।
তার সমস্ত মনোযোগ এই মুহূর্তে মাছি দুটিতে সীমাবদ্ধ। কারণ দুটি মাছিই এখন তার চেয়ারের ডান হাতলে বসে আছে। তিনি ইচ্ছা করলেই তার সামনে রাখা ফাইলটা দিয়ে একটা মোক্ষম বাড়ি দিয়ে মাছি দুটির অবস্থা কাহিল করে ফেলতে পারেন। এটা করা ঠিক হরে কিনা তিনি বুঝতে পারছেন না।
উকিল : ম্যাডাম, আমি সরাসরি মূল বিষয়ে চলে যাই। আপনি ফ্ল্যাটবাড়িতে একা বাস করতেন, কারণ দেহব্যবসার জন্যে একা থাকাই উত্তম।
নিশু : এইসব কী বলছেন!
উকিল : দীর্ঘ দিন আপনি ঐ ফ্ল্যাটে দেহব্যবসা চালাতেন, এটা তো অস্বীকার করতে পারবেন না। আপনাকে উচ্ছেদ করার জন্যে থানায় জিডি এন্ট্রি করা হয়েছে, এটা তো আপনি জানেন?
নিশু : পরে শুনেছি। জিডি এন্ট্রির বিষয়টা সাজানো।
উকিল : ম্যাডাম, আপনাকে কোনো ব্যাখ্যায় যেতে হবে না। আপনি শুধু হা-না বলে আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন। Yes or No। আপনি কি সম্পূর্ণ একা। থাকেন?
নিশু : ইয়েস।
উকিল : আপনার খোঁজখবর করার জন্যে আত্মীয়স্বজনরা কখনো এসেছেন?
নিশু : না। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল না।
উকিল : ভালো না থাকার কারণ কি এটা যে, তারা আপনার দেহব্যবসা সমর্থন করতেন না?
নিশু জবাব দিল না। তার চোখ-মুখ লাল। ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়ছে। চোখের দৃষ্টিতে হতাশা। সে তাকাল মতিনের দিকে। মতিন মনে মনে বলল, নিশু এটা একটা খেলা। প্রশ্ন প্রশ্ন খেলা। খেলাতে রেগে যেতে নেই, ধৈর্য হারাতে নেই। খেলায় রেগে যাওয়া মানেই হেরে যাওয়া।
