কেন?
কারণ মানুষ যন্ত্র না। যন্ত্রই নিয়মের ভেতর থাকে। মানুষ থাকে না।
আমার নিয়মের ভেতর থাকতে ভালো লাগে। আমি এখন ছবি দেখব না। ছাদে বসে থাকব। কাক দেখব।
সালেহ ইমরান বললেন, নিয়মের ভেতর থাকতে তোমার ভালো লাগে কিন্তু তুমিও সবসময় নিয়মের ভেতর থাক না। তোমার নিয়ম ঘরে বসে থাকা। তুমি বসে আছ ছাদে। ঠিক বলেছি?
হুঁ।
কেউ তোমার গায়ে হাত দিলে তুমি হাত সরিয়ে দাও। আমি অনেকক্ষণ তোমার পিঠে হাত দিয়ে আছি, তুমি হাত সরিয়ে নাও নি।
কমল গা ঝকাল। সালেহ ইমরান হাত সরিয়ে নিতে নিতে বললেন, তুমি কি তোমার মার সঙ্গে দেখা করতে যাবে?
না।
যাও ঘুরে এসো। ছাদে একা একা বসে না থেকে মার সঙ্গে দেখা করে আসি।
কমল বলল, না। একা ছাদে বসে থাকতে আমার ভালো লাগছে।
এখন তো তুমি একা না। আমি আছি তোমার সঙ্গে।
কমল আকাশের দিকে তাকাল। তার শরীর সামান্য কাঁপছে। উত্তর দিক থেকে হেলিকপটারের শব্দ আসছে। ঢাকা শহরের ছাদের উপর দিয়ে আজকাল প্রায়ই হেলিকপ্টার উড়ে। কমলের মুখ ফ্যাকাশে। সে দুহাত দিয়ে তার কান চেপে ধরল। তার ঠোঁট কাঁপছে। চোখ ভিজে আসছে। সালেহ ইমরান ছেলের মাথায় হাত রাখলেন। প্রচণ্ড শব্দ করে হেলিকপ্টার প্রায় তাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল।
কমল ক্ষীণ গলায় ডাকল, বাবা!
সালেহ ইমরান বললেন, বলো শুনছি। এখন তুমি কান থেকে হাত সরাতে পার, হেলিকপ্টার উড়ে চলে গেছে।
থ্যাংক য়্যু।
আমাকে থ্যাংকস দেবার কিছু নেই। আমি কিছু করি নি।
তুমি আমার মাথায় হাত রেখেছ। আমার ভয় কমেছে। বাবা, মানুষ ভয় পায় কেন?
সালেহ ইমরান ছেলের সামনে রাখা বেতের টেবিলে সাবধানে বসলেন। মানুষ ভয় পায় কেন এই জটিল বিষয় ছেলেকে বুঝিয়ে বলতে হবে। বোঝাতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। তিনি নিজে কখনো এই বিষয় নিয়ে ভাবেন নি। ভেবে ভেবে বলতে হবে। যুক্তি দুর্বল হলে চলবে না।
মানুষ ভয় পায়, কারণ সে নিজেকে খুবই ভালোবাসে। তার নিজের কোনো ক্ষতি হবে ভাবলেই সে ভয় পায়। মানুষ সাপ দেখলে ভয় পায়, কারণ তার ধারণা সাপ তার ক্ষতি করবে। মানুষ প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি দেখলে ভয় পায়, কারণ তার ধারণা ঝড় তার ক্ষতি করবে। তুমি হেলিকপ্টার দেখে ভয় পেয়েছ, কারণ তোমার ধারণা, হেলিকপ্টারের শব্দ তোমার ক্ষতি করবে।
কমল বলল, এখন উল্টো করে বলো।
সালেহ ইমরান বললেন, উল্টো করে কী বলব বুঝতে পারছি না।
কমল বলল, ভয়ের উল্টো হলো আনন্দ। মানুষ আনন্দ পায় কখন? যখন সে মনে করে এই জিনিসটা তার ক্ষতি করবে না তখন সে আনন্দ পায়?
হতে পারে।
আমি যখন অঙ্ক করি তখন আনন্দ পাই। অঙ্ক আমার ক্ষতি করবে না এইজন্যে কি আনন্দ পাই?
সালেহ ইমরান কী বলবেন ভেবে পেলেন না, বিষয়টা যথেষ্ট জটিল হয়ে যাচ্ছে।
বাবা!
বলো।
তুমি এখন নিচে চলে যাও। আমি ভয় এবং আনন্দ নিয়ে ভাবব।
আমি সামনে বসে থাকি, তুমি ভাব।
না।
সালেহ ইমরান উঠে দাঁড়ালেন। কমল বাবার দিকে না তাকিয়ে বলল, তুমি মতিনকে জিজ্ঞেস করো–মানুষ কেন ভয় পায়, কেন আনন্দ পায়। সে বলতে পারবে।
সালেহ ইমরান বললেন, বয়স্ক মানুষকে নাম ধরে ডাকা ঠিক না। তুমি তাকে মতিন চাচা বলবে।
উনি তো আমার চাচা না। তাকে কেন চাচা ডাকব!
চাচা ডাকতে না চাইলে স্যার বলো।
স্যার বলব না। উনি আমার টিচার না। উনি আমার বন্ধু। বন্ধুকে আমি নাম ধরে ডাকি।
আচ্ছা ডেকো।
তুমি আজই তাকে জিজ্ঞেস করবে, মানুষ কেন ভয় পায় মানুষ কেন আনন্দ পায়।
আচ্ছা।
আর মাকেও জিজ্ঞেস করবে।
আচ্ছা।
এখনই জিজ্ঞেস করবে। কে কী বলল কাগজে লিখে ফেলবে।
Ok.
কমলের চোখ ঝলমল করছে। নতুন এই খেলায় সে আনন্দ পাচ্ছে। সালেহ ইমরান ছাদ থেকে নেমে যাওয়া মাত্রই সে ডাকল–আঙ্কেল ফলিয়া!
রহমত সিঁড়ি ঘরের আড়াল থেকে বের হয়ে এলো। কমল বলল, তুমি কি বাবাকে ভয় পাও?
রহমত বলল, অবশ্যই ভয় পাই, যমের মতো ভয় পাই। কেন ভয় পাও? উনি আমার রুটিরুজির মালিক এইজন্যে ভয় পাই। আমাকেও ভয় পাও? অবশ্যই পাই।
রহমত যুতসই জবাবের জন্য মাথা চুলকাচ্ছে। জবাব মাথায় আসছে না। কমল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।
সালেহ ইমরান অনেকবার চেষ্টা করেও মুনাকে ধরতে পারলেন না। টেলিফোনে রিং হয়, কেউ ধরে না। সে হয়তো এখনো ঘুমুচ্ছে। মাঝে মাঝে মুনা অনেক বেলা পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে থাকে। আবার মাঝে মাঝে কাকডাকা ভোরে জেগে উঠে মিউজিক সিস্টেম চালু করে। অদ্ভুত অদ্ভুত বাজনা বেজে উঠে। মুনার কল্যাণে পৃথিবীর নানান দেশের বিচিত্র সব বাজনা তিনি শুনেছেন। একবার শুনলেন পাথরভাঙা মিউজিক। একদল মানুষ তালে তালে হাতুড়ি দিয়ে পাথর ভাঙে। সেই পাথর গড়িয়ে দেয়। বিচিত্র বাজনা। পাখি উড়ে চলে গেলে পাখির পালক পড়ে থাকে। মানুষ উড়ে চলে গেলেও সঙ্গে করে সবকিছু নিয়ে যেতে। পারে না। তাকে স্মৃতি ফেলে রেখে যেতে হয়।
মুনাকে পাওয়া না গেলেও প্রথমবারেই তিনি মতিনকে মোবাইল টেলিফোনে পেয়ে গেলেন। মতিন বিস্মিত হয়ে বলল, স্যার, আপনি আমার টেলিফোন নাম্বার কোথায় পেলেন?
সালেহ ইমরান বললেন, আমার টেলিফোন বইয়ে তোমার নামে তোমার নাম্বার এন্ট্রি করা আছে।
এন্ট্রি কে করেছে? আপনি?
এটা কি ইম্পোর্টেন্ট?
জি স্যার, ইম্পোর্টেন্ট। আমার মতো অভাজনের টেলিফোন নাম্বার আপনি আপনার টেলিফোন বুকে নিজের হাতে এন্ট্রি করেছেন, এটা কি ইম্পোর্টেন্ট না?
