আঙ্কেল ফলিয়া!
জি ছোটবাবু বলেন। ফুট জুস খাবেন? আনব?
ফ্রুট জুস আনতে হবে না। আপনি কাগজ-কলম আর স্টপওয়াচ নিয়ে আসুন। আমার ঘরের প্রথম ড্রয়ারে একটা ডিজিটাল স্টপওয়াচ আছে।
স্টপওয়াচ দিয়ে কী করবেন? কাকরা লিফটঘরের লোহার সিঁড়িতে বসছে। এটার হিসাব রাখব।
রহমত বলল, পশুপক্ষী কখন কোনখানে বসব তার হিসাব রাখনের কি দরকার আছে?
আছে, দরকার আছে।
রহমত স্টপওয়াচ আনতে গেল। তার যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। ছোটবাবুকে কখনো একা রাখা ঠিক না। ছাদের মতো একটা খোলামেলা জায়গায় তো কখনো না। ছোট ভাইজানের মাথার উপর দিয়ে কোনো অ্যারোপ্লেন কিংবা হেলিকপ্টার উড়ে গেলে বিরাট সমস্যা হবে। শব্দ সমস্যা করবে। বড় সাহেব যদি শুনেন সে ছোটবাবুকে একা ছাদে রেখে গেছে, তাহলে খুবই রাগ করবেন।
সালেহ ইমরান লাইব্রেরি ঘরে বসে আছেন। মিনিট দশেক আগে তিনি লাইব্রেরি ঘরে ঢুকেছেন। কী জন্যে ঢুকেছেন এখন মনে করতে পারছেন না। নিশ্চয়ই কোনো বইয়ের খোঁজে এসেছেন। সে বইটা কী? আজ ছুটির দিন। তার হাতে কোনো কাজ নেই। ছুটির দিনগুলিতে শরীরে আরামদায়ক আলস্য থাকে। তিনি সেই আলস্য বোধ করছেন না, বরং সারাক্ষণই মনে হচ্ছে, আজ কিছু করার নেই। মুনা বাড়িতে নেই। সে আলাদা বাস করতে শুরু করেছে। মুনার অনুপস্থিতিতে তিনি এখনো অভ্যস্ত হন নি। খাটে ঘুমুতে যাবার সময় এখনো একপাশে জায়গা রেখে শুচ্ছেন। একটা সময় আসবে যখন তিনি খাটের মাঝখানে ঘুমুতে শুরু করবেন। তখন বুঝতে হবে তিনি মুনার অনুপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। মানুষ অতি দ্রুত অভ্যস্ত হয়, এটাই ভরসার কথা।
সালেহ ইমরান চোখ বন্ধ করে লাইব্রেরি থেকে একটা বই নিলেন। তিনি ঠিক করেছেন, হাতে যে বই উঠে আসবে সেটাই তিনি পড়বেন। পুরো বই পড়ার ধৈর্য তাঁর নেই, কাজেই পড়বেন একটা পৃষ্ঠা। চোখ বন্ধ করে বইটা মেলবেন, যে পৃষ্ঠা উঠে আসে সেটাই পড়বেন। একধরনের খেলা। বয়স্ক মানুষরাও গোপনে শিশুদের মতো কিছু খেলা খেলে।
সালেহ ইমরানের হাতে একটা কবিতার বই উঠে এলো। 100 Poems by 100 Poets. তিনি ভুরু কুঁচকালেন। কবিতা তাঁর বিষয় না। তিনি কখনো। কবিতা পড়েন না। বইটি রেখে কি আরেকটি বই নেবেন? না-কি আগে যেভাবে ঠিক করা ছিল সেইভাবেই এগুবেন? চোখ বন্ধ করে পাতা উল্টাবেন, যে কবিতাটি উঠে আসে সেটাই পড়বেন। তিনি পাতা উল্টালেন। একটা কবিতা বের হলো, যার শিরোনাম–Ecce Puer, এর মানে কী? কবির নাম জেমস। জয়েস। অতি বিখ্যাত নাম। কিন্তু ইব্ধি পিউ-এর মানে কী?
Of the dark past
A child is born;
With joy and grief
My heart is torn.
এই কবিতারই বা মানে কী? অন্ধকার অতীত থেকে একটি শিশুর জন্ম হলো। আমি তাতে আনন্দিত এবং দুঃখিত। প্রবল আনন্দ এবং শোকে আমার কলিজা ছিঁড়ে আছে।
একটা কবিতা একই সঙ্গে আনন্দের এবং শোকের হবে কীভাবে? Born এর সঙ্গে মিল দেবার জন্যেই কি torn শব্দটা এসেছে?
সালেহ ইমরান কবিতার বই জায়গামতো রেখে দিলেন। গলা উঁচিয়ে রহমতকে ডাকলেন। তখন মনে পড়ল, রহমত কমলকে নিয়ে ছাদে গেছে।
তিনি কি এখন ছাদে যাবেন? কমলের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করা হবে? তাদের অবশ্যি আজ রাতে ছবি দেখার প্রোগ্রাম আছে। ছবির নাম Stalker. সায়েন্সফিকশান।
সালেহ ইমরান ছাদের দিকে রওনা হলেন। ছাদি পর্যন্ত লিফট নেই। লিফট তিনতলা পর্যন্ত। তাকে কিছু সিঁড়ি ভাঙতে হলো। তাঁর মাথায় এখনো কবিতাটা ঘুরছে–Of the dark past a child is born, কবি কি শিশুর মাতৃগর্ভের অন্ধকারের কথা বলছেন?
কমল স্টপ ওয়াচ হাতে মূর্তির মতো বসে। তার দৃষ্টি কাকগুলির দিকে। কোনো একটা পরীক্ষা হচ্ছে–এই বিষয়টা মনে হচ্ছে কাকরা টের পেয়েছে। তারা এখন আর নড়াচড়া করছে না। স্থির হয়ে আছে।
সালেহ ইমরান ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, কোনো পরীক্ষা হচ্ছে না। কি রে?
কমল হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। সালেহ ইমরান বললেন, কী পরীক্ষা?
কমল বাবার দিকে না তাকিয়েই বলল, এখন বলব না।
এখন বললে তোমার পরীক্ষায় আমি সাহায্য করতে পারতাম। যে-কোনো পরীক্ষায় একজন অ্যাসিসটেন্ট লাগে। শার্লক হোমসের সঙ্গে থাকেন ওয়াটসন।
রহমত স্যারের জন্যে চেয়ার নিয়ে এসেছে। গার্ডেন ছাতা এনেছে। মাথার উপর ছাতা ধরবে।
সালেহ ইমরান বললেন, আমার মাথার উপর ছাতা ধরতে হবে না। তুমি, চা নিয়ে এসো। চা খাব।
কমল বলল, আমিও চা খাব।
সালেহ ইমরান বললেন, তুমি চা খাও নাকি?
কমল বলল, যখন আমি বড় হয়ে যাই তখন চা খেতে ইচ্ছা করে। মাঝে মাঝে আমি বড় হয়ে যাই।
সালেহ ইমরান বললেন, বড় হয়ে যাই কথাটা ঠিক বলছ না। তোমার বলা। উচিত–মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমি বড় হয়ে গেছি। তখন চা খাই।
কমল বলল, তুমি ঠিক বলেছ।
সালেহ ইমরান বললেন, তোমার অ্যাক্সপেরিমেন্ট কি শেষ হয়ে গেছে?
হ্যাঁ।
ফলাফল কী?
ফলাফল ভালো না।
অ্যাক্সপেরিমেন্ট ফেল করেছে?
হুঁ।
তোমার মন খারাপ লাগছে?
না।
তোমাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে তোমার মন খারাপ
মন খারাপ না।
চল নিচে যাই, একটা ছবি দেখি।
এখন তো ছবি দেখার সময় না।
সালেহ ইমরান ছেলের পিঠে হাত রাখলেন। কমল সেই হাত সরিয়ে দিল। এটা বিস্ময়কর ঘটনা। সালেহ ইমরান নরম গলায় বললেন, চল একটা ছবি দেখি।
কমল বলল, আজ ছবি দেখার তারিখ না।
সালেহ ইমরান বললেন, সবকিছু দিন-ক্ষণ দেখে হয় না। কঠিন নিয়মকানুনে মানুষ চলতে পারে না। মাঝে মাঝে তাকে নিয়মের বাইরে যেতে হয়।
