মতিন হাসিমুখে বলল, লোহ্যা।
নিশু বলল, লোহ্যা কী?
হ্যালোটা উল্টো করে বললাম। আছিস কেমন?
নিশু বলল, লোভা। অর্থাৎ ভালো।
মাথার যন্ত্রণা আছে না গেছে?
হালকাভাবে আছে।
ততাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়বে কবে?
আগামীকাল সন্ধ্যায়।
মতিন বলল, গুড। এর মধ্যে আমি তোর থাকার ব্যবস্থা করে ফেলব।
নিশু বলল, থাকার ব্যবস্থা করে ফেলব মানে কী?
মতিন বলল, তুই নিশ্চয়ই আগের জায়গায় ফিরে যেতে চাচ্ছিস না?
নিশু বলল, চাচ্ছি।
মতিন বলল, অবশ্যই লা। জায়গাটা তোর জন্যে রিস্কি। তার উপর ঐ ফ্ল্যাটে তোর খারাপ স্মৃতি আছে। ফিরে যাওয়া অবশ্যই ঠিক হবে না।
আমি যাবটা কোথায়?
আপাতত কিছুদিন আমার দুলাভাইয়ের বাড়িতে।
উনার সঙ্গে কথা হয়েছে?
এখনো হয় নি। হবে।
উনি যদি না বলেন তখন?
আমার দুলাভাই জীবনে কখনো কোনো কিছুতে না বলেন নি। তুই যদি দুলাভাইকে বলিস, আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই, উনি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলবেন, আচ্ছা দেখি কী করা যায়।
নিশু শব্দ করে হাসছে। মতিন হাসছে। দরজার বাইরে চেয়ারে বসে থাকা পুলিশ বিস্মিত হয়ে তাকাচ্ছে। পুলিশরা কাউকে শব্দ করে হাসতে দেখলে খুব বিস্মিত হয়।
হাবিবুর রহমান নিউ সালেহা ফার্মেসিতে মন খারাপ করে বসে আছেন। রাত বাজে আটটা। ফার্মেসি রাত এগারোটা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা। রাতে রোগের প্রকোপ বাড়ে। ফার্মেসিগুলিতে ওষুধ বিক্রি বাড়ে সন্ধ্যার পর। তার দোকানের দুজন কর্মচারীই গতকাল থেকে অনুপস্থিত। একজনের ডেঙ্গু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অন্য একজনের কী হয়েছে কেউ জানে না। সে নাকি বাসায়ও ফিরে নাই।
রাত এগারোটা পর্যন্ত হাবিবুর রহমান ফার্মেসিতে বসে থাকতে পারেন না। বসে থেকে লাভও কিছু নেই। কোথায় কোন ওষুধ থাকে তিনি জানেন না। দামও জানেন না। তারপরেও দোকান খোলা রাখতে হয়। দোকান বন্ধ থাকলেই লোকজনের মলে ধারণা ঢুকে যাবে নিউ সালেহা ফার্মেসি সন্ধ্যার পর পর বন্ধ। হয়ে যায়। রাতে ওষুধের দরকার পড়লে তারা প্রথমেই নিউ সালেহা ফার্মেসি বাদ দিবে। ধরেই নেবে এই ফার্মেসি বন্ধ।
হাবিবুর রহমান আবার ঘড়ি দেখলেন। আটটা পাঁচ বাজে। মাত্র পাঁচ মিনিট পার হয়েছে, অথচ তার কাছে মনে হয়েছে খুব কম করে হলেও আধাঘণ্টা পার হয়েছে। তিনি ঠিক করে রেখেছেন রাত নটা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। নটার সময় ফার্মেসি বন্ধ করে যাবেন নিরাময় ক্লিনিকে। তৌহিদাকে দেখে আসবেন। গতকাল যেতে পারেন নি। তৌহিদা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করেছে। আজকে যেতেই হবে।
দুলাভাই, ঘুমাচ্ছেন নাকি?
হাবিবুর রহমান জেগেই ছিলেন। ফার্মেসির দরজার দিকে তাকিয়েও ছিলেন, তারপরেও তিনি কেন মতিনকে ঢুকতে দেখেন নি এটা ভেবে বিস্মিত বোধ করলেন। মতিনকে দেখে তার ভালো লাগছে। ভালো লাগাটা তিনি প্রকাশ করলেন না।
দুলাভাইয়ের শরীর খারাপ না-কি?
না।
দেখে তো মনে হচ্ছে শরীর খারাপ।
হাবিবুর রহমান জবাব দিলেন না। মতিন বলল, তৌহিদাকে না-কি ক্লিনিকে ভর্তি করেছেন, এটা কি সত্যি?
হাবিবুর রহমান বললেন, হুঁ।
বুবুকেও ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে ঝাড়া হাত-পা হয়ে যান। থাকবেন আমার সঙ্গে মেসে। ঠিক আছে?
হাবিবুর রহমান বললেন, তুমি কতক্ষণ থাকবে?
মতিন বলল, যতক্ষণ বলবেন ততক্ষণ থাকব।
রাতে আমার সঙ্গে খাওয়া দাওয়া কর।
আচ্ছা।
বাসায় ফেরার পথে তৌহিদাকে দেখে যাব। তুমিও সঙ্গে চল। তোমাকে দেখলে সে খুশি হবে।
আচ্ছা।
হাবিবুর রহমান ঘড়ি দেখলেন না। আটটা পনেরো বাজে। নটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে ইচ্ছা করছে না। মতিনকে নিয়ে সকাল সকাল বাড়ি ফেরাই ভালো। তার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে। ঘরে কিছুই নেই। এক কেজি খাসির মাংস কিনে ফিরতে হবে।
মতিন।
জি দুলাভাই।
তুমি সারাক্ষণ ডুব দিয়ে থাক, এটা অন্যায়।
মতিন হাই তুলতে তুলতে বলল, সারাক্ষণ ভেসে থাকাও অন্যায়।
হাবিবুর রহমান বিরক্ত মুখে বললেন, তোমার সঙ্গে কথা বলাও অন্যায়। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাকি জীবন তোমার সঙ্গে কথা বলব না। তোমার বোনও এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মতিন সিগারেট ধরিয়েছে। মুরব্বিদের সামনে সিগারেট ধরানোটা বেয়াদবি। হাবিবুর রহমান মতিনের এই বেয়াদবি উপেক্ষা করলেন। সবসময় সবকিছু ধরতে নেই।
মতিনকে দেখে হাবিবুর রহমানের ভালো লাগছে। বিপদের সময় একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো লাগে। ভরসা পাওয়া যায়।
দুলাভাই, আপনাকে একটা জরুরি কথা বলতে এসেছি।
বলো।
আপনি যেরকম রাগী রাগী ভঙ্গিতে কথা বলছেন, ভরসা পাচ্ছি না। একটু সহজভাবে তাকাবেন আমার দিকে?
আগডুম বাগডুম না করে কী বলবে বলো।
একটা মেয়ে ভয়ঙ্কর বিপদে আছে। কয়েকটা দিন তাকে আপনার বাড়িতে আশ্রয় দিতে হবে। অসুবিধা আছে?
অসুবিধার কী আছে? নাম কী মেয়ের?
নাম জানা কি দরকার? তার পরিচয় সে একজন বিপদগ্রস্ত মেয়ে। দুলাভাই, চা খেতে ইচ্ছা হচ্ছে। আপনার এখানে চায়ের ব্যবস্থা আছে?
না। সামনে টি-স্টল আছে, ওখান থেকে খেয়ে আস।
আপনিও চলুন।
দোকান বন্ধ করে যাই।
মতিন বলল, দোকান বন্ধ করার দরকার কী? আপনার তো আর সোনার দোকান না যে লুট করে নিয়ে যাবে। ওষুধ কে নিবে?
হাবিবুর রহমান কঠিন গলায় বললেন, আমার সঙ্গে পাগলের আলাপ করবে না। তুমি পাগল হতে পার, আমি পাগল না। তুমি চায়ের অর্ডার দাও। আমি দোকান বন্ধ করে আসছি।
নিরাময় ক্লিনিকের কেয়ারটেকারের চেহারা সিনেমার নায়কদের মতো। তার কথাবার্তা পোশাক-আশাকও সেরকম। সিনেমার নায়করা যেমন নায়িকা ছাড়া আর সবার সঙ্গেই ভুরু কুঁচকে কথা বলে এও সেরকম। সারাক্ষণ ভুরু কুঁচকে আছে। তার হাতে চা বা কফির মগ। কথা বলছে চোখের দিকে না তাকিয়ে।
