মতিন বলল, স্যার, আমাকে ডেকেছেন কী জন্যে? (থানার ওসি সাহেবকে স্যার বলা ঠিক হচ্ছে কি-না এটা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভেবেছে মতিন। সমাধানে আসাতে পারে নি। তবে সে লক্ষ করল, স্যার ডাকতে তার তেমন অস্বস্তি হচ্ছে না।)
ওসি সাহেব বললেন, আপনাকে ডেকেছি দুটি খবর দেবার জন্যে। দুটি খবরই খারাপ।
বলুন শুনি।
তিনজন আসামির দুজন ধরা পড়েছে, পুলিশ কাস্টডিতে আছে।
এটা তো ভালো খবর। খারাপ হবে কেন?
এদের পক্ষে একজন মন্ত্রী দুজন বিরোধী দলের এমপি সুপারিশ করছেন। সুপারিশ এমন পর্যায়ের যে সন্ধ্যার মধ্যেই তাদের ছেড়ে দিতে হবে। যদি ছেড়ে না দেই তাহলে আগামীকাল তাদের কোর্টে নিতে হবে। কোর্টে সঙ্গে সঙ্গে জামিন হয়ে যাবে। টাকার খেলা।
মতিন বলল, স্যার, আপনার এখানে সিগারেট খাওয়া যায়?
ওসি সাহেব বললেন, অবশ্যই খাওয়া যায়। সিগারেট ধরান।
মতিন সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, দ্বিতীয় খারাপ খবরটা কী?
ওসি সাহেব হতাশ গলায় বললেন, দ্বিতীয় খারাপ খবরটা হচ্ছে নিশু মেয়েটির বাড়িওয়ালা থানায় একটা জেনারেল ডায়েরি করে রেখেছেন। জেনারেল ডায়েরির বিষয়বস্তু হচ্ছে–নিশু মেয়েটি চরিত্রহীনা। তার কাছে নানান ধরনের লোক আনাগোনা করে।
মতিন বলল, এ ধরনের মিথ্যা ডায়েরির গুরুত্ব কী?
কোর্টে যখন মামলা উঠবে তখন ডায়েরিটা গুরুত্ব পাবে। আসামি পক্ষের লইয়ার বিষয়টি কোর্টে তুলে প্রমাণ করবে নিশু খারাপ মেয়ে।
মতিন বলল, আমাদের কী করা উচিত?
ওসি সাহেব ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন।
মতিন আবার বলল, আমাদের কী করা উচিত?
ওসি সাহেব বললেন, আমি পরামর্শ দিব না। আমি ঘটনা বললাম। আপনারা বিচার বিবেচনা করবেন। আমাদের দেশটা ছোট, সবাই সবার আত্মীয়। ভয়ঙ্কর যে-কোনো অপরাধীরও খালাতো ফুপাতো চাচাতো ভাই থাকেন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন। বুঝতে পারছেন ঘটনা?
পারছি।
মমাটেই পারছেন না। এই ঘটনা বাইরের কেউ বুঝবে না। আমরা পুলিশের লোকরা বুঝি। কাউকে কিছু বলতে পারি না। আর বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। আমরা খারাপ। মার্কামারা খারাপ।
মতিন বলল, আপনারা কি আসামি ছেড়ে দিবেন?
দিতেও পারি।
কাজটা ঠিক হবে?
আসামি পক্ষের আত্মীয়স্বজনরা বলবে কাজটা সঠিক হয়েছে। আপনারা বলবেন কাজটা বেঠিক হয়েছে।
আপনি নিজে কী বলবেন?
আমি কিছুই বলব না। আমরা পুলিশ, বলাবলির মধ্যে আমরা নাই। আরেক কাপ চা খাবেন?
খেতে পারি।
চা খেতে খেতেই মন্ত্রী সাহেবের টেলিফোন চলে এলো! ওসি সাহেব টেলিফোনে বিগলিত গলায় বললেন, স্যার, কেমন আছেন? আপনার টেলিফোনের দরকার ছিল না। আপনার পিএস করলেই হতো।
মন্ত্রী বললেন, কাজটা কি হয়েছে?
ওসি সাহেব বিনয়ে গলে গিয়ে বললেন, আপনি নিজে বলবে আর কাজ হবে না এটা কেমন কথা।
থ্যাংক য়্যু। ওরা ছাড়া পেয়েছে?
এখনো পায় নাই। সামান্য একটু ঝামেলা হয়েছে। পত্রিকার লোকজন জেনে গিয়েছে। আসামি ছেড়ে দিলে এরা নিউজ করে ফেলবে—মন্ত্রীর নির্দেশে ধর্ষক আসামি খালাস।
আমার কথা এখানে আসবে কেন?
অবশ্যই আসবে না। আমি কথার কথা বললাম। আপনি স্যার একটা লিখিত অর্ডার দিলে আমার জন্য সুবিধা হয়। সঙ্গে সঙ্গে আসামি খালাস করে দিতে পারি।
আমার মুখের কথা কোনো কথা না?
স্যার, এটা আপনি কী বলেন! আপনার মুখের কথার উপরে কোনো কথা আছে? তবে স্যার একবার পূর্তমন্ত্রীর টেলিফোনে আসামি থানা হাজত থেকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। সেটা নিয়ে এমন ক্যাচাল লেগে গেল। পূর্তমন্ত্রী বললেন, টেলিফোনে তাঁর সঙ্গে আমার কোনো কথাই হয় নি। আমার চাকরি যায় যায় অবস্থা।
ওসি সাহেব।
জি স্যার।
আপনি ভালো ত্যাঁদড় আছেন। তবে আমার কাছে ত্যাঁদড় ঠিক করার মন্ত্র আছে।
ওসি সাহেব টেলিফোন রাখতে রাখতে ছোষ্ট্র নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, নিশুর বাবা আমার ডাইরেক্ট টিচার ছিলেন। অনেকদিন স্যারের বাসায় গিয়েছি। দুপুরে স্যারের বাসায় গিয়েছি আর না খেয়ে ফেরত এসেছি এরকম কখনো হয়। নি। স্যারের স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন, উনি নিজেই রান্না করতেন। একবার কচুর লতি দিয়ে মুরগি রান্না করলেন। আপনি কি কচুর লতি দিয়ে মুরগি কখনো খেয়েছেন?
জি-না।
আমিও খাই নি। এই প্রথম, এই শেষ।
খেতে কেমন ছিল?
খেতে কেমন ছিল মনে নেই। ভালো কথা মনে করেছেন, একদিন আমার স্ত্রীকে বলব রান্না করতে। রাজি হবে কি-না জানি না। মেয়েরা ট্র্যাডিশনের বাইরে যেতে পারে না।
মতিন উঠে দাঁড়াল। তাকে কিছু কাজকর্ম করতে হবে। দুএকদিনের মধ্যেই নিশু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবে। নিশুর থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। পুরনো ফ্ল্যাটে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তবে নিশুর রগ ত্যাড়া। সে হয়তো পুরনো জায়গাতেই ফিরে যেতে চাইবে। দুএকজন ভালো উকিলের সঙ্গেও পরামর্শ করা দরকার। রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চলতে পারে না। মামলা একটা রোগ, উকিল রোগের চিকিৎসক।
নিশু হাসপাতালের বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে। তার হাতে স্যুপের বাটি। দীর্ঘ সময় পর পর সে চামচে করে খানিকটা স্যুপ মুখে দিচ্ছে। তার ঘর খালি, তবে দরজার বাইরে চেয়ার পেতে একজন পুলিশ বসা। রমনা থানার ওসি সাহেব পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করেছেন।
মতিনকে ঢুকতে দেখেই নিশু হাসল। মতিনের কাছে মনে হলোঁ, দশ এগারো বছরের একটা বালিকা হাসছে। অল্প কয়েক দিনেই নিশু খুব রোগা হয়ে গিয়েছে। কণ্ঠার হাড় বের হয়েছে। গাল ভেঙে গেছে। তরুণী মেয়ে হঠাৎ রোগা হয়ে গেলে তার চেহারায় প্রবল বালিকা ভাব আসে। নিশুর ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে।
