রোগীর সঙ্গে দেখা হবে না। আপনারা চলে যান।
হাবিবুর রহমান বললেন, দেখা হবে না কেন?
রোগীকে নটার সময় ঘুমের ওষুধ দেয়া হয়েছে। সে ঘুমাচ্ছে।
হাবিবুর রহমান বললেন, ডাক্তার সাহেব বলেছিলেন রাত দশটা পর্যন্ত দেখা করা যাবে।
কেয়ারটেকার বলল, আমার প্রতি সেরকম নির্দেশ নেই। খামাখা তর্ক করবেন না। বাসায় চলে যান।
হাবিবুর রহমান মতিনের দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বললেন, কী করব?
মতিন বলল, এসেছি যখন দেখা করে যাব।
কীভাবে?
ব্যবস্থা করছি। আপনি ক্লিনিকের গেটের বাইরে গিয়ে সিগারেট ধরান।
মতিন কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল। কেয়ারটেকারের পাশে একজন নার্স এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে ফাইল। নার্সটার চেহারা সুন্দর। কেয়ারটেকারের ভুরু এখন সহজ হয়েছে। মুখ হাসি হাসি। নায়ক সিনড্রম। মতিন নিজেও হাসি হাসি মুখ করে বলল, ভাই, আপনার নাম জানতে পারি?
কেয়ারটেকারের ভুরু আবার কুঁচকে গেল। গলার স্বর কঠিন।
নাম জেনে কী করবেন?
কী করব সেটা পরের ব্যাপার। আপনার কি নাম বলতে অসুবিধা আছে?
নাজমুল হাসান।
মতিন শান্তগলায় বলল, হাসান সাহেব, কী বলছি মন দিয়ে শুনুন। আমার নাম মতিন! আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পলিটিক্যাল পিএস। আইডেনটিটি কার্ড দেখতে চান?
নাজমুল হাসান শুকনো গলায় বলল, কী সমস্যা বলুন তো?
সমস্যা আপনাকে বলব না। ক্লিনিকের যিনি পরিচালক তাকে বলব। আপনি টেলিফোনে উনাকে ধরে দিল।
স্যারকে এখন পাওয়া যাবে না। তিনি সিঙ্গাপুর গিয়েছেন। আঠারো তারিখ ফিরবেন।
উনার নেক্সটম্যান কে?
আপনারা কী চাচ্ছেন বলুন, আমি ব্যবস্থা করি। পেসেন্ট তৌহিদার সঙ্গে কথা বলবেন তো? নার্স, পেসেন্টকে নিয়ে এসো।
কাউন্টারে বড় বড় করে লেখা NO SMOKING. সেদিকে তাকিয়েই মতিন সিগারেট ধরিয়ে আয়োজন করে ধোয়া ছাড়তে লাগল। কেয়ারটেকার নাজমুল তাকিয়ে আছে। কিছু বলছে না।
তৌহিদা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে মতিনকে দেখল। তার চেহারা ঝলমল করে উঠল। সে কিশোরীর আনন্দময় গলায় বলল, আমাকে নিতে এসেছ?
মতিন বলল, হুঁ।
তৌহিদা বলল, ব্যাগ নিয়ে আসি?
মতিন হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
তৌহিদা উল্কার মতোই ছুটে গেল। মতিন কেয়ারটেকারের দিকে তাকিয়ে শান্তগলায় বলল, আপনারা ভুল তথ্য দিয়েছিলেন। রোগী ঘুমাচ্ছে। রোগী তো দিব্যি জেগে আছে। আপনার সমস্যাটা কী?
নাজমুল হাসান কিছু বলল না। তাকে হঠাৎ করেই খুব বিচলিত মনে হলো। মতিন বলল, পেসেন্টের রিলিজের ব্যবস্থা করুন। আমরা পেসেন্ট এখানে রাখতে ভরসা পাচ্ছি না।
পেসেন্ট কীভাবে রিলিজ করব?
যেভাবে রিলিজ করা হয় সেভাবে করবেন। আপনাদের কর্তাব্যক্তি যারা আছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আমি কথা বলব, প্রয়োজনে মাননীয় মন্ত্রী সাহেব কথা বলবেন। আমি ব্যবস্থা করে দেব। পেসেন্ট মন্ত্রী সাহেবের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। উনি চান না বিষয়টা সবাই জানুক। সে কারণেই গোপন।
ভাই সাহেব, আমি তো বিরাট যন্ত্রণায় পড়লাম। স্যারও দেশে নাই।
সিঙ্গাপুরে উনি যে হোটেলে আছেন সেখানে টেলিফোন করুন। কমুনিকেশন বিপ্লবের যুগে এটা কোনো ব্যাপার না। রেইন ফরেস্টের গাছের উপর কেউ বসে থাকলে ও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়।
কেয়ারটেকার নাজমুলকে দেখে মনে হচ্ছে সে পুরোপুরি বিপর্যস্ত। মতিন। আরেকটা সিগারেট ধরাল।
রাত সাড়ে দশটায় তৌহিদাকে নিয়ে মতিন ক্লিনিকের গেট দিয়ে বের হলো। তৌহিদার হাতে কাপড়ের একটা ব্যাগ। মতিনের হাতে বিশাল এক স্যুটকেস। হাবিবুর রহমান গেটের বাইরে চিন্তিত মুখে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। দুজনকে বেরুতে দেখে অবাক হয়ে বললেন, এ-কী! মতিন বলল, দুলাভাই, একটা ট্যাক্সি ক্যাব দেখুন। ঘটনা পরে ব্যাখ্যা করব।
তৌহিদার খুবই আনন্দ হচ্ছে। তার মাথায় অনেক কিছু মিলিয়ে জট পাকিয়ে গিয়েছিল, এখন মনে হচ্ছে সব জট খুলে গেছে। তার বিয়ে হয়েছে মতিনের সঙ্গেই। বিয়ের পর অসুস্থ হয়ে সে হাসপাতালে ছিল। অসুখ সেরে গেছে বলে তার স্বামী তাকে নিতে এসেছে।
তৌহিদা মতিনের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি স্যুটকেস হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভার লাগে না? স্যুটকেস নামিয়ে রাখ।
মতিন স্যুটকেস নামিয়ে রাখল।
তৌহিদা বলল, রাতের খাবার খেয়েছ?
মতিন বলল, না। বাসায় গিয়ে খাব।
বাসায় রান্না কী?
জানি না কী রান্না।
তৌহিদা বলল, কী রান্না সেটা নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। আমি গিয়ে রাঁধব।
মতিন বলল, ঠিক আছে।
তৌহিদা মতিনের দিকে এগিয়ে এসে সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মতিনের হাত ধরল। তার মোটেও লজ্জা লাগছে না। স্ত্রী স্বামীর হাত ধরবে এতে লজ্জার কী আছে? তাছাড়া রাস্তায় লোকজনও নেই। কেউ দেখছেও না।
তৌহিদা বলল, অ্যাই, তোমার হাত এত ঠাণ্ডা কেন?
মতিন বলল, জানি না কেন?
তুমি কোনো চিন্তা করবে না। আমি আজ রাতে ঘুমাবার সময় তোমার হাতে আর পায়ে তেল মালিশ করে দেব।
আচ্ছা।
শুধু আজ না, আমি রোজ রাতে তেল মালিশ করে দেব।
আচ্ছা।
আমি এতদিন ধরে হাসপাতালে পড়ে আছি, তুমি আজ প্রথম আমাকে দেখতে এসেছ। সরি বলো।
সরি।
হাবিবুর রহমান ইয়েলো ক্যাব নিয়ে ফিরেছেন। দরজা খুলে নামার সময় দেখলেন, তৌহিদা মতিনের গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
সারপ্রাইজ সারপ্রাইজ
হ্যালো মতিন!
সারপ্রাইজ সারপ্রাইজ। হো হা হা হা হো হো! কী ভাবছিস? পাগল হয়ে গেছি? ঠিক ধরেছিস। পাগলই হয়েছি। পাগল হবার মতো ঘটনা ঘটেছে।
