নিশু ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পরদিন ভোরে স্টেটমেন্ট দিল। কী ঘটেছিল কিছুই বাদ দিল না। ওসি সাহেব বললেন, আপনি মামলা করবেন?
নিশু বলল, অবশ্যই।
ভালোমতো চিন্তা করে ডিসিশান নিন।
এখানে চিন্তা করার কী আছে?
রেপ কেস নিয়ে নানান লেখালেখি হবে। পত্রিকায় নানান গল্প ছাপা হবে। আপনার নিজের সামাজিক অবস্থান আছে। সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
নিশু বলল, একটা জিনিসই বিবেচনায় রাখতে হবে। দোষী যেন শাস্তি পায়।
ওসি সাহেব বললেন, রেপ কেসে বেশির ভাগ সময় দোষী শাস্তি পায় না। যে মামলা করে তার মানসম্মান নিয়ে টানাটানি শুরু হয়।
নিশু বলল, আপনি ওদের পক্ষ নিয়ে কথা বলছেন কেন?
ওসি সাহেব বললেন, আমি বাস্তবের পক্ষ নিয়ে কথা বলছি, কারো পক্ষ নিয়ে কথা বলছি না। আপনি মামলা করলে আমি অপরাধীদের গ্রেফতার করব। এই বিষয়ে আপনি নিশ্চিত থাকুন।
নিশ্চিত থাকব?
হ্যাঁ নিশ্চিত থাকবেন। আপনার বাবা আমার শিক্ষক ছিলেন। আমি বেশ অনেকবার আপনাদের বাসায় গিয়েছি। একবার আপনি নাশতা হিসেবে আমাকে এক বাটি নুডুলস দিয়েছিলেন। নুডুলসে লবণ ছিল না বলে স্যার আপনার সঙ্গে রাগারাগিও করেছিলেন। এখন কি আপনার সন্দেহ দূর হয়েছে?
জি।
আমরা মামলা ঠিকমতোই চালাব, কিন্তু আপনার সামনে মহাসঙ্কট।
ভোরের স্বদেশ পত্রিকায় নিশুকে নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম–
মক্ষিরানীর বিপদ
স্টাফ রিপোর্টার জানাচ্ছেন, নিশু নামের জনৈকা উচ্চশিক্ষিতা অবিবাহিতা তরুণী একাকী একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে বাস করতেন। সন্ধ্যার পর ফ্ল্যাটে সন্দেহজনক চরিত্রের পুরুষদের আগমন ঘটত। লীলাখেলা চলত গভীর রাত পর্যন্ত। মধুলোভী কিছু পুরুষ রাতে থেকেও যেত। এই বিষয় নিয়ে অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা অনেক দেন-দরবার করেছেন। বাড়িওয়ালাও মক্ষিরানীকে বিদায় করার অনেক চেষ্টা করেছেন। তাতে লাভ হয় নি। এখন মক্ষিরানী নিজের কাটা খালের পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছেন। পাড়ার কিছু বেয়াড়া ছেলেপুলেও মধুর লোভে মক্ষিরানীর ফ্ল্যাটে হানা দিয়েছে। সবাই মজা লুটবে, তারা কেন বাদ পড়বে? ফলাফল?
মক্ষিরানী গুরুতর আহত। তার জীবন সংশয়। মতিন ভোরের স্বদেশ পত্রিকা অফিসে বসে আছে। তার সামনে আজহার উল্লাহ। আজহার উল্লাহ আজ নানাবিধ কারণে বিরক্ত। তাঁর শরীরও খারাপ। জ্বর এসেছে। তিনি জ্বর নিয়েই অফিসে এসেছেন। কারণ আজ সাহিত্য পাতার পেস্টিং।
আজহার উল্লাহ মতিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, কোনো কথা থাকলে বলো। কথা না থাকলে বিদায় হও। ভোতা মুখে অকারণে আমার সামনে বসে থাকবে না।
কথা ছিল স্যার।
কথা থাকলে বলো।
আপনার হাতের কাজ শেষ করুন। তারপর বলি।
আজহার উল্লাহ বিরক্ত গলায় বললেন, আমার সব কাজই মাথার কাজ। আমার হাতের কোনো কাজ নেই। মাথার কাজ কখনো শেষ হয় না। কাজেই তোমার যা বলার এখনই বলো।
মতিন বলল, স্যার, আপনাদের পত্রিকার প্রথম পাতায় একটা খবর বের হয়েছে–মক্ষিরানীর বিপদ। খবরটা কি আপনি পড়েছেন?
আজহার উল্লাহ বললেন, ধর্ষণের খবর আমি পড়ি না।
খবরটা পড়া থাকলে আমার ব্যাখ্যা করতে সুবিধা হতো। খবরটা বানোয়াট। একটা মেয়ে রেপড়া হয়েছে। সে মামলা করেছে। পুলিশ আসামিদের খুঁজছে। এই সময় একটা মিথ্যা খবর খুবই ক্ষতিকর।
আজহার উল্লাহ বললেন, পত্রিকার খবর নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। কাজেই তুমি এসব নিয়ে মোটেই চিন্তা করবে না। ক্লিয়ার?
জি ক্লিয়ার।
এখন বিদায় হবে?
জি-না স্যার। আপনার কাজ শেষ হলে কিছুক্ষণ গল্প করব, তারপর চলে যাব।
গল্প এখনই শেষ করে বিদায় হও। আজ আমার শরীর ভালো না। জ্বর।
মতিন বলল, গল্পটা রবীন্দ্রনাথের গানবিষয়ক। রবীন্দ্রনাথের একটা গান আছে, গীতবিতানে বর্ষার গান অংশে। কথাগুলি হচ্ছে–
এসো এসো হে তৃষ্ণার জল কলকল ছলছল
ভেদ করি কঠিনের ক্রুর বক্ষতল কলকল ছলছল
এসো এসো উৎস স্রোতে গৃঢ় অন্ধকার হতে?
মরুদৈত্য কোন মায়াবলে করেছে বন্দি পাষাণ শৃঙ্খলে।
আজহার উল্লাহর চোখ তীক্ষ্ণ। ভুরু কুঁচকে আছে। তিনি মন দিয়েই শুনছেন।
গানের কথাগুলি কেমন লাগছে স্যার?
রবীন্দ্রনাথের কথা নিয়ে কোনো প্রশ্নই থাকে না।
মতিন সামান্য ঝুঁকে এসে বলল, শান্তিনিকেতনে প্রথম যখন টিউবওয়েল বসানো হয় গানটা তখন লেখা। টিউবওয়েল বসানো উপলক্ষে গান। এটা বর্ষার গান না। স্যার, ইন্টারেস্টিং না?
অবশ্যই ইন্টারেস্টিং! আমি জানতাম না। গল্পটা হঠাৎ আমাকে বলার উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই আছে। আছে না?
জি আছে। মক্ষিরানী নামে যে মেয়েটির কথা আপনার পত্রিকায় ছাপা হয়েছে গল্পটা সেই মেয়েটির কাছে আমি শুনেছি। তার মতো পড়ুয়া মেয়ে দেশে বিদেশে কোথাও পাওয়া যাবে না। মেয়েটি জীবনে কোনো পরীক্ষায় ফার্স্ট ছাড়া সেকেন্ড হয় নি। সে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করতে যাচ্ছে। তাকে নিয়ে একটি পত্রিকা নোংরা গল্প ছাপবে এটা কি ঠিক?
ঠিক না। আমি ব্যবস্থা করব।
স্যার যাই?
যাও। চা খেয়ে যাও।
রমনা থানার ওসি সাহেব আমাকে খবর পাঠিয়েছেন। জরুরি কী কথা বলবেন। তাঁর কাছে যাব।
আজহার উল্লাহ বললেন, মেয়েটা কি তোমার প্রণয়িনী?
মতিন বলল, জি-না। আমার এত সৌভাগ্য না।
রমনা থানার ওসি সাজ্জাদ সাহেব মতিনের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করলেন। চা-বিসকিট খাওয়ালেন। দেশের রাজনীতি কোন পথে চলছে তা নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করলেন। পুলিশ কখনো রাজনীতি নিয়ে আলাপ করে না। কেউ যখন করে তখন বুঝতে হয় ঝামেলা আছে। মতিন ঝামেলাটা ধরতে চেষ্টা করছে, পারছে না।
