সকাল এগারোটায় নিশু মন প্রচণ্ড ভালো হয়ে গেল। কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন থেকে চিঠি এসেছে কুরিয়ারে। চিঠির বক্তব্য, নিশুর হাউজিং-এর ব্যবস্থা হয়েছে। সে ইচ্ছা করলে এখনই চলে আসতে পারে। নিশু যার আন্ডারে কাজ করবে সেই প্রফেসর John OHara Cosgrave-ও সুন্দর একটি চিঠি দিয়েছেন–
নিশু,
প্রথম সেমিস্টার তুমি মিস করেছ। ভালোই করেছ। আমি পুরো তিনমাস ছিলাম হাসপাতালে। তুমি নিশ্চয়ই জানো না আমি ব্যাধিগ্রস্থ মানুষ। আমার রোগের ধরন এমন যে, কিছুদিন পর পর আমাকে দীর্ঘদিনের জন্য হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়। তবে আমার এই ব্যাধি উপকারী। আমি আমার প্রধান কাজগুলি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে করেছি।
আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি। তুমি আমাকে বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশের উপর যে প্রবন্ধটি লিখে পাঠিয়েছ তা পড়ে খুশি হয়েছি। আমি তোমার কাছ থেকে এই কবি সম্পর্কে আরো জানতে আগ্রহী। ভালো থেকো।
ইতি–
ও হারা
অনেকদিন পর নিশুর সাজতে ইচ্ছা করল। মতিনকে চমকে দেবার ব্যবস্থা। সে সাজগোজ করে বসে থাকবে। মতিন দুপুরে খেতে আসবে। সে তাকে নিয়ে বাইরে কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যালে কোনো পার্লার থেকে চুল ঠিক করে আগে কি হয়! নিশু তার জীবনে কখনো পার্লারে যায় নি। তার মাথার চুল কোকড়ানো। পার্লারের মেয়েরা সেই চুল সোজা করে দেবে। চোখে কাজল দিয়ে দেবে।
নিশু বারান্দায় এসে উঁকি দিল। বদ তিনটাকে দেখা যাচ্ছে না। চায়ের দোকানের সামনের বেঞ্চটা ফাকা। নিশু ঘর তালা দিয়ে বের হলো। সে একটা শাড়িও কিনবে। সাজগোজের পর নতুন শাড়ি পরতে ইচ্ছা করে।
নিশু বাড়ি ফিরল একটার দিকে। মুগ্ধ হয়ে সে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে থাকল। মনে মনে কয়েকবার বলল, নিশু মেয়েটা এত সুন্দর! এতদিন এই সৌন্দর্য চোখে পড়ল না কেন?
The wonder is I didnt see at once
I never noticed it from here before.
দরজায় টোকা পড়ছে। মতিন এসে পড়েছে। এখন নিশুর সামান্য লজ্জা লাগছে। মতিন কি ভাববে না তার জন্যেই এত সাজগোজ? ভাবলে ভাবুক। নিশু দরজা খুলল।
নিশুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে হুড়মুড় করে বাড়িওয়ালার ছেলে তার দুই বন্ধু নিয়ে ঢুকে পড়ল। বাড়িওয়ালার ছেলের হাতে ক্ষুর। সে হিসহিস করে বলল, শব্দ করলে মরছস। এক পোচ দিব, গলা শেষ।
নিশু একদৃষ্টিতে ক্ষুরের দিকে তাকিয়ে আছে। পত্রিকায় এই জাতীয় ঘটনা সে অনেক পড়েছে। আজ তার জীবনে ঘটতে যাচ্ছে। বাড়িওয়ালার ছেলের বন্ধুরা দরজা-জানালা বন্ধ করে ফেলেছে। ঘর এখন অন্ধকার। এই অন্ধকার কিছুক্ষণের মধ্যেই সয়ে যাবে। নিশু তাদের তিনজনের ঘামে ভেজা মুখ দেখতে পাবে। এরা কি মদ খেয়ে এসেছে? কী বিকট গন্ধই না আসছে!
ঐ মাগি! শাড়ি তুই নিজে খুলবি? না আমরা টান দিয়া খুলব?
নিশু শব্দ করতে পারছে না, নড়তে পারছে না। কে কী বলছে তাও তার কানে ঢুকছে না। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে ক্ষুরের ফলার দিকে। নিশুর জগৎ ছোট হয়ে আসছে। চারদিক থেকে জমাট অন্ধকার তাকে ঘিরে ধরছে। একবার তার শুধু মনে হলো, মধ্যদুপুরে এত অন্ধকার কেন?
অনেক দূরে কোথাও ঘণ্টা বাজছে
অনেক দূরে কোথাও ঘণ্টা বাজছে। ঘণ্টাধ্বনি অস্পষ্ট কিন্তু তীক্ষ্ণ। শব্দ মাথার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। এই ঘণ্টা কিসের ঘণ্টা? গীর্জার না মন্দিরের? গীর্জার ঘণ্টার সঙ্গে মন্দিরের ঘণ্টার কোনো প্রভেদ কি আছে? মন্দিরেতে কাসার ঘণ্টা বাজল ঢং ঢং। ঘণ্টা কি সবসময় কাসার হয়? কাসা কোন বস্তু? তামা কাসা। তামা হলো কপার, কাসা কী?
নিশু চোখ মেলল ঘণ্টাধ্বনি শুনতে শুনতে। তার মাথায় তামা-কাসা বিষয়ক জটিলতা। সে শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায়। খোলামেলা কেবিন। মাথার কাছে বড় জানালা। জানালা গলে রোদ এসে পড়েছে বিছানায়। রোদের কারণেই কেবিনের দেয়াল হলুদ দেখাচ্ছে। তাকে ঘিরে যারা বসে আছে তাদের মুখও হলুদাভ।
মতিন বলল, অ্যাই নিশু! অ্যাই!
নিশু মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। মতিনের পাশে একজন পুলিশ অফিসার বসে আছেন। তাঁর গায়ে খাকি পোশাক। মাথায় টুপি। পুলিশ অফিসারের চেহারা খুব চেনা চেনা লাগছে। উনি কি নিশুর পরিচিত? পরিচিত হলে তাঁকে তামা এবং কাসার তফাত কী জিজ্ঞেস করা যায়।
মতিন বলল, নিশু, তুমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাক।
নিশু বাধ্য মেয়ের মতো চোখ বন্ধ করল। পুলিশ অফিসার বললেন, আপনি স্টেটমেন্ট দিতে চাইলে দিতে পারেন। আমার সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট আছে। আপনি কি স্টেটমেন্ট দিতে চান?
নিশু চোখ না খুলেই বলল, চাই।
এখন দেবেন?
জি।
তাড়াহুড়া কিছু নেই, ধীরেসুস্থে বলুন কী ঘটেছিল।
নিশু ক্লান্ত গলায় বলল, ঘণ্টা বাজছিল। অনেক দূরে কোথাও ঘণ্টা বাজছিল। ঘন্টাটা গীর্জার না মন্দিরের আমি বুঝতে পারছি না। আমার মনে হয় গীর্জার। কারণ গীর্জার ঘণ্টা যে-কোনো সময় বাজতে পারে। কারো মৃত্যুসংবাদ গীর্জায় পৌঁছালেই ঘণ্টা বাজে। মন্দিরের ঘণ্টা বাজার নির্দিষ্ট সময় আছে। মন্দিরের ঘণ্টা হয় কাসার তৈরি। কাসা তামা না।
পুলিশ অফিসার বললেন, ম্যাডাম, আপনি বিশ্রাম করুন। আপনার স্টেটমেন্ট পরে নেয়া হবে।
নিশু বলল, আচ্ছা।
তার চোখ বন্ধ। তারপরেও জানালা দিয়ে আসা হলুদ রোদ সে দেখতে পারছে। কীভাবে পারছে সেটাও এক রহস্য। আপাতত সে কোনো রহস্য নিয়ে চিন্তা করতে চাচ্ছে না। তার ঘুম দরকার। দীর্ঘ শান্তিময় ঘুম।
