আকাশ নীল। কড়া রোদ উঠেছে। এই রোদের নাম ছাতা-রোদ। ছাতা ছাড়া এই রোদে যাওয়া যায় না। বিজ্ঞানীরা মানুষকে এখনো ছাতামুক্ত করতে পারে নি। তাদের আরেক ব্যর্থতা।
বিজ্ঞানীদের উপর মেজাজ খারাপ করে মতিন হাঁটছে। সে কল্পনা করে নিচ্ছে এখন সন্ধ্যার শুরু। গাছের ছায়া হয়েছে দীর্ঘ। বাতাসে শীতের আমেজ। দুএকটা বাড়িতে সন্ধ্যার আলো জ্বলছে–
A stranger came to the door at eve,
And he spoke the bridegroom fair.
He bore a green-white stick in his hand,
And, for all burden, care.
কবিতাটা কার লেখা? মতিন নাম মনে করতে পারছে না। কবিতা মুখস্থ অথচ কবির নাম মনে আসছে না। এই ধরনের সমস্যা মতিনের ঘনঘন হচ্ছে। কবির নাম মাথার ভেতর আছে। নামে R অক্ষরটা আছে। শুধুমাত্র R অক্ষর জ্বলজ্বল করছে, আর কিছু না। দারুণ অস্বস্তিকর অবস্থা। নিশুকে টেলিফোন করলেই অস্বস্তির হাত থেকে বাঁচা যায়। সে সঙ্গে সঙ্গেই কবির নাম বলবে। নিশুকে টেলিফোন করা যাচ্ছে না, কারণ মতিনের মোবাইল কাজ করছে না। এখন কী করা যায়? কোথাও শান্তিমতো কয়েক কাপ কফি খেলে হতো। কফিতে মস্তিষ্ক উজ্জীবক পদার্থ আছে। সেই পদার্থ শরীরে বেশ খানিকটা ঢুকিয়ে দিলে হয়তো R-এর সঙ্গের অন্য দুই-একটা অক্ষর ভেসে উঠবে।
মতিন একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিল। কফি খাওয়ার জন্যে সে মতিঝিল থেকে যাচ্ছে গুলশানে। সালেহ ইমরান সাহেবের অ্যাসিসটেন্ট আহমেদ ফারুকের। অফিসে। এই বিষয়টাও রহস্যময়। মতিঝিলের অনেক দোকানেই কফি পাওয়া যায়। কফির জন্যে গুলশানে যেতে হয় না। কিন্তু সে যাচ্ছে। কেন যাচ্ছে? তার মস্তিষ্ক কি প্রোগ্রাম সেট করে রেখেছে? কফির তৃষ্ণা একটা অজুহাত ছাড়া কিছু না!
এসির কল্যাণে গাড়ির ভেতর আরামদায়ক শীতলতা। গাড়ির ড্রাইভার বলল, গান দিব স্যার? মতিন বলল, না। তার মাথায় কবিতার পরের চারটা লাইন–
He asked with the eyes more than the lips
For a shelter for the night,
And he turned and looked at the road afar
without a window light.
মতিন চোখ বন্ধ করে আছে। R অক্ষরের সঙ্গে আরেকটা অক্ষর এসেছে B. এখন মনে হয় অন্য অক্ষরগুলিও আসতে শুরু করবে। এই তো আরেকটা এসেছে O. এই তিন অক্ষর নিয়ে খেলতে খেলতে অন্য অক্ষরগুলি নিশ্চয়ই চলে আসবে। খেলা শুরু হোক–
BOR, ORB, ROB, BRO, OBR, RBO…
আরো কিছু কি হয়? কমল বলতে পারত। এই ছেলে এইসব খেলায় ওস্তাদ। ঘোনা ঘুতনি নিয়ে কী বিশাল খেলা ফেঁদেছিল!
আহমেদ ফারুক অবাক হয়ে বললেন, আপনি?
মতিন বলল, কফি খেতে এসেছি। আপনার এখানে কি কফি আছে?
কফি অবশ্যই আছে। আপনি কফি খেতে আমার কাছে এসেছেন–এটা বিশ্বাসযোগ্য না।
মতিন বলল, আমার কাছেও বিশ্বাসযোগ্য না।
আমার অফিসের ঠিকানা কোথায় পেলেন?
জোগাড় করে রেখেছিলাম।
কোত্থেকে জোগাড় করেছেন?
যে হাসপাতালে কমলের চিকিৎসা হয়েছিল, তাদের কাছ থেকে জোগাড় করেছি।
কবে জোগাড় করেছেন? আজ?
আজ না।
কবে?
মতিন বলল, কবে ঠিকানা জোগাড় করেছি এটা জানা কি জরুরি?
আহমেদ ফারুক বললেন, জরুরি না। কৌতূহল।
মতিন বলল, যেদিন কমলের চিঠিটা পড়লাম, চিঠিতে তার সিক্রেট জানলাম, সেদিন।
আহমেদ ফারুক বললেন, তার মানে আপনি কমলের সিক্রেট নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন?
মতিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনার কথা শুনে এখন আমারও সেরকমই মনে হচ্ছে। কফি দিতে বলুন।
কফিতে চুমুক দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে মতিনের মাথায় আরেকটা অক্ষর চলে এলো–T, এখন এই চারটি অক্ষরকে নানানভাবে সাজানো যায় ROBT, BORT…
আহমেদ ফারুক বললেন, শুরু করুন।
মতিন বলল, কী শুরু করব?
যে কথা বলতে এসেছেন সেই কথা।
মতিন চার অক্ষরের খেলা বাদ দিয়ে আহমেদ ফারুকের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার ঘাড়ে কি কোনো জন্মদাগ আছে?
তার মানে?
আছে কি-না সেটা বলুন।
কমলের সিক্রেটের সঙ্গে আমার ঘাড়ে জন্মদাগ আছে কি-না তার সম্পর্ক কী?
মতিন সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, কমল একটা বইয়ে পড়েছে কিংবা ইন্টারনেট থেকে পেয়েছে, পিতার শরীরের জন্মদাগ সন্তানের শরীরে আসে। আমার ধারণা সে তার নিজের ঘাড়ের এই দাগ নিয়ে চিন্তিত ছিল বলেই পড়াশোনাটা করেছে। তারপর সে তার বাবার ঘাড় পরীক্ষা করেছে। জন্মদাগ পায় নি। সে জন্মদাগটি দেখেছে অন্য একজনের ঘাড়ে।
আহমেদ ফারুক ঠাণ্ডা গলায় বললেন, কমল কি আপনাকে জানিয়েছে সেই অন্য একজনটা কে?
জানিয়েছে। জানিয়েছে বলেই আমি আপনার কাছে এসেছি। আমি কি আরেক কাপ কফি খেতে পারি?
না। আপনি এক্ষণ বিদায় হবেন।
মতিন উঠে দাঁড়াল। সে এই মুহূর্তে খুবই আনন্দিত। কবির পুরো নাম তার মাথায় চলে এসেছে। নিশুর সাহায্য লাগে নি। কবির নাম–Robert Frost. কবিতার নাম Love and a question.
ঘুম থেকে উঠার পর থেকেই নিশুর মেজাজ খারাপ ছিল। সে বারান্দায় টাওয়েল শুকাতে দিতে এসে দেখে, রাস্তার পাশের চায়ের দোকানের সামনে বাড়িওয়ালার ছেলে দুই বন্ধুকে নিয়ে বসে আছে। নিশুকে দেখে বাড়িওয়ালার ছেলে উঠে দাঁড়াল এবং চেঁচিয়ে বলল, ঐ মাগি! তার দুই বন্ধুর হেসে গড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা হলো।
নিশু ঘরে ঢুকে গেল। তাকে এই যন্ত্রণা আর সহ্য করতে হবে না। মতিনকে বলা আছে, সে সন্ধ্যার মধ্যে একটা কিছু ব্যবস্থা করবেই। যদি কিছুই করতে না পারে সে কোনো একটা হোটেলে গিয়ে উঠবে। নিশুর ইউনিভার্সিটিতে যাবার দরকার ছিল। সে গেল না। ইউনিভার্সিটিতে যেতে হলে তিন বদের সামনে দিয়ে। যেতে হবে। তারা কুৎসিত কিছু কথা বলবে। রাস্তার লোকজনও সেই কথা শুনবে। কেউ কোনো প্রতিবাদ করবে না। বরং মজা পাবে। সোসাইটি বদলাচ্ছে। খারাপের দিকে বদলাচ্ছে। বর্তমান সোসাইটির মানুষ অন্যের দুর্দশীয় মজা পায়। সাহসী মানুষরা কি সব হারিয়ে যাচ্ছে?
