হাবিবুর রহমান সিএনজি ট্যাক্সি ক্যাবে করে তৌহিদাকে নিয়ে ফিরছেন। তৌহিদা পান চিবোচ্ছে। সে মুখ থেকে ঘোমটা খানিকটা সরিয়েছে। তাকে উৎফুল্ল এবং আনন্দিত মনে হচ্ছে।
ডাক্তার সাহেব ওষুধপত্র কিছু দেন নি। তৌহিদাকে ক্লিনিকে ভর্তি করতে বলেছেন। ক্লিনিক মিরপুরে, নাম নিরাময়। ডাক্তার সাহেব নিজেই ক্লিনিক চালান। ক্লিনিকে দুই ধরনের কেবিন আছে। নরমাল কেবিন এবং ডিলাক্স কেবিন। নরমাল কেবিনের ভাড়া প্রতিদিন পাঁচশ টাকা। ডিলাক্স কেবিন এক হাজার টাকা। ডিলাক্স কেবিনে এসি আছে, রঙিন টিভি আছে।
তৌহিদাকে কেবিনে ভর্তি করাবেন কি-না এটা নিয়েও মতিনের সঙ্গে পরামর্শ করা দরকার। সে গেছে কোথায়?
মতিন কোথাও যায় নি। ঢাকাতেই আছে। দিন দশেক হলো সে বাস করছে। নিশুর সঙ্গে। বাড়িওয়ালার সেজো ছেলে নিশুকে খুবই বিরক্ত করছে। রাত বিরাতে এসে দরজা ধাক্কাচ্ছে। ছেলেটা নেশাখোর। গাঁজা ফেনসিডিল নিয়ে আছে। তার বন্ধু-বান্ধবরাও তার মতোই। বন্ধু-বান্ধবরাও যন্ত্রণা করছে। পুলিশে খবর দেয়া হয়েছিল। পুলিশ এসেওছিল। বাড়িওয়ালা পুলিশকে বলেছেন–নিশু মেয়েটা খারাপ। নানান ধরনের ছেলে তার কাছে আসে। রাতে থাকে। ভদ্রপাড়ায় থেকে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আমার ছেলে খারাপ এটা জানি। খারাপ যায় খারাপের কাছে। এখন বুঝেছেন ঘটনা?
পুলিশ হয়তো ঘটনা বুঝেছে। তারা কিছুই করে নি।
ঢাকা শহরে একা একটি অল্পবয়েসি মেয়ের ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকা প্রায়। অসম্ভব ব্যাপার। নিশু মেয়েদের কোনো হোস্টেলে চলে যেতে চাচ্ছে। তেমন কিছু পাচ্ছে না।
পল্লবীতে নিশুর আপন মামা থাকেন। নিশু তার কাছেও গিয়েছিল। তিনি বলেছেন, তিন বেডের এক বাড়িতে থাকি, আমাদেরই থাকার জায়গা নাই। তুই কই থাকবি?
নিশু বলেছে, আমি ড্রয়িংরুমে শুয়ে থাকব।
নিশুর মামা বলেছেন, ড্রয়িংরুমে আমার অফিসের পিয়ন ঘুমায়, তুই তার সঙ্গে ঘুমাবি?
নিশু বলেছে, হ্যাঁ।
নিশুর মামা বিরক্ত হয়ে বলেছেন, তোর বাবা যেমন পাগল ছিল তুইও পাগল। তোর যা করা উচিত তা হলো বিয়ে করে ফেলা।
নিশু বলল, আমি রাজি আছি, আমাকে বিয়ে দিয়ে দাও। আমি আজই বিয়ে করব। গুণ্ডাপাণ্ডাদের যন্ত্রণা আর নিতে পারছি না।
নিশু ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছে। এখন তার প্রধান কাজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লেডিস হোস্টেলে সিট খোজা। সে ডাবলিং ট্রিপলিং সবকিছুতেই রাজি আছে। মেঝেতে শুয়ে থাকতেও তার আপত্তি নেই। সে মতিনকে আলটিমেটাম দিয়েছে। মতিন যদি সন্ধ্যার মধ্যে তার জন্যে থাকার ব্যবস্থা না করতে পারে তাহলে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে। বাড়িওয়ালার ছেলে রাতে এলে নিশু বটি দিয়ে তাকে খুন করবে।
আলটিমেটাম নিয়ে মতিন কিছু ভাবছে সেরকম মনে হচ্ছে না। সে ভোরের স্বদেশ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের সামনে লাজুক লাজুক মুখ করে বসে আছে। আজহার উল্লাহ সাহেব রাগে ছটফট করছেন। মতিন তাঁর রাগ কমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
আজহার উল্লাহ সাহেবের রাগের কারণ বর্তমান কালের এক তরুণ কবির পাঠানো কবিতা। কবিতার নাম জনৈক রমণীর পায়ুপথ। তিনি কবিতা হাতে নিয়ে চিড়বিড় করছেন এই নামে কবিতা হতে পারে? মতিন, তুমি বলো, এই নামে কবিতা হতে পারে?
মতিন বলল, ইউরোপ আমেরিকার কিছু কবি এ ধরনের অ্যাক্সপেরিমেন্টাল কবিতা লিখছেন।
আজহার উল্লাহ বললেন, অ্যাক্সপেরিমেন্ট! এর নাম অ্যাক্সপেরিমেন্ট? পায়ুপথ নিয়ে অ্যাক্সপেরিমেন্ট?
মতিন বলল, ঠিক এধরনের একটি কবিতা ইংরেজিতে আছে–Anus of a young lady. কবিতার মধ্যে রুচি ও অরুচির মিশ্রণ। Lady হচ্ছে রুচির প্রতীক, Anus অরুচির প্রতীক।
চুপ কর।
জি আচ্ছা স্যার চুপ করলাম।
চা খাবে?
চা খাব না, কফি খাব।
আজহার উল্লাহ সিগারেট ধরালেন। তার রাগ সামান্য কমল। তিনি মতিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার গল্পগুলি ভালো হয়েছে।
মতিন বলল, আমার গল্প না স্যার। নদ্দিউ নতিম সাহেবের গল্প।
আজহার উল্লাহ বললেন, আমার সঙ্গে ফাজলামি করবে না। আমি তোমার ইয়ার দোস্ত না, তোমার দুলাভাইও না। তুমি গল্পগুলি ভালো লিখেছ, তবে লাভ নাই।
লাভ নাই কেন স্যার?
লাভ নাই, কারণ বাঙালি মুসলমান লেখক জন্মে জাত সাপ হয়ে, মারা যায় হেলে সাপ হিসাবে।
মতিন বলল, নদ্দিউ নতিম সাহেব মুসলমান এটা ঠিক আছে; তবে উনি বাঙালি না, উজবেক।
আমার কাছ থেকে থাপ্পড় খেতে চাও? থাপ্পড় দিয়ে চাপার লুজ দাঁত ফেলে দেব।
মতিন হেসে ফেলল।
আজহার উল্লাহ বললেন, কোনো নতুন লেখা এনেছ?
মতিন বলল, নদ্দিউ নতিম সাহেবের একটা অ্যাক্সপেরিমেন্টাল কবিতার অনুবাদ এনেছি। চায়নিজরা যেমন উপর থেকে নিচে লেখে তিনি এইভাবে কিছু কবিতা লিখেছেন। পক্ষীবিষয়ক রচনা।
মতিন টেবিলের উপর লেখা রাখল! আজহার উল্লাহ সাহেব লেখা হাতে নিলেন–
এ কি না পা
ক ং ও খি
টি বা * কে
পা শ্যা পা মা
খি মা রে না
* * * য়
ছি কা ব না।
ল ঠ লা *
হ ঠো ক জা
য় ক ঠি নি
* রা ন *
কা হ বে না
ক তে শ *
কি পা ক কে
ং রে ঠি ন?
বা * ন।
চ আ কা
ড়ু বা ঠি
ই র ন্য
আজহার উল্লাহ বেশ কিছুক্ষণ মতিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি আর আমার এখানে আসবে না। বিদায় হও।
কফি খেয়ে যাই স্যার?
আজহার উল্লাহ বললেন, না।
মতিন উঠে দাঁড়াল।
ভোরের স্বদেশ পত্রিকা অফিস থেকে বের হয়ে মতিন ঘড়ি দেখল, এগারোটা পঁচিশ। তার মনে হলো, বিজ্ঞান এখনো যথেষ্ট অগ্রসর হয় নি। এখনো মানুষকে ঘড়ি দেখতে হয়। সার্টের হাতা গুটিয়ে রিস্টওয়াচ চোখের সামনে ধরতে হয়। রাতে আরো সমস্যা, বাতি জ্বালাতে হয়। বিজ্ঞান এত কিছু করেছে কিন্তু মানুষকে ঘড়ি দেখার ঝামেলা থেকে মুক্ত করতে পারছে না কেন? মানুষের শরীরের ভেতর বিজ্ঞানীরা একটা ঘড়ি ঢুকিয়ে দেবেন। সেই ঘড়ি মানুষকে সময় দিতে থাকবে। ঘড়ি বন্ধ হবে মৃত্যুর সময়।
