ডা. সালাহউদ্দিন চৌধুরী
সহযোগী অধ্যাপক (সাইকো)
মনোরোগ ও মাদকাসক্তি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোথেরাপিস্ট
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট
শেরে বাংলা নগর, ঢাকা
রোগী দেখিবার সময়
বিকাল পাঁচটা থেকে রাত নয়টা
শুক্রবার বন্ধ
তৌহিদা জড়সড় হয়ে বসে আছে। তার পরনে হালকা সবুজ রঙের শাড়ি। কলাবউদের মতো সে বিরাট ঘোমটা দিয়েছে। ঘোমটার ভেতর দিয়ে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে কপালের খানিকটা চোখে পড়ছে। সে একেবারেই নড়াচড়া করছে না। তৌহিদার পাশে হাবিবুর রহমান বসেছেন। তার কপাল ঘামছে। তিনি কেন জানি ভয়ে অস্থির হয়ে আছেন। ডাক্তারের এই ঝামেলা শেষ হলে বাঁচেন এমন অবস্থা। ডাক্তার এবং উকিলের কাছে কিছু লুকানো যায় না। তাদেরকে সব সত্যি কথা বলতে হয়। হাবিবুর রহমান বুঝতে পারছেন না সব সত্যি কথা তিনি বলতে পারবেন কি-না। ডাক্তার সাহেবকে দেখে মনে হচ্ছে। মানুষটা কঠিন প্রকৃতির। রোগীদের সঙ্গে ধমক দিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। ভদ্রলোক সারাক্ষণই বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে রেখেছেন।
ডাক্তার তৌহিদার দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে বললেন, নাম কী?
তৌহিদা সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট স্বরে বলল, বলব না।
কেন বলবেন না?
নাম বলতে ভালো লাগে না।
কী করতে ভালো লাগে?
পান খেতে ভালো লাগে।
এই বলেই সে হাবিবুর রহমানের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ভাইজান, জর্দা দিয়ে পান খাব।
হাবিবুর রহমান বিনীত ভঙ্গিতে ডাক্তারকে বললেন, স্যার, এর পান খাবার অভ্যাস ছিল না। অসুখের পর থেকে পান খায়। আর স্যার এর নাম তৌহিদা। তৌহিদা খানম।
তৌহিদা বলল, মতিন ভাই শুধু ডাকেন তৌ।
ডাক্তার বললেন, মতিন ভাই কে?
হাবিবুর রহমান বললেন, আমার শ্যালক।
ডাক্তার বললেন, আপনার বাসায় তার যাতায়ত আছে?
জি আছে। তবে কম। মাসে দুই মাসে একবার।
ডাক্তার তৌহিদার দিকে তাকিয়ে বললেন, মতিন সাহেবকে কি আপনার ভালো লাগে?
তৌহিদা বলল, আমি পান খাব। জর্দা দিয়ে পান খাব। আপনার এখানে পান নাই?
ডাক্তার হাবিবুর রহমানের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি একটা কাজ করুন। জর্দা দেয়া পান কিনে আনুন। পান কিনে এনে ওয়েটিংরুমে অপেক্ষা করবেন। আমি না ডাকা পর্যন্ত আসবেন না। আমি ততক্ষণ রোগীর সঙ্গে কথা বলব।
হাবিবুর রহমান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উঠলেন। তিনি ভয়ে ভয়ে ছিলেন কখন ডাক্তার জিজ্ঞেস করে বসে রোগী কি বিবাহিত? কার সঙ্গে বিবাহ হয়েছে? বিবাহ কবে হয়েছে? যখন শুনবে হাবিবুর রহমানের সঙ্গেই বিয়ে হয়েছে তখন হুট করে জিজ্ঞেস করবে আপনার সঙ্গে কি আপনার স্ত্রীর যৌন মিলন হয়েছে? মানসিক রোগের ডাক্তারদের মুখে কোনো পর্দা থাকে না। অশ্লীল কথা তারা হুটহাট করে জিজ্ঞেস করে।
হাবিবুর রহমান চারটা জর্দা দেয়া পান কিনলেন। নিজে একটা মুখে দিলেন। বাকি তিনটা পকেটে রাখলেন। চারটা সিগারেট কিনে একটা ধরালেন। তিনি আগে সিগারেট খেতেন না। সিগারেট খেলে টেনশন কমে এই ভেবে সিগারেট ধরিয়েছিলেন। তার টেনশন কিছুমাত্র কমে নি। মাঝখান থেকে সিগারেটের অভ্যাস হয়ে গেছে।
তৌহিদার মতো ভয়াবহ রোগী ঘরে থাকলে টেনশন কীভাবে কমে? তাকে দেখাশোনা করার তৃতীয় ব্যক্তি নেই। সালেহা পুরোপুরি শয্যাশায়ী। একটা ছুটা কাজের মেয়ে আছে, সকালে এসে হাঁড়ি বাসন মেজে ঘর ঝাট দিয়ে চলে যায়। তাকে চোখে চোখে রাখতে হয়। কারণ এই মেয়ের অভ্যাস যাবার সময় শাড়ির কোচড়ে করে চাল ডাল নিয়ে যাওয়া।
গত সাতদিন থেকে হাবিবুর রহমানের ঘরে রান্নাবান্না হচ্ছে না। তৌহিদার এই অবস্থা, কে রাঁধবে? হাবিবুর রহমানের ব্যবসা-বাণিজ্য মাথায় উঠেছে। বেশির ভাগ সময় তাকে বাসায় থাকতে হয়। যখন বাইরে যান তখন তৌহিদাকে তার ঘরে তালাবন্ধ করে যান। তৌহিদা তাতে কোনো আপত্তি করে না। সে আগে যেমন শান্ত মেয়ে ছিল এখনো তাই আছে। যত শান্তই হোক মাথা খারাপ মানুষের কোনো ঠিক নেই। কোনো একদিন দেখা যাবে কাপড়চোপড় ছাড়া রাস্তায় বের হয়ে পড়েছে। রাস্তার মানুষজন মজা পাচ্ছে। ভ্যাকভ্যাক করে হাসছে।
হাবিবুর রহমান দ্বিতীয় সিগারেটটা ধরালেন। পকেট থেকে মোবাইল টেলিফোন বের করে মতিনের নাম্বার বের করে আবার চেষ্টা করলেন। রিং হলো না। গত পাঁচদিন ধরে তিনি মতিনের খোঁজ বের করার চেষ্টা করছেন। লাভ হচ্ছে না। একদিন তার বেঙ্গল মেসে গিয়ে দরজার নিচ দিয়ে চিরকুট ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছেন–
বিরাট বিপদে আছি
সাক্ষাতে কথা হবে।
বাসায় এসো। জরুরি।
তারপরেও মতিন আসে নি। বিপদের সময় আত্মীয়স্বজন না এলে কখন আসবে? জন্মদিনের অনুষ্ঠানে!
মতিনের সন্ধান পাওয়া গেলে তাকে কিছুদিনের জন্যে স্থায়ীভাবে বাসায় এনে রাখা যেত। তার সঙ্গে পরামর্শ করা যেত। পরামর্শ করার জন্যে নিজের লোক লাগে। যার তার সঙ্গে পরামর্শ করা যায় না! পরামর্শ করার বিষয় অনেক আছে। হাবিবুর রহমান অনেক ঝামেলা করে লৌহজং-এর কবিরাজ হৃষিকেশ ভট্টাচার্য (ভৈষজ্য ধন্বন্তরী, সাহিত্য শ্রী) সাহেবের কাছ থেকে পাগলের তেল আনিয়েছেন। তেলের নাম উন্মাদ ভঞ্জন কনক তৈল। এই তেল তৌহিদার মাথায় দেয়া যাবে কি-না তা নিয়ে পরামর্শ। তেল মাথায় দেবার আগে মাথার সব চুল ফেলে দিতে হবে। এটা করা কি ঠিক হবে? তিনি সালেহার সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। সালেহা বলেছেন, অসম্ভব। সালেহার পরামর্শ গ্রাহ্য না। কারণ মহাবিপদে নারীর পরামর্শ নিতে নাই। শাস্ত্রের কথা। কনক তেলের জন্যে যাওয়া আসা বাদেই তাকে এক হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। এক ফাইল পাঁচশ টাকা। তিনি দুই ফাইল কিনেছেন। কবিরাজ সাহেব বলেছেন এক ফাইল। ওষুধেই কাজ হবে। তারপরেও তিনি দুই ফাইল কিনেছেন। যে কবিরাজ নিজ থেকেই এক ফাইল ওষুধ নিতে বলে তার মধ্যে সততা আছে। অসৎ কবিরাজ হলে তিন ফাইল গছিয়ে দেবার চেষ্টা করত।
