মতিন বলল, কেমন আছ বুবু? অনেকদিন পর তোমার গলা শুনলাম। তোমার গলা শুনে মনে হচ্ছে ভালো আছ।
হুঁ ভালো আছি।
দুলাভাই কেমন আছেন?
সেও ভালো আছে। সে আরেকটা বিয়ে করেছে।
বলো কী? কবে?
এই তো কিছুক্ষণ আগে। তিনলক্ষ এক টাকা দেনমোহরে তৌহিদাকে বিয়ে করেছে।
তোমার কথার আগামাথা পাচ্ছি না। দুলাভাই তৌহিদাকে কেন বিয়ে করবে?
তুই বিয়ে করবি না বলে তোর দুলাভাইও করবে না এটা কেমন কথা!
বিয়ে কি সত্যি হয়েছে?
হ্যাঁ হয়েছে। এক কথা কতবার বলব!
দুলাভাই এখন আছেন কোথায়?
এখানেই আছে। তৌহিদাও আছে। তোর দুলাভাইয়ের সঙ্গে কথা বলবি?
এখন বলব না। পরে বলব। ঘটনাটা আগে হজম করে নেই।
সালেহা তৃপ্তি তৃপ্তি গলায় বললেন, যা হজম কর। এমনিতে হজম না হলে হজমি বড়ি খা।
সালেহা আরাম করে চা খেলেন। অনেকদিন পর নিজেই মাষকালাই দিয়ে টাকি মাছ রান্না করলেন। রাতে ঘুমুতে যাবার আগে আগে বললেন, অনেকদিন একসঙ্গে ছবি দেখা হয় না। ভিসিআর-এ একটা ছবি ছাড় তো। পাহেলি নামের একটা ছবি আনা আছে, ঐটা ছাড়। তৌহিদাকে ডাক। সেও দেখুক। দুই পাশে দুই বউ নিয়ে ছবি দেখার আলাদা মজা। হি… হি… হি…।
তৌহিদা ছবি দেখতে রাজি হলো না। সালেহা অনেক রাত পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে ছবি দেখলেন। ছবিতে এক মেয়ের স্বামী বিয়ের পর পর বিদেশে চলে যায়। তখন একটা ভূত স্বামীর বেশ ধরে মেয়েটির সঙ্গে বাস করতে আসে, তাদের একটা বাচ্চাও হয়।
ছবি দেখতে দেখতে সালেহা বললেন, ভূত স্বামীর ছায়া পড়ছে না। দেখ ভালো করে, সবার ছায়া পড়ে, ভূতটার পড়ে না।
হাবিবুর রহমান চিন্তিত গলায় বললেন, তোমার শরীর তো মনে হয় ঠিক হয়ে গেছে।
সালেহা বললেন, তাতে কি তোমার কোনো সমস্যা?
হাবিবুর রহমান বললেন, সমস্যা হবে কেন?
ছবি শেষ করে সালেহা মুখভর্তি পান নিয়ে ঘুমুতে গেলেন। স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আজ শরীরটা বেশ ভালো লাগছে। তোমার বিশেষ কিছু লাগলে বলো? লাগবে কিছু?
হাবিবুর রহমান না-সূচক মাথা নাড়লেন। সালেহা আরাম করে ঘুমালেন। এমনিতে রাতে কয়েকবার তার ঘুম ভাঙে। পানি খান। মাথার তালু গরম হয়ে যায়। তালুতে ভেজা ন্যাকড়া দিতে হয়। আজ রাতে সে-সব কিছুই হলো না। তবে হাবিবুর রহমানের এক ফোঁটা ঘুম হলো না। তিনি সারারাত স্ত্রীর পাশে জেগে বসে রইলেন। মনে মনে মন্ত্র জপের মতো বলতে লাগলেন, ভুল করেছি। বিরাট ভুল। আকাশপাতাল ভুল। স্ত্রীর প্ররোচনায় সব স্বামী এরকম ভুল করে। আদম আলায়সসালামকে গন্ধম কে খাইয়েছে? বিবি হাওয়া।
তৌহিদাও জেগে রইল। সে তার ঘরের বাতি জ্বেলে তাকিয়ে থাকল সিলিং ফ্যানের দিকে। সিলিং ফ্যানে শাড়ি ঝুলিয়ে মেয়েরা ফাঁস নেয়। তার নিজের মাও এই কাণ্ড করেছিলেন। আদর্শ মায়ের আদর্শ মেয়ে হিসেবে এই কাজটা কি সে করতে পারে না? শাড়ি কীভাবে গলায় পেঁচায়? মতিন ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হবার পর তার জন্যে একটা বিয়ের শাড়ি কেনা হয়েছিল। ঐ শাড়িটা গলায় পেঁচালে হয় না? কেন হবে না! অবশ্যই হয়, সাহস করে পেঁচিয়ে দিলেই হয়।
ভোরবেলায় তৌহিদাকে পাওয়া গেল সম্পূর্ণ অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায়। তার গায়ে পেটিকোট ছাড়া কোনো কাপড় নেই। পরনের শাড়ির একটা মাথা ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে। অন্য মাথা বিছানায়। তৌহিদা খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে।
তৌহিদা অনেকবেলা পর্যন্ত ঘরে বসে আছে কেন এটা দেখতে গিয়ে তাকে এই অবস্থায় পাওয়া গেল। তৌহিদা সালেহাকে দেখে খুবই স্বাভাবিক গলায় বলল, বুবু, পান খাব। আমাকে জর্দা দিয়ে একটা পান দেন।
সালেহা ভীত গলায় বললেন, তোর কী হয়েছে?
তৌহিদা বলল, আমার কিছু হয় নাই। বুবু, একটা পান দেন।
তুই নেংটা হয়ে বসে আছিস কী জন্যে?
তৌহিদা বলল, পান খেয়ে গোসল করব, তারপর নতুন শাড়ি পরব।
তোর কি জ্বর? দেখি কপালটা।
তৌহিদা কঠিন গলায় বলল, খবরদার আমার গায়ে হাত দিবা না। স্বামী ছাড়া কেউ আমার গায়ে হাত দিবে না। বুবু, পান কই? খালিমুখে কতক্ষণ বসে থাকব।
ঘরে পান ছিল না। হাবিবুর রহমান পান নিয়ে এলেন। তৌহিদা মুখে পান নিয়ে আরাম করে চিবুচ্ছে। পানের পিক ফেলছে। তার আচার আচরণে স্পষ্ট কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। শাড়ি পরতে কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। তবে সালেহা তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে হাবিবুর রহমানের একটা পাঞ্জাবি পরিয়ে দিয়েছেন।
হাবিবুর রহমান খুবই ভয় পেয়েছেন। তিনি ঘরে ঢুকছেন না। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি সেখান থেকেই বললেন, তৌহিদা, তোর কি রাতে ঘুম হয় নাই?
তৌহিদা বলল, জি-না ভাইজান।
ফ্যানে শাড়ি ঝুলিয়েছিস কী জন্যে?
সেটা তোমাকে বলব না ভাইজান। বললে তুমি রাগ করবে।
আচ্ছা থাক বলার দরকার নাই।
ভাইজান, আমি দেশের বাড়িতে যাব। আমাকে দেশের বাড়িতে রেখে আস।
দেশের বাড়িতে তো তোর কেউ নাই।
না থাকুক, আমি যাব। আমাকে ট্রেনে তুলে দিলেই আমি যেতে পারব।
আচ্ছা ঠিক আছে। তোকে ঘুমের ওষুধ দিব। ঘুমের ওষুধ খেয়ে আরাম করে ঘুমা। ঘুম ভাঙলে তোকে দেশের বাড়িতে নিয়ে যাব।
একটা নতুন স্যুটকেস কিনে দিও। আগের স্যুটকেসটার তালা ভাঙা।
নতুন স্যুটকেস কিনে দেব।
ভাইজান, এখন কিনে দাও।
হাবিবুর রহমান হতাশ চোখে সালেহার দিকে তাকালেন। তিনি বুঝতে পারছেন তাঁর সামনে মহাবিপদ।
তৌহিদাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে
হাবিবুর রহমান তৌহিদাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে এসেছেন। ডাক্তারের নাম সালাহউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন শ্রীনরোভে। চেম্বারের সামনে বিরাট সাইনবোর্ড।
