সামছু! সামছু কই?
সামছু এসে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। হাবিবুর রহমান বললেন, মাছ নিয়ে বাসায় দিয়ে আস। বলবে ঝাল ঝাল করে যেন রান্না করে।
জি আচ্ছা স্যার।
তেলাপিয়া মাছ আছে। তেলাপিয়ার ভাজি।
জি আচ্ছা স্যার।
মাছ দিয়ে এসে আমার এই ঘরের পাটি ফেলে দিবে। বালিশ ফেলে দিবে। নতুন পাটি নতুন বালিশ কিনে আনবে।
জি আচ্ছা স্যার।
ডেটলের পানি দিয়ে ঘর ধুবে।
জি আচ্ছা স্যার।
তুমি নিজেও আমাকে যথাসময়ে খবর না দিয়ে বিরাট অন্যায় করেছ। তুমিও অপরাধী।
জি স্যার অপরাধী।
তুমি আগে কানে ধরে পঞ্চাশবার উঠবোস কর, তারপর বাজার নিয়ে যাও।
সামছু মনে হলো এই শাস্তিতে আনন্দিত। সে আগ্রহ নিয়ে উঠবোস করছে। তার চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে না সে লজ্জা পাচ্ছে। উঠবোস করতে তার যে কষ্ট হচ্ছে তাও না। অর্থহীন শাস্তি। হাবিবুর রহমান বিরক্ত মুখে বললেন, ঠিক আছে আর লাগবে না, এখন মাছ নিয়ে রওনা দাও।
হাবিবুর রহমান বাড়ি ফিরলেন সন্ধ্যাবেলায়। শোবার ঘরে ঢুকে তিনি হতভম্ব। সালেহা ছটফট করছে। তাঁর চোখের মণি স্থির। হাত-পা শক্ত।
হাবিবুর রহমান বললেন, কী হয়েছে?
তিনি বড় বড় করে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বললেন, কলেমা পড়। চার কলেমা পড়ার দরকার নাই, শুধু কলেমা তৈয়ব।
হাবিবুর রহমান বললেন, কলেমা পড়ব কেন?
সালেহা বেগম বললেন, আমি মারা যাচ্ছি এইজন্যে।
হাবিবুর রহমান বললেন, আগে ডাক্তারের ব্যবস্থা করি। পরে কলেমা।
সালেহা বেগম হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আমার ডাক্তার লাগবে না। আজরাইল চলে এসেছে। আমি চোখের সামনে দেখছি। ঐ তো দাঁড়ানো।
সালেহা বেগমের দৃষ্টি একটি বিশেষ দিকে স্থির হয়ে গেল। হাবিবুর রহমান। ভীত গলায় বললেন, বলো কী? লা ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
হৈচৈ শুনে তৌহিদা ছুটে এসেছে। সেও হতভম্ব। সালেহা বললেন, তৌহিদা, তুই আমাকে সূরা ইয়াসিন পাঠ করে শোনা। বলেই স্বামীর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন–ওগো তুমি আমার হাত ধরে পাশে বসো। আমার মাথা কোলে নাও। আমি তোমার কোলে মাথা রেখে মরব।
হাবিবুর রহমান স্ত্রীর মাথা কোলে নিলেন। তাঁর চোখে পানি এসে গেল। তৌহিদা সূরা ইয়াসিন পাঠ করা শুরু করল না, সে সালেহার পায়ের তালুতে সরিষার তেল মালিশ করতে লাগল। সালেহা স্বামীর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, মরণের সময় আমি যদি তোমার কাছে একটা জিনিস চাই তুমি কি দেবে?
হাবিবুর রহমান ধরা গলায় বললেন, অবশ্যই অবশ্যই।
আল্লাহপাকের নামে কীরা কাট।
হাবিবুর রহমান আল্লাহর নামে শপথ করলেন। সালেহা বেগম বললেন, আমি তো মারা যাচ্ছি। আমার মৃত্যুর পর তোমাকে কে দেখবে? তুমি বিবাহ করবে।
আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার মৃত্যুর পর আমি বিবাহ করব, কথা দিলাম। এখন শান্ত হও।
যে-কোনো মেয়ের হাতে আমি তোমাকে দিব না। আমি নিজে পছন্দ করে তোমার বিয়ে দিয়ে যাব। তুমি বিয়ে করবে তৌহিদাকে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার মত আছে।
হতভম্ভ হাবিবুর রহমান বললেন, এইসব কী বলো!
সালেহা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, তুমি আল্লাহর নামে কীরা কেটেছ। ভুলে যেও না। এক স্ত্রী থাকতে দ্বিতীয় বিবাহ হয় না। স্ত্রীর অনুমতি থাকতে হয়। আমার অনুমতি আছে। আমি তোমার বিয়েতে সাক্ষী হবো।
তুমি শান্ত হও। আমি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করি।
সালেহা বললেন, অ্যাম্বুলেন্স না। তুমি কাজির ব্যবস্থা কর। এক্ষণ যাও। আমি আর বেশি সময় নাই। তোমার বিয়ে না দিয়ে আমি যদি মারা যাই তাহলে তুমি কিন্তু সারাজীবনের জন্যে দায়ী থাকবে।
সালেহা বড় বড় করে শ্বাস নিতে নিতে কলেমা তৈয়বা পড়তে লাগলেন।
হাবিবুর রহমান তৌহিদার দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বললেন, কী করিরে তৌহিদা?
তৌহিদা বলল, ভাইজান, বুবু যা বলছেন তাই করেন। উনার পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
হাবিবুর রহমান বললেন, তুই কি পাগল হয়ে গেলি? তোকে কেন বিয়ে করব!
সালেহা বললেন, তাহলে থাক। বিয়ের দরকার নাই। আমাকে তোমরা বিদায় দাও।
সালেহার খিঁচুনি শুরু হলো।
রাত আটটায় তিন লক্ষ এক টাকা দেনমোহরে হাবিবুর রহমানের সঙ্গে তৌহিদার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর পর সালেহার শ্বাসটানা স্বাভাবিক হয়ে গেল। তিনি বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললেন, তৌহিদা, আমাকে কড়া করে এককাপ চা দাও।
তৌহিদা চা আনতে উঠে গেল। সালেহা স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, বিয়ে হয়ে গেছে বলে একসঙ্গে ঘুমানো শুরু করবে না। একসঙ্গে থাকা শুরু করবে আমার মৃত্যুর পর। তার আগে না। তৌহিদাকে বলে দিবে, তোমাকে আগে যেমন ভাইজান ডাকত এখনো যেন ভাইজান ডাকে।
হাবিবুর রহমান বিড়বিড় করে বললেন, তোমার শরীরের অবস্থা কী?
সালেহা বললেন, ভালো। মাছ দিয়ে মাষকালাইয়ের ডাল খেতে ইচ্ছা করছে। তুমি মাষকালাইয়ের ডাল নিয়ে আস। খোসাসহটা আনবে। টাকি মাছ। আনবে। অন্য মাছ না।
হাবিবুর রহমান বললেন, তুমি এটা কী করলে?
সালেহা বললেন, যা করেছি ঠিক করেছি। তুমি আমার ছাগল ভাইটাকে টেলিফোন করে বিয়ের খবর দাও।
দরকার কী?
সালেহা বললেন, দরকার আছে। যা করতে বলছি কর। ঠিক আছে তোমাকে ফোন করতে হবে না। আমিই করব। লাইন ধরে দাও।
এখনই টেলিফোন করতে হবে না। তোমার শরীর ভালো না। তুমি রেস্ট নাও।
কে বলেছে আমার শরীর ভালো না। আমার শরীর ঠিকই আছে। কই টেলিফোন ধরে দাও।
হাবিবুর রহমান টেলিফোনে মতিনকে ধরে রিসিভার এগিয়ে দিলেন। সালেহা বললেন, কে? মতিন?
