রাত এগারোটা। মুনা স্টাডিরুমের দরজা ধরে দাঁড়ালেন। দরজায় টোকা দিলেন। সালেহ ইমরান টিভি পর্দা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। মুনা বললেন, তুমি ঘুমুবে না?
সালেহ ইমরান বললেন, তুমি শুয়ে পড়, আমার দেরি হবে।
মুনা বললেন, তোমার সঙ্গে কিছু কথা ছিল।
আগামীকাল শুনি।
যে-কথা এখন বলতে চাচ্ছি আগামীকাল তা নাও বলতে ইচ্ছা হতে পারে।
কথাগুলি কি খুবই জরুরি?
হ্যাঁ জরুরি। খুব জরুরি কি-না তা জানি না, তবে জরুরি।
সালেহ ইমরান বললেন, কথাগুলি কি এখানেই বলবে,–কি আমাকে বিশেষ কোনো জায়গায় যেতে হবে?
মুনা বললেন, এখানেও বলতে পারি, আমার কোনো অসুবিধা নেই। আমি প্রেমের কোনো সংলাপ বলব না যে তোমাকে নীপবনে যেতে হবে।
সালেহ ইমরান টিভি বন্ধ করলেন। মুনা এসে তাঁর সামনে বসতে বসতে সহজ গলায় বললেন, এই বাড়িতে বাস করে আমি কোনো আনন্দ পাচ্ছি না।
এই কথা তো আগেও কয়েকবার শুনেছি। এটাই তোমার জরুরি কথা?
হ্যাঁ। এই বাড়িতে কোনো আনন্দ নেই। আমি যখন ছেলের কাছে যাই, সে হিজিবিজি কথা বলে। আমি যখন তোমার কাছে আসি, তুমি ঝিম ধরে থাক। তোমার এই বাড়িটাতে মনে হয় সময় থেমে আছে।
তোমার বাড়ি তোমার বাড়ি করছ কেন? বাড়িটা তো তোমারও।
মুনা বললেন, এই বাড়িটাকে কখনো আমার নিজের বাড়ি মনে হয় নি। বাড়িটাকে আমার হোটেলের মতো লাগে। যে হোটেলে আমি গেস্ট হিসেবে থাকতে এসেছি। মেয়াদ শেষ হলে বিল মিটিয়ে চলে যাব।
বিল মেটাতে চাচ্ছ?
মুনা বেশ কিছু সময় চুপ করে থেকে বললেন, হ্যাঁ চাচ্ছি।
সালেহ ইমরান বললেন, কমল? কমলের কী হবে?
সে থাকবে তোমার সঙ্গে। তোমাকে সে আমার চেয়ে অনেক বেশি পছন্দ করে। তাছাড়া তার পাশে কে আছে কে নেই এটাকে সে কোনোরকম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে না।
মুনা উঠে দাঁড়ালেন।
সালেহ ইমরান বললেন, তোমার কথা শেষ?
মুনা বললেন, হ্যাঁ শেষ। এখন তুমি টিভি ছাড়তে পার। চা বা কফি লাগবে? পাঠাতে বলব?
সালেহ ইমরান বললেন, তোমার কথার সারমর্ম কী? মুনা বললেন, সারমর্ম হলো, আমি তোমার সঙ্গে বাস করব না।
ফার্মেসির ম্যানেজার হেদায়েতুল ইসলাম
নিউ সালেহা ফার্মেসির ম্যানেজার হেদায়েতুল ইসলামের চাকরি আজ দুপুর বারটায় নট হয়েছে। শুধু যে নট হয়েছে তা-না, হাবিবুর রহমান ফার্মেসির আরেক কর্মচারী সামছুকে বলেছেন–হারামজাদা ম্যানেজারটার গালে শক্ত করে একটা চড় দাও দেখি।
সামছু চড় দেয় নি। সে মাথা নিচু করে সামনে থেকে বিদায় হয়েছে।
হেদায়েতুল ইসলামের চাকরি যাওয়ার কারণ সে মাঝে মধ্যেই রাতে ফার্মেসিতে থেকে যেত। গভীর রাতে নিশিকন্যাদের আনাগোনা হতো। ব্যাপারটা অনেকদিন থেকেই চলছিল। হাবিবুর রহমান ধরতে পারেন নি। আজই ধরা পড়েছে। হাবিবুর রহমান মোহাম্মদপুর বাজার থেকে কাঁচাবাজার করে ফিরেছেন। গরমে ঘেমে অস্থির। তিনি কিছুক্ষণ ফ্যানের বাতাস খাবার জন্য ফার্মেসির পেছনের ঘরটায় ঢুকলেন। ফ্যান ছেড়ে দিলেন, তখন তাঁর চোখে পড়ল বালিশের কাছে কালো কী যেন ঝলমল করছে। হাতে নিয়ে দেখেন কনডমের খোলা প্যাকেট। তিনি ডেকে পাঠালেন সামছুকে। সে রাতে ফার্মেসির মেঝেতে তোষক বিছিয়ে ঘুমায়।
সামছু এসে সামনে দাঁড়াল। হাবিবুর রহমান ঠাণ্ডা গলায় বললেন, এই বস্তুটা আমি আমার বিছানায় বালিশের কাছে পেয়েছি। বস্তুটা চেন? হাতে নিয়ে দেখ।
সামছু হাতে নিয়ে বলল, চিনি স্যার।
এই বস্তু আমার ঘরে এলো কীভাবে? ঠিকমতো জবাব দিবে। বলো। কীভাবে এসেছে? কে এনেছে? কে এই জিনিস ব্যবহার করেছে?
আমি জানি না স্যার।
কে জানে?
ম্যানেজার সাব জানে।
ম্যানেজার সাহেব কাল রাতে এখানে ছিল?
জি স্যার।
কোনো মেয়ে এসেছিল তার কাছে?
জি স্যার।
কোন মেয়ে?
নাম জানি না স্যার। আজেবাজে মেয়ে।
ম্যানেজার কি প্রায়ই ফার্মেসিতে থেকে যেত?
জি স্যার।
আমাকে আগে বলো নি কেন?
ম্যানেজার সাব বলতে নিষেধ করেছিলেন।
আচ্ছা তুমি যাও। ম্যানেজারকে পাঠাও।
হেদায়েতুল ইসলাম এসে মাথা কাত করে দাঁড়িয়ে রইল। হাবিবুর রহমান। ভেবে পেলেন না এত বড় একটা বদমাশ এত দিন বদমায়েশি করে যাচ্ছে, তিনি কিছুই বুঝতে পারেন নি। উল্টো তার বিয়েও ঠিক করে ফেলেছেন।
তোমার চাকরি নট।
জি আচ্ছা স্যার।
ক্যাশের চাবি আমার কাছে দিয়ে বিদায় হও।
জি আচ্ছা।
এক তারিখ এসে ভাংতি মাসের বেতন নিয়ে যাবে।
হেদায়েতুল ইসলাম পিচ করে তার পায়ের কাছে থুথু ফেলে বলল, বেতন লাগবে না।
হাবিবুর রহমানের এই পর্যায়ে ধৈর্যচ্যুতি হলো। তিনি সামছুর দিকে তাকিয়ে বললেন, হারামজাদা ম্যানেজারটার গালে শক্ত করে একটা চড় দাও দেখি।
সামছু চড় দেয় নি। মাথা নিচু করে বের হয়ে গেছে। সামছুটাও বদমাশ। তাকেও বিদায় করা উচিত। একসঙ্গে সব বিদায় করলে তিনি চলবেন কীভাবে? এই তো এখনই সামছুকে লাগবে। বাসায় বাজার পাঠাতে হবে। আজ টাটকা মলা মাছ পেয়েছেন। মাছ এখনই না পাঠালে টাটকা মাছ কেনা অর্থহীন হয়ে যাবে। রাতে ফার্মেসিতে কাউকে না কাউকে থাকতে হবে। তার পক্ষে ফার্মেসিতে থাকা সম্ভব না। হঠাৎ করে সালেহার শরীর অতিরিক্ত খারাপ করেছে। একা একা বাথরুমে যেতে পারে না। তাকে ধরে ধরে নিতে হয়।
ম্যানেজারের ঘটনা শুনে তার কী রিঅ্যাকশান হয় কে জানে। রোগে ভুগে ভগে তার মেজাজ হয়েছে অতিরিক্ত খারাপ। সামান্য কারণে এমন হৈচৈ শুরু করে! সালেহাকে মূল ঘটনা বলা যাবে না। ঘটনা অতিরিক্ত নোংরা। বলতে হবে টাকা-পয়সা চুরি করেছে বলে চাকরি গেছে। তৌহিদা বেচারির ভাগ্যটা খারাপ যাচ্ছে। কোনো বিয়ে নিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত এগুতে পারছেন না। মনে হয় তাবিচ-কবচের কোনো ব্যবস্থা করতে হবে। বিয়ে-শাদির জন্যে তাবিচ-কবচে ভাললা তদবির আছে। সবচে ভালো হতো যদি আজমির শরিফের সুতা এনে বাঁ-হাতে পরানো যেত। আজমির শরিফের সুতা মন্ত্রের মতো কাজ করে।
