তৌহিদা বলল, বাসায় যাব। আমার শরীরটা খারাপ লাগছে।
এসো আমি একটা ট্যাক্সি করে দেই।
তৌহিদা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল, আপনাকে আসতে হবে না।
কাঁদছ কেন?
আমার ইচ্ছা হচ্ছে কাদছি। আপনার কী?
দুটা মিনিট বসো তো। চা খাও।
এই মানুষটা তাকে চা খেতে বলছে। দাঁড়কাকটাও বলেছিল। দুজনের কথা বলার ধরন কত আলাদা।
তৌহিদা উঠে দাঁড়াল। মতিন ঝট করে তার হাত ধরে টেনে বসাল। দাঁড়কাকটাও তার হাত ধরেছিল।
তৌ শোন, মন খারাপ করে কাঁদতে কাঁদতে তুমি আমার ঘর থেকে যাবে তা আমি হতে দেব না।
তৌহিদা ফেঁপাতে ফোঁপাতে বলল, আপনি আমার মন ভালো করে দেবেন?
মতিন বলল, অবশ্যই।
তৌহিদা বলল, কীভাবে?
কোনো একটা জটিল জিনিস তোমার মাথায় ঢুকিয়ে দেব। একটা ধাধা। তুমি ধাধার রহস্য বের করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। মন খারাপ ভাব দূর হয়ে যাবে। তুমি একটা কাজ কর, ড্রয়ারটা খোল। কমলের লেখা সিক্রেটটা ড্রয়ারে আছে। হাতে নাও। পড়। দেখ কোনো অর্থ বের করতে পার কি-না।
তৌহিদা ড্রয়ার খুলে কাগজ হাতে নিল। হিজিবিজি এইসব কী লেখা? এর অর্থ কী?
অর্থ বের করার চেষ্টা কর।
তৌহিদা গভীর মনোযোগে লেখা পড়ার চেষ্টা করছে।
মতিন বলল, দেখি তোমার বুদ্ধি।
terces ym uoy gnillet ma I owN. kram htrib a evah I. redluohs thgiR. der si ruoloC…
তৌহিদা কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বলল, এটা কি কোনো বিদেশী ভাষা?
বিদেশী ভাষা অবশ্যই। তবে তোমার জানা ভাষা। ইংরেজি।
কমল তার ঘরের রকিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছিল। মুনা দরজার পাশ থেকে বললেন, কমল, আসব?
কমল জবাব দিল না। আগের মতোই দুলতে থাকল। মুনা ঘরে ঢুকলেন। ছেলের ডানপাশে রাখা সাইডটেবিলে বসলেন। কমলের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি যদি দোলা বন্ধ কর তাহলে তোমার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করতে পারি।
এখন গল্প করব না।
গল্প না। তোমাকে আমার কিছু জরুরি কথা বলা দরকার।
কমল বলল, won ton.
এর মানে কী? কমল বলল, এর মানে Not now.
মুনা বললেন, কথাটা আমার এখনই বলা দরকার।
তাহলে বলো। কিন্তু আমি দোলা বন্ধ করব না।
তুমি না-কি তোমার বাবাকে বলেছ মতিন নামের লোকটিকে ছাড়া তুমি কোথাও যাবে না?
হুঁ।
কেন?
বাবাকে explain করেছি।
আমাকেও কর। তোমার মুখ থেকেই তোমার এক্সপ্লেনেশন শুনতে চাই।
এককথা বারবার বলতে ইচ্ছা করে না।
তুমি এককথা বারবার বলো।
এখন বলব না। এখন আমি অন্য একটা জিনিস নিয়ে চিন্তা করছি।
জিনিসটা কী?
Hilberts hotel paradox. হিলবার্টের হোটেলে আছে অসীম সংখ্যার রুম। প্রতিটি রুমে একজন অতিথি আছে। তখন হঠাৎ করে আরো অসীম সংখ্যার অতিথি উপস্থিত হলো। তারা কোথায় থাকবে? মা, তুমি বলো তারা কোথায় থাকবে?
মুনা হতাশ গলায় বললেন, তারা অন্য হোটেলে যাবে।
কমল বলল, না। কারণ আলফা নাল প্লাস আলফা নাল সমান সমান আলফা নাল। আবার আলফা নাল গুণন আলফা নাল সমান সমান আলফা নাল।
আলফা নাল কী?
আলফা শব্দ এসেছে হিব্রু আলেফ থেকে। আলফা নাল হলো যেখানে সব স্বাভাবিক সংখ্যা আছে। ম্যাথমেটিশিয়ান Cantor এটা বের করেছিলেন। মা, বোর্ডে লিখব?
মুনা কিছু বললেন না। কমল উৎসাহের সঙ্গে বোর্ডের সামনে দাঁড়াল। হাতে লাল চক নিয়ে লিখতে লাগল—
a0 + 1 = a0
a0 + a0 = a0
a0 x a0 = a0
(a0)^50 = a0
(a0)^(1/2) = a0
মুনা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকার আর অর্থ হয়। চলে যাওয়াও যাচ্ছে না, কমল মন খারাপ করবে। বিদঘুটে লেখাগুলি লিখে সে যে আনন্দ পাচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে। তার চোখ ঝলমল করছে। তাকে দেখাচ্ছেও সুন্দর। একজন ক্ষুদে মাস্টার। চক-ডাস্টার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ছড়ার কানাই মাস্টার–
আমি আজ কানাই মাস্টার
পড় মোর বিড়াল ছানাটি…
কমল মার দিকে তাকিয়ে বলল, মা, ইন্টারেস্টিং না?
মুনা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন। কমল বলল, এরচে ইন্টারেস্টিং জিনিস দেখবে?
এরচে ইন্টারেস্টিং জিনিসও আছে?
অবশ্যই আছে। এখন আমি একটা সিরিজ লিখব। সিরিজটা মন দিয়ে দেখ।
কমল বোর্ডের একমাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত একটা সিরিজ লিখল–
1-1+1-1+1-1+1-1+1-1…
মা, সিরিজটা দেখেছ?
হুঁ।
এর উত্তর কত?
মুনা বললেন, উত্তর শূন্য। প্লাস মাইনাসে সব কাটাকাটি হয়ে যাচ্ছে।
কমল বলল, একই সিরিজ আমি ব্র্যাকেট দিয়ে লিখছি। দেখ কী হয়–
1+(-1+1)+(-1+1)+(-1+1)…
এর উত্তর কত মা?
মুনা বললেন, ওয়ান!
কমল বলল, এখন কি মজাটা বুঝতে পারছ মা? একই সিরিজের উত্তর একবার হচ্ছে শূন্য। আরেকবার হচ্ছে One, অদ্ভুত না?
মুনা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন।
কমল বলল, One যদি হয় বাতি জ্বলা আর শূন্য যদি হয় বাতি নেভা, তাহলে কী হয়? এই সিরিজটা অগ্রসর হচ্ছে, বাতি জ্বলছে বাতি নিভছে। আমরা পুরোপুরি কখনো বলতে পারব না–বাতি জ্বলছে না নিভছে।
মুনা বললেন, তোমার এইসব শুনে আমার মাথা ধরে যাচ্ছে। তুমি বাতি জ্বালাতে থাক নিভাতে থাক, আমি ঘুমুতে গেলাম।
সালেহ ইমরান তাঁর স্টাডিরুমে টিভি ছেড়ে বসেছেন। দেখছেন সিএনএন। টিভিতে একদল সন্ত্রাসীকে দেখাচ্ছে। তারা রাশিয়ার একটা স্কুলের একদল ছাত্রকে আটকে রেখেছে। হুমকি দিচ্ছে সবাইকে মেরে ফেলা হবে। তবে তাদের দলের যে কজন রাশিয়ার কারাগারে আছে তাদের ছেড়ে দিলে এই কাজটা তারা করবে না। সালেহ ইমরান ভেবেই পাচ্ছেন না একদল অবোধ শিশুকেও কেউ জিম্মি করতে পারে! ঘটনা কোনদিকে মোড় নেয় দেখার জন্যে তিনি আজ প্রায় সারাদিনই টিভির সামনে বসেছিলেন। তার ধারণা শেষ পর্যন্ত প্রতিটি শিশুই মুক্তি পাবে। শিশুদের বাবা-মারা বাইরে অপেক্ষা করছেন। তারা যখন তাদের বাচ্চাদের ফিরে পাবেন তখন যে আনন্দময় পরিবেশ হবে সেটা দেখার জন্যেই সালেহ ইমরান অপেক্ষা করছেন। তার ধারণা এই দৃশ্যটি হবে জগতের মধুরতম কিছু দৃশ্যের একটি।
