তৌহিদা ঝট করে উঠে দাঁড়াল। হেদায়েতুল ইসলাম বলল, কী হলো, যাও কোথায়?
তৌহিদা বলল, আমার কাজ আছে।
চা আনতে বলেছি। চা খেয়ে যাও। এই ফাঁকে প্রেসারটা মেপে দেই। আমি সিওর তোমার প্রেসার আছে।
তৌহিদা প্রায় ছুটেই বের হয়ে গেল। কিছুই বলা যায় না এই লোক তাকে ঝাপ্টে ধরে ফেলতে পারে।
এই শোন, স্যারকে কী বলব?
আপনার যা ইচ্ছা বলুন।
সাহসী মেয়ে তৌহিদা কখনোই ছিল না। আশ্রিত মেয়েরা কখনো সাহসী হয় না। তাদের মধ্যে পরগাছা ভাব থেকেই যায়। তারপরেও সে আজ ভালো রকম সাহস দেখাল। বাসায় ফিরে না গিয়ে রিকশা নিয়ে মতিনের মেসে উপস্থিত হলো। মতিনের মেসে (বেঙ্গল মেস) সে আগে কখনো আসে নি। কথাটা পুরোপুরি সত্যি না। এর আগে দুবার এসেছে, তবে ভেতরে ঢোকে নি। ভেতরে ঢোকার সাহস হয় নি। গেটের সামনে থেকে ফিরে গেছে। আজ সে ঢুকে পড়েছে। রুম নাম্বার সতেরো। তৌহিদা জানে না সে মতিনকে কী বলবে। তার জীবনের ভয়ঙ্কর বিপদের কথাটা হয়তো বলবে। কিংবা কিছুই বলবে না। আমেকদিন এই মানুষটাকে সে দেখে না। কিছুক্ষণ চোখের দেখা দেখল। সেটাও তো কম না। তার যেমন কপাল, রুম নাম্বার সতেরোর সামনে দাঁড়িয়ে দেখবে তালা ঝুলছে। কিছু কিছু মানুষের কপাল এত খারাপ হয় কেন?
দরজায় তালা নেই। দরজা ভেতর থেকে বন্ধও না। সামান্য ফাক হয়ে আছে। তৌহিদার এখন কী করা উচিত? দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে যাওয়া? না-কি দরজায় টোকা দেয়া?
তৌহিদা দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল।
আরে তৌ তুমি! What a pleasant surprise. আজ সকাল থেকে মনটা খুব খারাপ। তোমাকে দেখে মন ভালো হয়ে গেছে।
তৌহিদার পা কাঁপছে। কেন জানি তার মনে হচ্ছে সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। পড়ে গেলেই ভালো হয়। মতিন ভাই তখন বাধ্য হয়ে তাকে ধরাধরি করে বিছানায় শুইয়ে দেবে। সে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকবে মতিন ভাইয়ের বিছানায়। এটাও কম কী? তার মতো মেয়ের জীবনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দই থাকবে। বড় আনন্দ কখনোই থাকবে না। বড় আনন্দ ভাগ্যবতীদের। জন্যে। সে কোনোকালেই ভাগ্যবতী ছিল না।
তৌ, এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসো।
তৌহিদার মনে হলো মতিন ভাই তাকে তৌ ডাকছেন না। তিনি ডাকছেন বৌ। আর কী সুন্দর করেই না ডাকছেন। বৌ, এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসো।
সে কোথায় বসবে? ঘরে একটা চেয়ার আছে। চেয়ারে বসলে মতিন ভাইয়ের কাছ থেকে অনেক দূরে বসা হয়। সে যদি বিছানায় মতিন ভাইয়ের পাশে বসে তাহলে কি তিনি রাগ করবেন? কিংবা তাকে বেহায়া ভাববেন?
তৌহিদা চেয়ারে বসতে বসতে বিড়বিড় করে কী যেন বলল! কী বলল সে নিজেও বুঝতে পারল না।
মতিন বলল, তুমি এত দূরে বসেছ কেন? বিছানায় বসো। আমার কাছাকাছি বসো। তোমাকে দেখে খুবই অবাক হয়েছি। আমার মেসের ঠিকানা কোথায় পেয়েছ? আচ্ছা থাক, ঠিকানা কোথায় পেয়েছ বলার দরকার নেই। ঠিকানা পাওয়া ইম্পোর্টেন্ট না। ঠিকানায় চলে আসা ইম্পোর্টেন্ট।
তৌহিদার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। সে অনেক কষ্টে চোখের পানি সামলে তিনের বিছানায় এসে বসল। মতিন বলল, এখন শোন কেন আমার মনটা খারাপ।
বলুন।
একটা দশ এগারো বছরের ছেলে আছে, তার নাম লমক!
কী নাম? লমক?
তার নাম কমল, আমি উল্টো করে বললাম, লমক। কারণ এই ছেলেটা অনেক কথাই উল্টো করে বলে।
কেন?
ছেলেটা আর দশজনের মতো না। আলাদা। এদের বলে অটিস্টিক বেবি। এই ধরনের শিশুদের অনেকেই মানসিক রোগী ভাবে। তাদের ভাবভঙ্গি সেরকমই। তবে তারা কোনো কোনো দিকে অস্বাভাবিক মেধাবী হয়। কেউ হয় সঙ্গীতে আবার কেউ হয় অঙ্কে। এই ছেলেটির মেধা হাইয়ার ম্যাথে। ছেলেটা তার একটা সিক্রেট আমাকে লিখে জানিয়েছিল। সিক্রেটটা আমি এতদিন পড়ি নি। ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলাম। আজ সকালে পড়েছি। পড়ার পর থেকে মনে হচ্ছে কেন পড়লাম। সব সিক্রেট জানতে নেই।
তৌহিদা ক্ষীণ স্বরে বলল, সিক্রেটটা কী?
মতিন বলল, সিক্রেট বলে বেড়ানোর বিষয় না। তাহলে আর সিক্রেট থাকে না।
তৌহিদা বলল, সে আপনাকে তার সিক্রেট বলল কেন?
সিক্রেট কাউকে না কাউকে বলতে হয়। তুমি কি তোমার জীবনের সব গোপন বিষয় নিজের কাছে রেখে দিয়েছ? কাউকে নিশ্চয়ই বলেছ।
আমার বলার কেউ নেই।
এখন নেই, কোনো একদিন হবে তখন বলবে।
তৌহিদা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, গোপন কথা বলার মতো কেউ হবে
মতিন বলল, এরকমও হতে পারে। তখন কী করতে হয় জানো? তখন গোপন কথা দিয়ে কবিতা লিখতে হয়। কবিতা লিখে সবাইকে জানিয়ে দিতে হয়। নদ্দিউ নতিম এই কাজটাই সারাজীবন করেছেন।
নদ্দিউ নতিম কে?
একজন উজবেক কবি। যেমন তাঁর কবিতা অসাধারণ, মানুষ হিসেবেও তিনি অসাধারণ। তার একটা কবিতা তোমাকে পড়ে শোনাই? গোপন কথা নিয়ে তার একটা কবিতা আছে–
একটি গোপন কথা
পদ্ম জেনেছিল
পদ্ম তাই লজ্জায়
লুকিয়েছে মুখ
মীনদের মাঝে কোলাহল
পদ্মের হয়েছে আজ
কেমন অসুখ?
মতিন কবিতা পড়ে যাচ্ছে, পাশে বসে চোখ মুছছে তৌহিদা। একই সঙ্গে তার ভয়ঙ্কর কষ্ট হচ্ছে আবার ভয়ঙ্কর আনন্দও হচ্ছে। কষ্টের কারণটা স্পষ্ট, কিন্তু আনন্দের কারণটা স্পষ্ট না। সে সারাজীবন এই মানুষটার পাশে বসে থাকতে পারবে না। তাকে একসময় উঠে চলে যেতে হবে। তার একদিন বিয়ে হবে। গায়ে ঘামের গন্ধভর্তি কোনো এক দাঁড়কাকের সঙ্গেই হবে। সেই দাঁড়কাক তাকে কবিতা শোনাবে না, সে হাত বুলাবে তার উরুতে।
তৌহিদা কবিতা পড়ার মাঝখানেই উঠে দাঁড়াল। মতিন বলল, কোথায় যাও?
