বাবাজি শুধু যে আমাকে যন্ত্রণা করে তা-না, মাসি পিসিকেও খুব যন্ত্রণা করে। তাদেরকে তাড়া করে। তারাও কম যায় না। প্রায়ই দেখি দাত-মুখ খিচিয়ে বাবাজির দিকে। আসছে। তাদের বৈরীতার ভেতরও মনে হয় একধরনের সখ্য আছে। কবে একদিন দেখলাম, বাবাজির পিঠে মাসি পিসি বসে আছে। বাবাজি ওদের পিঠে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই হেলেদুলে হাঁটছে। বাঘ এবং হরিণের সঙ্গে বানরের সখ্যের কথা শুনেছি। হাতির বিষয়ে শুনি নি।
নিজের আনন্দের কথা লিখেই চিঠি ভরে ফেললাম–ততার বিষয়ে কিছুই জানতে চাইলাম না। সরি এবাউট দ্যাট। তুই লিখেছিস তৌ-এর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয় নি। বিয়ে হবে না জানতাম। তারপরেও কষ্ট লেগেছে। তৌ মেয়েটার জন্যে কষ্ট। বিয়ে ভাঙার ঘটনায় মেয়েরা খুব কষ্ট পায়। এই বিষয়টা আমি জানি। আমার বড় বোনের বিয়ে এভাবেই ভেঙেছিল। গায়েহলুদের পর বিয়ে ভাঙল। বড় আপার মাথা খারাপের মতো হয়ে গিয়েছিল। তাঁকে মানসিক ডাক্তার দেখাতে হয়েছিল। এই ঘটনার পর অনেক ভালো ভালো পাত্র বাবা এনেছিলেন, বড় আপা বিয়ে করতে রাজি হন নি। তিনি বেঁচেছিলেনও অল্পদিন। আমার কেন জানি মনে হয়, বড় আপার সঙ্গে তৌ মেয়েটার চেহারারও মিল আছে। দেখলে বলতে পারতাম। সেই সুযোগ তো নেই।
মতিন শোন, তৌ মেয়েটার বিয়ে তুই ভেঙেছিস, কাজেই তোর দায়িত্ব মেয়েটার যেন ভালো বিয়ে হয় সেটা দেখা। আমি চাই না আমার বড় আপার ভাগ্যে যা ঘটেছে তৌ-এর ভাগ্যে তাই ঘটে।
আজ এই পর্যন্ত।
ইতি–
কঠিন গাধা
পুনশ্চ-১: তোকে বই পাঠাতে বলেছিলাম, বই এখনো পাই নি। সূর্যমুখী ফুলের বিচি পাঠাবি। অনেক বিচি। আমি ঠিক করেছি, একটা গোটা পাহাড়ে সূর্যমুখীর চাষ করব।
পুনশ্চ-২; আসল কথাটাই তোকে লেখা হয় নি। Autobiography of a Fictitious Poet শেষ হয়েছে। কপি নাসির ভাইয়ের কাছে। পাঠিয়ে দিয়েছি।
নাসির ভাইকে মনে আছে না? আমার চাচাতো ভাই। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের শিক্ষক। উনার মতামত জানার জন্যে পাঠিয়েছি। দেখি উনি কী বলেন।
তৌহিদা এসেছে নিউ সালেহা ফার্মেসিতে
তৌহিদা এসেছে নিউ সালেহা ফার্মেসিতে। সে তার ভাইজানের সঙ্গে গোপনে কিছু কথা বলবে। সালেহা বুবু তাকে নিয়ে ভয়াবহ পরিকল্পনা করেছেন, সেই কথা। কথাগুলি সে শেষ পর্যন্ত বলতে পারবে কি-না বুঝতে পারছে না। হয়তো বলতে পারবে না। কিছুক্ষণ ভাইজানের সামনে চোখমুখ লাল করে বসে থেকে উঠে চলে আসবে। সে কী করে ভাইজানকে বলবে–ভাইজান, সালেহা বুবু আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে দেয়ার চিন্তা করছেন।
ভাইজান তার মুখ থেকে এ ধরনের কথা শুনলে বিরক্ত হবেন। হয়তো তাকে ধমক দিয়ে বলবেন, তোর বুবু অসুস্থ। মাথার ঠিক নাই। সে উল্টাপাল্টা কিছু বলল আর তুই আমাকে সেটা বলার জন্য ফার্মেসিতে চলে এসেছিস? তোর লজ্জা লাগল না? ভাইজান অবশ্যই এ নিয়ে তাকে ধমক দিতে পারেন। কত ছোটবেলায় সে ভাইজানের সঙ্গে থাকতে এসেছে। তখন সবসময় তার নাক দিয়ে সিকনি পড়ত। চোখে পড়লেই ভাইজান বলতেন, কাছে আয় নাক ঝেড়ে দেই। ঝড়বৃষ্টির রাতে ভয়ে তার ঘুম হতো না। বজ্রপাতের সময় বিছানায় বসে কাঁদত। তখন ভাইজান বলতেন, আয় আমার সঙ্গে এসে ঘুমা। গায়ের উপর পা তুলবি না। গায়ের উপর পা তুললে পা ভেঙে দেব।
হাবিবুর রহমান ফার্মেসিতে ছিলেন না। তিনি মোহাম্মদপুর বাজারে গেছেন। শিং মাছ কিনতে। কাচকলা দিয়ে শিং মাছের ঝোল অতি সহজপাচ্য। সালেহার জন্য শিং মাছ তিনি দেখেশুনে কিনেন। পেট লাল হয়ে আছে এরকম শিং মাছ চলবে না। লাল পেটের শিং মাছ গুরুপাক। এই তথ্য সবাই জানে না। তিনি এক কবিরাজের কাছে শুনেছেন।
ফার্মেসির ম্যানেজার হেদায়েতুল ইসলাম তৌহিদাকে দেখে আনন্দিত গলায় বলল, আস আস। আজ সকাল থেকেই কেন জানি মনে হচ্ছিল তুমি আসবে। এসে ভালো করেছ, কিছু ওষুধপত্র দিয়ে দিব। প্রেসারটাও মেপে দিব। সবারই উচিত সপ্তাহে একবার প্রেসার মাপা।
তৌহিদা বলল, ভাইজান কোথায়?
স্যার বাজারে গেছেন। বাজার থেকে সরাসরি ফার্মেসিতে আসবেন।
তৌহিদা ভেতরের ঘরে এসে বসল। ম্যানেজার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ঢুকে ফ্যান ছাড়তে ছাড়তে বলল, ইস ঘেমে কী অবস্থা! তোমার গা কি বেশি ঘামে? বগল ঘামে? বগল ঘামার লোশন আছে। দিয়ে দিব।
পুরুষমানুষের মুখে এটা কী ধরনের কথা! সে আরো কী বলবে কে জানে। তৌহিদার মনে হলো তার ঘরে এসে বসা ঠিক হয় নি। এই লোক এখন অবশ্যই তার গায়ে হাত দিবে। লোকটার চোখ চকচক করছে।
তৌহিদা বলল, আমি যাই।
বসতে না বসতেই যাই। তোমার সমস্যাটা কী? আমি কি পরপুরুষ? দুদিন পরে আমাকে বিয়ে করছ না!
তৌহিদা যা ভেবেছিল তাই, লোকটা তার হাত ধরে ফেলেছে। এই হাত শুধু যে তার হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে তা না, অন্য কোথাও যাবে। ঐদিন লোকটাকে দাঁড়কাকের মতো লাগছিল। আজও দাঁড়কাকের মতোই লাগছে। বদমাশটা একটা শার্ট পরেছে, উপরের বোতাম লাগায় নি। বুকের পাকা লোম দেখা যাচ্ছে। এরচে কুৎসিত দৃশ্য কি পৃথিবীতে কিছু আছে? তৌহিদা একদৃষ্টিতে লোকটার হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। নখ বড় বড় হয়ে আছে। নখের নিচে ময়লা। নাম যেন কী লোকটার? হেদায়েতুল ইসলাম। তার একটা ছেলে একটা মেয়ে। ছেলেটার নাম গোলাপ। এই লোকটার সঙ্গে বিয়ে হলে সে তাকে ডাকবে গোলাপের বাপ। লোকটার হাত এখন তৌহিদার উরুতে। তৌহিদা কী বলবে–এই গোলাপের বাপ, হাত সরাও? না-কি বলবে, এই হারামজাদা! হাত কোথায় রেখেছিস? থাপ্পড় দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দিব।
