মতিন তোমার সঙ্গে থাকবে?
হ্যাঁ। তাকে ছাড়া আমি যাব না।
আমি যতদূর জানি মতিন যে যাবে না এই বিষয়টা পরিষ্কার করে তোমাকে বলা হয়েছে।
মতিন যাবে। মতিন অবশ্যই যাবে।
সালেহ ইমরান আর কথা বাড়ালেন না, উঠে দাঁড়ালেন। তিনি একধরনের স্বস্তিও বোধ করছেন। ছেলে বাইরে যাবে না। তার চোখের সামনেই থাকবে। এই ঘটনাটি আপনাআপনি ঘটে গেছে। তাকে কিছু করতে হয় নি। মুনার কাছে। ব্যাখ্যা করতে হবে না।
মতিনকে তার মেসবাড়িতে পাওয়া গেল না। মেস ম্যানেজার বলল, উনার আসা যাওয়ার কোনো ঠিক ঠিকানা নাই। দশ মিনিট পরেও আসতে পারে, আবার দশ ঘণ্টা পরেও আসতে পারে।
কমল বলল, দশ ঘন্টা পর তো দিন হয়ে যাবে।
উনি যেমন মানুষ রাত পার করে দিনেও আসতে পারে। দুনিয়ায় হিসাব ছাড়া মানুষ কিছু আছে, ইনি তার একজন। আপনারা অপেক্ষা করতে চাইলে অপেক্ষা করতে পারেন।
সালেহ ইমরান কিছু বলার আগেই কমল বলল, আমরা অপেক্ষা করব।
ম্যানেজার বলল, আমার ঘরে অপেক্ষা করেন। কোনো অসুবিধা নাই।
ম্যানেজারের ঘরে দুজন বসে আছে। সালেহ ইমরান ঘড়ি দেখলেন। উনিশ মিনিট পার হয়েছে। কমল কোনো অস্থিরতা দেখাচ্ছে না। শান্তভঙ্গিতে চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে দীর্ঘ সময় এইভাবে বসে থাকতে পারবে। অপেক্ষা করতে তার খারাপও লাগছে না। সালেহ ইমরান ঠিক করেছেন ছেলে যতক্ষণ অপেক্ষা করতে চায় তিনি ততক্ষণই অপেক্ষা করবেন। নিজ থেকে বলবেন না, অনেক অপেক্ষা করা হয়েছে এখন চল যাওয়া যাক। অপেক্ষার একটা পরীক্ষা সালেহ ইমরান আজ দিতে চান।
মতিন আছে নিশুদের বাড়িতে। নিশু রান্না করছে, সে পাশে বসে আছে। রান্না এমন কিছু না। ডাল, বেগুন দিয়ে ডিমের তরকারি। নিশু বলল, তুমি তো আমার সঙ্গে খাবে, তাই না?
মতিন বলল, হুঁ।
নিশু বলল, ফ্রিজে কিছুই নেই। অনেক দিন বাজার করা হয় না।
মতিন বলল, কী কী লাগবে বলো, আমি এনে দেব।
নিশু বলল, লাগবে না। খাওয়া দাওয়াটা আমার কাছে ইম্পোর্টেন্ট না।
তোমার কাছে কোনটা ইম্পোর্টেন্ট?
বেঁচে থাকাটা ইম্পোর্টেন্ট। বাঁচা উইথ ডিগনিটি।
ডিগনিটি বলতে কী বুঝাচ্ছ?
শুধু শুধু প্যাঁচাল পাড়বে না। ডিগনিটির অর্থ তুমি জানো।
মতিন সিগারেট ধরাল। তার প্যাকেটে একটা মাত্র সিগারেট। সিগারেট ধরাবার পর সে সামান্য টেনশনে পড়ে গেল। সঙ্গে সিগারেট নেই, এই চিন্তাটাই টেনশনের।
নিশু বলল, তোমার প্যাকেট তো মনে হয় খালি। প্যাকেটে সিগারেট থাকলে আমি একটা খেতাম।
মতিন অবাক হয়ে বলল, তুমি সিগারেট খাও না-কি?
নিশু বলল, এখন খাই। বাবাকে কবর দিয়ে বাসায় ফিরে কেমন যেন হয়ে গেলাম। ভয়, অবসন্ন ভাব, ক্লান্তি।
রাতে একা ছিলে?
অবশ্যই একা। দোকা পাব কোথায়?
তুমি খুবই সাহসী মেয়ে।
যত সাহসী তুমি আমাকে ভাবছ তত সাহসী আমি না। রাতে বিছানায় শুয়েছি, হঠাৎ শুনি বাবার ঘর থেকে কাশির শব্দ আসছে। উনি সিগারেট টানছেন, সিগারেটের গন্ধ আসছে। হেলুসিনেশন আর কী। গেলাম বাবার ঘরে। অনেকক্ষণ বসে রইলাম। বাবার টেবিলের উপর দেখি এক প্যাকেট সিগারেট। ভয় কাটানোর জন্যে একটা ধরালাম। সেই থেকেই আমার শুরু।
মতিন বলল, ঐ রাতে আমার আসা উচিত ছিল। আমি আসি নি কেন কারণটা বলব?
কারণ বলেছ–হস্তীবিষয়ক রচনা। নদ্দিউ নতিমের নতুন লেখা।
মতিন বলল, মূল কারণ এটা। আমি মৃত মানুষের সঙ্গে যেতে পারি না। আমার মা মারা গেছেন এই খবর পেয়ে আমি পালিয়ে চলে গিয়েছিলাম। ফিরেছি তিনদিন পর। এসে দেখি মার কবর হয়ে গেছে। খুবই স্বস্তি পেয়েছি। ভয় ছিল দেখব মাকে কবর দেয়া হয় নি। আমি শেষ দেখা দেখব এইজন্যে রেখে দিয়েছে।
নিশু বলল, তুমি না আসায় আমার কোনো সমস্যা হয় নি। তোমার দুলাভাই চলে এসেছিলেন। সবকিছু তিনি করলেন। উনি একজন সত্যিকার ভালোমানুষ।
ঠিকই বলেছ।
তোমার বোন ভাগ্যবতী।
বোন ভাগ্যবতী তো বটেই। আজ রাতে যদি আমি তোমার এখানে থাকি তোমার কি কোনো সমস্যা হবে?
নিশু বলল, সমস্যা কী? তুমি বাবার ঘরে শুয়ে থাকবে। আজ থাকতে চাচ্ছ কেন?
মতিন বলল, বুঝতে পারছি না। হঠাৎ মনে হচ্ছে থেকে যাই। রাতে তোমার সঙ্গে গল্প করি। May be I am in love with you.
নিশু বলল, May be.
মতিন বলল, তোমার বিদেশ যাত্রা কি ঠিক আছে?
নিশু বলল, ঠিক আছে, তবে এক সেমিস্টার পিছিয়েছি।
এখন তো নিশ্চয়ই বিয়ে করে যাচ্ছ না।
না। বিয়ে টিয়ের ঝামেলা শেষ।
সারাজীবন বিয়ে করবে না?
সারাজীবনের কথা বলতে পারছি না। আমি বর্তমানে বাস করি। আমার সব কিছুই বর্তমান নিয়ে। আমি বর্তমানে বিয়ে করব না।
গুড।
নিশু বলল, বিয়ে করব না, এটা গুড?
মতিন বলল, তুমি যে তোমার ইচ্ছাটা জোর দিয়ে বলতে পারছ এটা গুড। কোনো মানুষই নিজের গোপন ইচ্ছা জোর দিয়ে বলতে পারে না। নদ্দিউ নতিমের মতো লোকও পারেন নি।
এখানে নদ্দিউ নতিম কোত্থেকে এলো?
কথার কথা বললাম।
নিশু বলল, নদ্দিউ নতিমের ভূতটা ঘাড় থেকে নামাও। তুমি কি বুঝতে পারছ যতই দিন যাচ্ছে এই ভূত ততই তোমার উপর জেঁকে বসছে?
বসুক না, ক্ষতি কী? নদ্দিউ নতিম লোকটা কিন্তু খারাপ না। আমি প্রায়ই তাঁকে স্বপ্নে দেখি।
স্বপ্নে দেখ?
হুঁ। ধবধবে ফরসা গায়ের রঙ। জোব্বার মতো একটা পোশাক পরেন। লম্বাটে মুখ। চোখ তীক্ষ।
কথাবার্তা বাংলায় বলেন?
আমাদের কথাবার্তা হয় না। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি।
