১. একটি অ্যালার্ম টেবিল ঘড়ি।
২. দুটি ফ্লাস্ক।
৩. নিউটনের লেখা অঙ্কের বই Principia Mathematica.
৪. সুইজারল্যান্ডে যত বিমান যায় এবং আসে তার টাইমটেবল।
৫. দুটি জিওমেট্রি সেট।
৬. একটি ইংলিশ টু বেঙ্গলি ডিকশনারি।
৭. একটি ইংলিশ টু জার্মান ডিকশনারি।
৮. একটি ইংলিশ টু রুশ ডিকশনারি।
মুনা ৩, ৪ এবং ৮ নাম্বার আইটেম ছাড়া বাকি সবই জোগাড় করেছে। ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন সে ইংলিশ টু রুশ ডিকশনারি দিয়ে কী করবে? কমল জবাব দেয় নি।
কমলের সঙ্গে কে কে যাবে তা এখনো ঠিক হয় নি। তার মা যাবে এটা ঠিক হয়েছে। ফারুক সাহেবের ভিসা হয়েছে। তিনি যাবার জন্যে প্রস্তুত। তবে হঠাৎ করে সালেহ ইমরান ঠিক করেছেন তিনি যাবেন। ছেলেকে হোস্টেলে রেখে ফিরে আসবেন। সালেহ ইমরান এই সিদ্ধান্ত নেয়ায় আহমেদ ফারুকের যাবার ব্যাপারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মুনা বলেছেন, তুমি যখন যাচ্ছই তখন আর ফারুক সাহেবের যাবার দরকার কী?
সালেহ ইমরান হা না কিছু বলেন নি। তাকে চিন্তিত এবং বিষণ্ণ মনে হয়েছে। ছেলে তার কাছে থাকবে না, দূরদেশে পড়ে থাকবে, এটা তিনি নিতে পারছেন না। তার এই ছেলে আর দশটি স্বাভাবিক ছেলের মতো না। অন্যরকম একটি ছেলে। কোনো একদিন তার রাগ উঠে যাবে কেউ বুঝতে পারবে না। সে গুটিয়ে থাকবে নিজের মধ্যে। প্রবাসী ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকবে তাও না। সে কখনো তাকে টেলিফোন করবে না। ছেলেকে বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঠিক হয় নি। কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে হুট করে তা পাল্টানো যায় না। তিনি মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন ছেলেকে সুইজারল্যান্ডের স্কুলে ঠিকই ভর্তি করাবেন। ছেলে দিন দশেক স্কুলে থাকবে। তিনিও স্কুলের আশেপাশে কোনো একটা হোটেলে থাকবেন। তার দেশে ফিরে আসার সময় যখন হবে তিনি ছেলেকে নিয়ে ফিরবেন। বিষয়টা নিয়ে তিনি এখনো মুনার সঙ্গে আলাপ করেন নি। কারণ মুলা কী বলবে তিনি জানেন। মুনা বলবে, অসম্ভব। সালেহ ইমরানের ইচ্ছা তিনি ছেলের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। এখনো কথা বলা হয়ে উঠে নি। তিনি ঠিক করে রেখেছেন কোনো এক মুভি নাইটে। প্রসঙ্গ তুলবেন।
আজ মুভি নাইট। কমল তার বাবার পাশে বসেছে। দুজনের মাঝখানে তিন ফুটের মতো ফাকা জায়গা। সালেহ ইমরান ছেলের কাছে সামান্য এগিয়ে গেলেন। তিনি যতটুকু এগুলেন কমল ঠিক ততটুকুই সরে গিয়ে তাদের মাঝখানের দূরত্ব ঠিক রাখল।
সালেহ ইমরান বললেন, কমল, আজ কী ছবি?
কমল বলল, তুমি ঠিক কর।
সালেহ ইমরান বললেন, বাংলা ছবি দেখলে কেমন হয়।
কমল বলল, Ko.
সালেহ ইমরান বললেন, Ko মানে কী? Ok?
হুঁ। বাংলা ছবিটার নাম কী?
পথের পাঁচালি। অপু দুর্গার গল্প। তারা দুই ভাইবোন। ছবিতে অপুর যে চেহারা তার সঙ্গে তোমার চেহারার মিল আছে।
বেশি মিল?
খুব বেশি না, তারপরেও কিছুটা মিল আছে।
অপুর কাঁধে কি আমার মতো জন্মদাগ আছে?
সালেহ ইমরান বললেন, তোমার কাঁধে জন্মদাগ আছে নাকি?
কমল বলল, হুঁ।
দেখি?
কমল বলল, এখন দেখাতে ইচ্ছা করছে না।
কখন ইচ্ছা করবে?
কমল বলল, জানি না।
সালেহ ইমরান বললেন, ছবি কি শুরু করব?
কমল বলল, তোমার ইচ্ছা।
সালেহ ইমরান বললেন, একজনের সঙ্গে আরেকজনের চেহারার মিল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমার একটা ব্যাপার মনে এসেছে। পৃথিবীর কোনো মানুষের বুড়ো আঙুলের ছাপ একরকম না, এটা কি তুমি জানো?
জানি।
পৃথিবীতে এত মানুষ এসেছে, এদের কোনো দুজনের বুড়ো আঙুলের ছাপ একরকম না। এটা অদ্ভুত না?
কমল বলল, হুঁ।
সালেহ ইমরান আগ্রহের সঙ্গে বললেন, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আলাদা, অথচ দেখ প্রতিটি আমগাছ একরকম, কাঁঠাল গাছ একরকম। শীতের সময় যে হাজার হাজার মাইগ্রেটরি বার্ড আমাদের দেশে উড়ে আসে তারাও একরকম।
কমল বলল, তারাও প্রত্যেকেই আলাদা। আমরা বুঝতে পারি না। প্রতিটি পাখিই যে আলাদা সেটা একটা পাখি বুঝতে পারবে। প্রতিটি আমগাছও আলাদা, এটা একটা আমগাছ বুঝতে পারবে। আমরা বুঝতে পারব না।
সালেহ ইমরান বললেন, তোমার ব্যাখ্যাটা ইন্টারেস্টিং। তবে সত্যি না।
তুমি কী করে বুঝলে সত্যি না?
সালেহ ইমরান বললেন, আমার মন বলছে এটা সত্যি না।
কমল বলল, আমার মন বলছে এটা সত্যি।
সালেহ ইমরান বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, ধরে নিলাম তুমি যা বলছ তাই সত্যি। এখন কি ছবি শুরু করব?
তোমার ইচ্ছা।
কমল, তোমার কি কোনো কারণে মন খারাপ?
হুঁ।
কেন মন খারাপ?
তোমাকে বলব না।
আমাকে বলবে না কেন?
তোমাকে বললে তুমি আমার মন ঠিক করতে পারবে না। শুধু শুধু কেন বলব?
এমন কেউ কি আছে যে তোমার মন ঠিক করতে পারবে?
আছে। নদ্দিউ নতিম।
আমাদের মতিনের কথা বলছ?
হুঁ।
তুমি মন খারাপ করে আছ এই অবস্থায় ছবি দেখার তো কোনো মানে হয়। না। চল একটা কাজ করি, গাড়ি করে তোমাকে নিয়ে যাই মতিনের কাছে। সে তোমার মন ভালো করে দিক, তারপর ছবিটা দেখি।
কমল সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে আনন্দ। সালেহ ইমরান বললেন, তুমি কি আমার বা তোমার মায়ের সঙ্গর চেয়ে মতিনের সঙ্গ বেশি পছন্দ কর?
কমল হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
সালেহ ইমরান বললেন, তুমি যে একা সুইজারল্যান্ডে থাকবে, আমাকে এবং তোমার মাকে তুমি মিস করবে না?
কমল বলল, না।
সালেহ ইমরান বললেন, মিস করবে না কেন?
কমল বলল, মতিন আমার সঙ্গে থাকবে এইজন্যে মিস করব না।
