তৌহিদা ক্ষীণ গলায় বলল, ভয়ে আসে না। আপনি বকা দিবেন।
ভয়, না? ভয় পায়। ভয় আমি তাকে গিলায়ে খাওয়ায়ে দিব। আমাকে চিনে না। আমি সালেহা বেগম।
তৌহিদা কিছুক্ষণ মোবাইল টেলিফোন নাড়াচাড়া করে ভীত গলায় বলল, উনি টেলিফোন ধরছেন না। বলেই মনে হলো তার মিথ্যাটা বুবু ধরে ফেলবেন। তার রাগ আরো বেড়ে যাবে।
সালেহা মিথ্যা ধরতে পারলেন না। তিনি ক্লান্ত গলায় বললেন, চেষ্টা চালিয়ে যাও। যখন ধরতে পারবে তখন আমাকে দেবে। তারপর দেখবে কত ধানে কত চাল। আমি ঐ কুত্তার বাচ্চাটার বিষ ঝাড়ব। আমার নাম সালেহা বেগম না, আমার নাম সালেহা ওঝা।
মতিন তার মেসের ঘরে। দরজা জানালা বন্ধ। সে লেখা নিয়ে বসেছে। লেখার শিরোনাম নদ্দিউ নতিম এবং একটি হস্তীশাবক। নদ্দিউ নতিম বিচিত্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তিনি একবার শখ করে সার্কাসের দল থেকে একটি হাতির বাচ্চা কিনেছিলেন। হাতির বাচ্চাটা তার সঙ্গে দেড় বছর ছিল। এই দেড় বছরে তিনি কোনো লেখালেখি করেন নি। হাতির বাচ্চা নিয়ে সময় কাটিয়েছিলেন। তিনি তার আজীবনিতে বলেছেন এই দেড় বছর তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়। এই বিষয় নিয়ে লেখা।
লেখার মাঝামাঝি সময়ে নিশুর টেলিফোন এলো। তার গলা ক্লান্ত ও বিষণ্ণ। সে বলল, মতিন, তুমি একটু আসতে পারবে?
মতিন বলল, কোথায়?
ক্লিনিকে। আমি ক্লিনিকের ডক্টরদের চেম্বারে বসে আছি।
মতিন বলল, আসতে পারব না। আমি লেখা নিয়ে বসেছি। খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আছি।
নিশু বলল, মতিন, আমি বিপদে পড়েছি।
মতিন বলল, আমিও বিপদে পড়েছি। নদ্দিউ নতিম হাতির বাচ্চাটার সঙ্গে কথা বলতেন। হাতির বাচ্চা কথোপকথনে অংশ নিত। অংশটা কীভাবে নিত সেটাই ঠিক করতে পারছি না।
নিশু ধরা গলায় বলল, মতিন, কিছুক্ষণ আগে আমার বাবা মারা গেছেন।
মতিন বলল, সে-কী!
নিশু বলল, ডেডবডি নিয়ে আমি কী করব, কোথায় যাব, কবর কোথায় হবে। কিছুই বুঝতে পারছি না। টেনশনে এমন অবস্থা আমি কাঁদতেও পারছি না।
মতিন বলল, তুমি নিশ্চিন্ত মনে বসে থাক। আমি আমার দুলাভাইকে ক্লিনিকের ঠিকানা দিয়ে টেলিফোন করছি। উনি এইসব বিষয়ে বিরাট অ্যাক্সপার্ট লোক। তোমাকে কিছুই করতে হবে না। যা করার উনিই করবেন।
তুমি আসবে না?
মতিন বলল, আমি লেখার এমন এক পর্যায়ে আছি যে লেখা ছেড়ে উঠা সম্ভব না। আচ্ছা হাতির ডাককে বাংলায় কী বলে যেন?
বৃংহতি।
বাহ্ সুন্দর নাম! নিশু শোন, তুমি কি এই ব্যাপারটা লক্ষ করেছ?–ঘোড়ার ডাকে আলাদা নাম আছে, হেষা। হাতির ডাকের আলাদা নাম বৃংহতি। কিন্তু বাঘের ডাকের কোনো আলাদা নাম নেই। বাঘের ডাকের একটা আলাদা নাম থাকা উচিত ছিল না?
নিশু জবাব না দিয়ে লাইন কেটে দিল।
নিশুর প্রচণ্ড পানির পিপাসা পেয়েছে। কাকে সে পানির কথা বলবে? যে ডাক্তার তাকে এখানে বসিয়ে রেখে গেছেন তিনি নেই। অন্য ডাক্তাররা এই ঘরে ঢুকছে বেরুচ্ছে। অনেকেই তাকে দেখছে বিরক্ত চোখে। অপরিচিত একটা মেয়ে তাদের ঘরে জবুথবু হয়ে বসে আছে, বিরক্ত হবারই কথা। একজন আবার জিজ্ঞেস করল, আপনার কি কাউকে দরকার? নিও না-সূচক মাথা নেড়েছে।
নিশু ঘড়ি দেখল। বাবা মারা যাবার পরপরই সে একবার ঘড়ি দেখেছিল। কেন দেখেছিল? মৃত্যুর সময় জানার জন্যে? জন্ম-সময় জানাটা জরুরি। মৃত্যু সময় জেনে কী হবে?
তার বাবা বিখ্যাত কেউ হলে পত্রিকায় নিউজ হতো–জনাব আজিজ আহমেদ অমুক দিন এতটার সময় অমুক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুর সময় তাঁর একমাত্র সন্তান পাশে ছিল। তার ডাক নাম নিশু। সে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী।
আচ্ছা এসব সে কী ভাবছে? তার উচিত হাউমাউ করে কাঁদা। সে কাঁদতেও পারছে না। কান্না আসছে না। এমন কি হতে পারে পরিচিত কেউ আশেপাশে নেই বলে সে কাদতে পারছে না? বাবার জন্যে সে কোনো দুঃখ পাচ্ছে না–এটা তো ঠিক না। বাবা ছাড়া তার কে আছে? কিছুদিন থেকে বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব খারাপ যাচ্ছিল। এই কারণে কি তার মনে বাবার উপর চাপা রাগ আছে? রাগ আছে বলেই এখনো তার চোখ শুকিয়ে আছে।
জীবনের শেষের কয়েকটা দিন তার মাথারও ঠিক ছিল না। আবোলতাবোল কথা বলতেন। একদিন দুপুরে ঘুম থেকে উঠে নিশুকে দেখে বিরক্ত গলায় বললেন, একা এসেছিস কেন? জামাই কই?
নিশু বলল, আমি বিয়ে করেছি নাকি যে জামাই নিয়ে আসব?
আজিজ আহমেদ রাগী গলায় বললেন, আমার সঙ্গে ঠাট্টা ফাজলামি করবি। আমি ঠাট্টা ফাজলামি পছন্দ করি না। তুই যে গোপনে বিয়ে করেছিস এই খবর আমি জানি।
নিশু বলল, এই খবর যদি জানো তাহলে বলো কাকে বিয়ে করেছি?
মতিনকে। আর কাকে!
ও আচ্ছা।
ও আচ্ছা আবার কী? স্বীকার কর।
আচ্ছা যাও স্বীকার করলাম।
তুই একা আসিস কেন? ওকে আনিস না কেন?
মতিন তোমাকে ভয় পায় বলে আসে না। ভাবে তাকে তুমি বকা দিবে।
বকা তো তাকে দেবই! গোপনে বিয়ে করার জন্য বুকা দেব না? আমাকে রোজ কেন দেখতে আসে না এইজন্যে বকা দেব। আরেকটা কথা, তুই মতিনকে নাম ধরে ডাকবি না। তুই তুকারি করবি না। বিয়ের আগে ডেকেছিস—আর না।
ঠিক আছে আর ডাকব না। বাবা, তুমি কথা বেশি বলছ। এত কথা বলা। ঠিক না।
তোরা স্বামী-স্ত্রী সারারাত জেগে কথা বলিস। তোদর কথার যন্ত্রণায় আমি ঘুমাতে পারি না। আর আমি কথা বললেই অসুবিধা?
মৃত্যুর পাঁচ-দশ মিনিট আগে তিনি ঘোরের মধ্যে চলে গেলেন। অদৃশ্য কোনো একজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি আজরাইল। আপনাকে চিনতে পারি নাই, ক্ষমা করবেন। আপনি কি আমার জান কবচ করতে এসেছেন? জি করেন। আপনি কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছেন বলে চিনতে পারি নাই। আপনাকে সালামও দিতে ভুলে গেছি। আসসালামু আলায়কুম। আমার পাশে আমার মেয়ে বসে আছে। তার নাম নিশু। সে আবার কয়েকদিন আগে গোপনে। বিয়ে করেছে। আমার মেয়ে জামাইয়ের নাম মতিন। সে আমাকে খুব ভয় পায় বলে হাসপাতালে আসে না। আপনি একটু সরে গিয়ে আমার মেয়েটার পেছনে দাঁড়ান। আপনাকে দেখলে আমার মেয়ে ভয় পাবে।
সুইজারল্যান্ডে পড়তে যাবার ব্যাপারে
সুইজারল্যান্ডে পড়তে যাবার ব্যাপারে কমলের কোনো আপত্তি লক্ষ করা যাচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে তার আগ্রহই আছে। ভালো আগ্রহ। সে তার মা কে কী কী জিনিস লাগবে তার লিস্ট করে দিয়েছে। লিস্টে আছে–
