জি।
ভালো হাত দেখতে পারে। বিয়ের পর বলবি হাত দেখে দেবে।
আচ্ছা।
হাবিবুর রহমান আনন্দিত গলায় বললেন, বিয়ের তারিখ করে ফেলি? বিয়ের কথাবার্তা একবার হয়ে গেলে দেরি করতে নাই।
তৌহিদা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। দুটি হাতই সাবান দিয়ে ভালো করে ধুতে হবে। এই লোক দুটি হাতেই ঘামের গন্ধ লাগিয়ে দিয়েছে।
দুপুরে তৌহিদা কিছু খেতে পারল না। সাবান দিয়ে ধুয়েও হাত থেকে ঘামের গন্ধ যায় নি। এই গন্ধ নিয়ে ভাত খাওয়া যাবে না। ভাতের মধ্যে গন্ধ ঢুকে যাচ্ছে।
ক্ষুধার্ত অবস্থায় মানুষের ঘুম হয় না, কিন্তু তৌহিদার গাঢ় ঘুম হলো। সে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখল, মতিন তার পাশে শুয়ে আছে। মতিনের একটা হাত তার গায়ে। সে সাবধানে হাতটা সরিয়ে দিতেই মতিন জেগে উঠে বলল, কী হয়েছে? তৌহিদা বলল, গায়ের উপর হাত রাখ কেন? ভার লাগে না?
মতিন বলল, তাহলে হাত রাখব কোথায়?
তৌহিদা বলল, হাত যেখানে ইচ্ছা রাখ। আমার গায়ে না।
মতিন বিস্মিত হয়ে বলল, স্ত্রীর গায়ে হাত রাখতে পারব না?
তৌহিদা বলল, তুমি তো আমাকে বিয়ে কর নি। আমি তোমার স্ত্রী না।
মতিন বলল, তাহলে আমার স্ত্রী কে?
তৌহিদা বলল, তোমার স্ত্রীর নাম নিশু।
মতিন সঙ্গে সঙ্গে পাশ ফিরল। অমনি দেখা গেল ওপাশে নিশু শুয়ে আছে। স্বপ্নে বিষয়টা মোটেই অস্বাভাবিক মনে হলো না। মনে হলো এটাই স্বাভাবিক। মতিন নিশুর গায়ে হাত রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। তৌহিদা কাঁদছে।
তৌহিদা কাঁদতে কাঁদতেই ঘুম থেকে জেগে উঠল। তাকাল বিছানার পাশে। বিছানা খালি। অথচ তার মনে হচ্ছিল বিছানায় মতিনকে দেখা যাবে। মতিনের পাশে নিশু মেয়েটাকে দেখা যাবে।
বাচ্চা ছেলেদের গলায় কে যেন তাকে ডাকছে–ও তৌহিদা! ও তৌহিদা! বাচ্চা ছেলেদের গলায় তাকে কে ডাকবে? এ বাড়িতে বাচ্চা কেউ নেই। ঘুম ভাঙার পর কিছুক্ষণ এলোমেলো সময় কাটে। মানুষের গলার স্বর চেনা যায় না। তাই হচ্ছে নিশ্চয়ই। তৌহিদা তার ঘর থেকে বের হলো।
সালেহা তৌহিদাকে ডেকে ডেকে বিরক্ত হচ্ছিলেন। তাঁর ইচ্ছা করছে মেয়েটাকে কঠিন ধমক দেন। তিনি রোগীমানুষ। একবার ডাকলেই তৌহিদা ছুটে আসবে। তা-না, ডেকে গলা ভেঙে ফেলতে হচ্ছে।
বুবু, আমাকে ডেকেছেন?
সালেহা তিক্ত গলায় বললেন, তোমাকে কেন ডাকব? আমি এই দেশের মহারানীকে ডাকছি। তুমি কি মহারানী? আমার গায়ে একটা পাতলা চাদর এনে দাও।
তৌহিদা চাদর এনে দিল। সালেহা বলেন, চাদর দিতে বললাম সঙ্গে সঙ্গে চাদর দিয়ে দিলে, একবার জিজ্ঞেসও করলে না, কেন। কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখবে না? তৌহিদা কপালে হাত দিয়ে বলল, জ্বর আছে।
জ্বরটা কত দেখ? থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপা এখনো জানো না? জীবনে একটা জিনিসই তো শিখেছ, ফিচ ফিচ করে কান্না।
তৌহিদা জ্বর দেখল। জ্বর একশ দুই-এর সামান্য কম। সালেহা বললেন, জ্বর উঠা শুরু হয়েছে। আরো উঠবে।
বুবু, মাথায় পানি দেয়ার ব্যবস্থা করি?
সালেহা বললেন, তোমাকে কোনো ব্যবস্থা করতে হবে না। তুমি আমার মাথার পাশে চেয়ার টেনে বসো। তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।
তৌহিদা চেয়ার টেনে বসল। তার সামান্য ভয় ভয় করছে। জ্বরের ঘোরে। সালেহা কী না কী বলেন। জ্বর বেশি হয়ে গেলে তার মাথার ঠিক থাকে না।
তোমার ভাইজান না-কি তোমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে?
তৌহিদা জবাব দিল না। সালেহা কড়া গলায় বললেন, কথা বললে জবাব দিবে। কাঠের মূর্তি হয়ে যাবে না। তোমার ভাইজান কি তোমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে?
জি।
পাত্র নাকি বাসায় এসেছিল? তোমার সঙ্গে দেখা সাক্ষাতও হয়েছে।
জি।
এত নাটক হয়ে গেল, আমি কই ছিলাম?
বুবু আপনি ঘুমাচ্ছিলেন।
আমাকে ঘুম থেকে জাগানো গেল না?
গতরাতে আপনি এক ফোটা ঘুমান নাই। ভাইজান এইজন্যেই আপনাকে ডাকেন নাই।
তোমার ভাইজান বলল, পাত্র নাকি তোমার খুবই পছন্দ হয়েছে?
তৌহিদা এই প্রশ্নের জবাব দিল না। মাথা নিচু করে বসে রইল। সালেহা বললেন, ঘাটের মরাকে বিয়ের জন্যে পাগল হয়ে গেলে কেন? শরীর বেশি আউলা হয়ে গেছে? শরীর বেশি আউলা হলে বাজারে দোকান দিয়ে বসো। শরীরও ঠিক থাকবে পয়সাও পাবে। এইটা ভালো না?
তৌহিদার চোখে পানি এসে গেছে। সে সাবধানে চোখের পানি মুছল। বুবু দেখে ফেললে সমস্যা হবে। আরো কী কথা বলবেন কে জানে। তাঁর মুখ ছুটে গেলে সমস্যা আছে। আগে তিনি নোংরা বলতেন না। এখন বলেন। অসুখে ভুগে ভুগে এরকম হয়েছে।
তৌহিদা।
জু বুবু।
আমি অনেক চিন্তা ভাবনা করে দেখেছি, তোমার জন্য সবচে ভালো হয় যদি তুমি তোমার ভাইজানকে বিয়ে কর। সে তোমার আপন ভাই না, সৎ ভাইও না। লতায় পাতায় ভাই। বেচারার কোনো ছেলেপুলে নাই। তোমাকে বিয়ে করলে হয়তো সন্তান হবে। সতিনের সংসার নিয়ে তোমার চিন্তার কিছু নাই। আমি বেশিদিন বাঁচব না।
তৌহিদা ভীত গলায় বলল, আমি সারাজীবন উনাকে নিজের ভাইয়ের মতো দেখেছি।
সালেহা বললেন, এখন স্বামীর মতো দেখবে। এই নিয়ে আর কথা বলব না। জ্বরটা আবার দেখ। জ্বর যদি একশ তিন হয় তাহলে মাথায় পানি দেয়ার ব্যবস্থা কর। তার আগে আমার মোবাইল টেলিফোনটা খুঁজে বের কর। মতিনের নাম্বারটায় টেলিফোন করে ওকে ধরে আমাকে দাও। আজকে আমি তার বিষ ঝেড়ে দেব। সে নাকি আমার ভাই। আজ আমি তার ভাইগিরি বের করে দেব। কত বড় বদমাশ! আমার এখানে আসা বন্ধ করে দিয়েছে।
