হাবিবুর রহমান বিষয়টা নিয়ে তৌহিদার সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ করেছেন। তৌহিদা শান্ত গলায় বলেছে–ভাইজান, আপনি যা বলবেন তাই হবে।
হাবিবুর রহমান বললেন, ওর আগের পক্ষের দুটা সন্তান আছে, এই নিয়ে তোর কোনো সমস্যা নাই তো?
তৌহিদা বলেছে, না।
ঝালকাঠির পাত্রটা হাতছাড়া হয়ে গেছে বলে পড়েছি মুশকিলে। তবে এই পাত্রও খারাপ না। অনেকদিন দেখেছি। স্বভাব-চরিত্র ভালো। আজকালকার জমানায় ভালো স্বভাব-চরিত্রের পাত্র পাওয়া অসম্ভব। লোম বাছতে কম্বল উজাড় হওয়ার অবস্থা। তারপরেও তোর একটা মতামত আছে। ভালোমতো চিন্তা ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নে।
তৌহিদা বলল, ভাইজান, আপনি যা বলবেন তাই হবে।
ছেলেকে একদিন বাসায় নিয়ে আসি। তুই কথা বলে দেখ।
তৌহিদা বলল, দরকার নাই। আপনি তো কথা বলেছেন। আমি আর কী কথা বলব।
পুরুষদের কথা বলা এবং মেয়েদের কথা বলা আলাদা। মেয়েরা দুই একটা কথা বলেই অনেক কিছু বুঝে ফেলে। পুরুষরা পারে না। নিয়ে আসি একদিন।
আপনার ইচ্ছা।
এক হরতালের দিনে হাবিবুর রহমান তাঁর ম্যানেজারকে বাসায় নিয়ে এলেন। তৌহিদা ম্যানেজারের জন্য চা-নাশতা নিয়ে গেল।
আধবুড়া একজন চোয়াল-ভাঙা মানুষ কুজো হয়ে বসার ঘরের বেতের চেয়ারে বসে আছে। মাথায় চুল নেই বললেই হয়। যা আছে সবই পাকা। লোকটা মাথা সামান্য কাত করে দাঁড়কাকের মতো বসে আছে। তার গা থেকে প্রচণ্ড ঘামের গন্ধ আসছে। লোকটা তৌহিদাকে ঢুকতে দেখে বলল, ভালো আছ। তৌহিদা?
তৌহিদা বলল, জি।
চা-নাশতার দরকার ছিল না। সকালে এককাপ আর রাতে ঘুমাবার আগে এককাপ। এর বেশি খাই না। অনেকের চা খেলে রাতে ঘুম হয় না। আমার উল্টা। চা না খেলে ঘুম হয় না।
তৌহিদা কিছু বলল না। তার কান্না পাচ্ছে। তার ইচ্ছা করছে চাপা গলায় বলে, এই দাঁড়কাক, তুই চেয়ারে বসে আছিস কেন? তুই ডাস্টবিনের উপর বসে থাক।
হেদায়েত বলল, তুমি কিছু বললো। চুপচাপ কেন? তোমরা কয় ভাই-বোন?
তৌহিদা বলল, আমি একা।
স্যার যে বললেন, তোমরা দুই বোন।
দুই বোন ছিলাম, একবোন খুব ছোটবেলায় মারা গেছে।
কীভাবে মারা গেছে?
পানিতে ডুবে।
আফসোস। বিরাট আফসোস।
তৌহিদা আবারো মনে মনে বলল, তোর আফসোস কী জন্যে? শালী থাকবে না, কারো সঙ্গে ইটিস-পিটিস করতে পারবি না, এইজন্যে আফসোস?
লোকটা সুড়ৎ করে চায়ে চুমুক দিল। এক চুমুকে আধাকাপ চা খালি। এই লোকটার সবকিছুই কি খারাপ? এত গরম চা এক চুমুকে খেয়ে ফেলল।
তৌহিদা, আমার বিষয়ে তোমার যদি কিছু জিজ্ঞেস করার থাকে, জিজ্ঞেস কর। আছে কিছু?
কিছু নাই।
আমার বাচ্চা দুটার কথা কি স্যার বলেছেন?
জি।
মেয়ের নাম রানী, আর ছেলের নাম রেখেছি গোলাপ। জন্মের সময় গায়ের রঙ গোলাপের মতো ছিল এইজন্যে গোলাপ। এখন রঙ কালো হয়ে গেছে। জন্মের সময়ের রঙ লাস্টিং করে না। তৌহিদা, দেখি তোমার বাঁ হাতটা?
তৌহিদা চমকে উঠে বলল, কেন?
আমি অল্পবিস্তর পামিস্ট্রি জানি। কিরোর বই পড়ে পড়ে শিখেছি। আমার সঙ্গে তোমার বিয়ের ফলাফল শুভ হবে কি-না একটু দেখি। দুজনের হাত পাশাপাশি মিলিয়ে দেখতে হয়। পুরুষদের ডান হাত, মেয়েদের বা হাত।
তৌহিদা হাত বাড়িয়ে দিল। তার আচরণে সঙ্কোচের চিহ্নও নেই। তার মন বলছে, এই লোকটা তার বাঁ হাত এখন কিছুক্ষণ কচলাবে। কচলানো হাতে লেগে থাকবে লোকটার গায়ের ঘামের গন্ধ। সাবান দিয়ে ধুলেও এই গন্ধ যাবে না।
তোমার সানলাইন তো মারাত্মক। মাউন্ট অব জুপিটারে আবার আছে ক্রস। ডাবল অ্যাকশন। বিয়ের পর টাকা-পয়সার যোগ আছে।
এতক্ষণ লোকটার প্রতি তার তেমন ঘেন্না হচ্ছিল না। এখন হচ্ছে। লোকটার হাতটাকে মনে হচ্ছে মাকড়শা। একটা কালো মাকড়শা পাঁচটা পা নিয়ে তার হাতের উপর কিলবিল করছে। তৌহিদা অপেক্ষা করছে কখন লোকটা হাত ছাড়বে সে চলে যেতে পারবে। লোকটার হাত ছাড়ার কোনো লক্ষণ নেই।
হেদায়েত হাসিমুখে বলল, তোমার হাতে আছে মীনপুচ্ছ। খুবই মারাত্মক। লাখে একটা পাওয়া যায়। তুমি বিরাট ভাগ্যবতী। অবশ্য একটা জিনিস তোমার খারাপ। স্বাস্থ্যরেখা। রাতে ঘুম ভালো হয়?
হুঁ।
অ্যানিমিয়া আছে। এটা হাত দেখে বলছি না। চোখ দেখে বলছি! অনেক দিন ওষুধ ব্যবসার সঙ্গে আছি। এখন ডাক্তারদের চেয়ে জ্ঞান বেশি! একদিন। ফার্মেসিতে চলে এসো, ওষুধ দিয়ে দিব। ফলিক অ্যাসিড। তার সঙ্গে এক পাতা। ফাইভ মিলিগ্রাম রিভোফ্লবিন। এটা একটা ভিটামিন ট্যাবলেট। ফলিক অ্যাসিডের সঙ্গে রিভোফ্লবিন খেলে অ্যাকশান ভালো হয়। অনেকেই বিষয়টা জানে না।
জি আচ্ছা।
পানি বেশি করে খাবে। সকালে একগ্লাস পানি খাবে খালি পেটে পানিতে লেবুর রস চিপে দিবে। লেবুতে আছে ভিটামিন সি।
তৌহিদা উঠে দাঁড়াল। লোকটা এখন আগের মতো ঘাড় কাত করে দাঁড়কাক হয়ে গেছে। তৌহিদার বমি বমি ভাব হলো। কারণ লোকটা এখন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তৌহিদার বুকের দিকে। কোনো লজ্জাও সে বোধ করছে না। খুব ভালো হতো তৌহিদা যদি বলতে পারত–আপনি আমার বুক দেখতে চান? বাথরুমে আসুন দেখিয়ে দিচ্ছি। এখানে দেখাতে পারব না। ভাইজান যে-কোনো সময় চলে আসতে পারেন। যা ভাবা যায় তা কখনোই বলা যায় না। তৌহিদা ঘর ছেড়ে শান্ত ভঙ্গিতেই বের হয়ে গেল।
হাবিবুর রহমান আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কথা হয়েছে?
তৌহিদা বলল, জি ভাইজান।
কথাবার্তা বলে কী মনে হলো?
ভালো।
স্মার্ট ছেলে না?
