বন্ধু প্রতিমাসে তিন হাজার করে টাকা দেয় কেন?
একবার তার আমি খুব বড় একটা উপকার করেছিলাম। এইজন্যে দেয়।
সে ঢাকায় থাকে?
জি-না। সে থাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম। বিশাল জায়গা-জমি কিনে হুলুস্থুল কাণ্ড করেছে।
এই বন্ধু তোমাকে মাসে তিন হাজার করে টাকা সারাজীবন দিয়ে যাবে?
জানি না দেবে কি-না। এখন পর্যন্ত দিচ্ছে। তার ইচ্ছা আমি তার রাজত্বে চলে যাই। ম্যানেজারির দায়িত্ব নেই।
তুমি যাচ্ছ?
জি-না। নদ্দিউ নতিম জঙ্গল পছন্দ করতেন না। তাঁর বিখ্যাত উক্তি–জঙ্গলের সন্ধানে তুমি কেন বাইরে যাবে? তোমার চারপাশের মানুষজনের মধ্যেই আছে ঘন অরণ্য।
আমার সঙ্গে ফাজলামি করবে না।
স্যার, আমি যাই।
আরেকটু বসো।
আরেকদিন এসে আপনার সঙ্গে গল্প করব। একটা বাচ্চাছেলে আমার জন্যে। অপেক্ষা করছে। আমাকে যেতে হবে। স্যার যাই?
যাও। একদিন আমার বাসায় এসো। আমার মেয়ে তোমাকে দেখতে চায়। তার সঙ্গে তোমাকে নিয়ে গল্প করেছি।
মতিন বলল, আমি কালই যাব।
কাল তুমি যাবে না। এটা আমি জানি। যেদিন ইচ্ছা হবে চলে এসো। ঠিকানাটা নিয়ে যাও। বাসা চিনবে কীভাবে?
মতিন বলল, ঠিকানা লাগবে না।
মতিনের ঘরের দরজা বন্ধ। ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগানো। ছিটকিনি অনেক উপরে। কমলের পক্ষে ছিটকিনি লাগানো সম্ভব না। সে নিশ্চয়ই চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে কাজটা করেছে। মতিন দরজায় টোকা দিয়ে বলল, কমল, আমি কি ভেতর আসব?
এখন না।
এখন না কেন?
আমি এখন আমার Secret-টা লিখছি। Secret লেখা শেষ হলে আসবে। আমি দরজা খুলে দেব।
ঠিক আছে, আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। তোমার বিখ্যাত অঙ্কটা কি শেষ হয়েছে?
কমল জবাব দিল না। মতিন মেসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি আকাশের দিকে। আকাশ ঘন নীল। ঢাকার আকাশ কখনো এত নীল হয় না। আকাশটাকে এখন মনে হচ্ছে উজবেকিস্তানের আকাশ, নদ্দিউ নতিমের ঘন নীল আকাশ। আকাশ নিয়ে কি তিনি কোনো কবিতা লিখেছেন? লেখার তো কথা। তার কাছে মানুষ এবং প্রকৃতি কখনো আলাদা কিছু ছিল না।
দরজা খুলে গেল। কমল ঘর থেকে বের হয়ে সহজ গলায় বলল, Secret টা লিখে তোমার টেবিলের ড্রয়ারে রেখেছি।
মতিন বলল, Doog করেছ।
আমি এখন বাসায় যাব। আমাকে বাড়িতে দিয়ে এসো।
চলো যাই। যাবার পথে পিৎজা খেয়ে গেলে কেমন হয়?
না।
না কেন? তুমি পিৎজা খেতে চেয়েছিলে।
এখন চাচ্ছি না।
তোমার কি মন খারাপ?
হুঁ।
কেন?
আমি আমার Secret তোমাকে বলছি এইজন্যে।
মতিন বলল, আমি তোমার Secret এখনো পড়ি নি। এখনো আমার টেবিলের ওভারে আছে। তুমি এক কাজ কর, Secret-টা সঙ্গে নিয়ে যাও। তোমার মন খারাপ, এটা আমার ভালো লাগছে না। ঠিক আছে?
কমল কঠিন গলায় বলল, No. সে হাঁটা শুরু করেছে। কমলের পেছনে পেছনে যাচ্ছে মতিন।
হঠাৎ কমল বলল, তোমাকে যেতে হবে না।
মতিন বলল, কেন?
তুমি তোমার ঘরে যাও। আমার Terces-টা পড়।
এখনই পড়তে হবে?
হ্যাঁ এখনই পড়তে হবে।
পড়ার পর কি আমার কিছু করণীয় আছে?
না।
তোমার গোপন কথা জেনে আমি চুপচাপ বসে থাকব?
হুঁ। তুমি তোমার ঘরে যাও।
তোমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসি?
আচ্ছা।
গাড়িতে উঠতে উঠতে হঠাৎ কমল আগ্রহ নিয়ে বলল, কবুতরের পুপুর কালার কী তুমি জানো?
মতিন বলল, না।
কমল বলল, সাদা।
মতিন বলল, ও আচ্ছা, একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস জানলাম।
কমল বলল, ছাগলের পুপুর কালার কালো।
মতিন বলল, এটা জানি। মানুষেরটা হলুদ এটাও জানি।
কমল বলল, এমন কোনো প্রাণী কি আছে যার পুপু সবুজ?
জানি না।
খুঁজে বের করতে পারবে?
অবশ্যই পারব। চিড়িয়াখানার কিউরেটারকে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যার হেডকেও টেলিফোন করতে পারি। সবচে ভালো হয় যদি কাটাবনে চলে যাই।
কাঁটাবনে কী?
কাঁটাবনে পশুপাখি বিক্রি হয়। দোকানদাররা নিশ্চয়ই বলতে পারবে সবুজ রঙের হাগু কে করে।
তুমি কখন কাঁটাবনে যাবে?
আজই যেতে পারি।
থ্যাংক য়্যু।
কমল তার সিক্রেট দুই পাতায় লিখেছে। তার বয়েসী ছেলেমেয়েরা বড় বড় অক্ষরে লেখে। লাইনও ঠিক থাকে না। কমলের লেখা ছোট ছোট হরফে। লাইন সোজা। লেখা দেখে মনে হবে, সে স্কেল বসিয়ে লিখেছে। তবে তার লেখা চট করে পাঠ করার মতো না। সে লিখেছে উল্টো করে। এই লেখা পড়ার সহজ বুদ্ধি হলো, আয়নার সামনে লেখাটা ধরা। মতিনের ঘরে কোনো আয়না নেই। আয়না আছে মেসবাড়ির বাথরুমে। লেখা নিয়ে বাথরুমে যেতে ইচ্ছা করছে না। সিক্রেট থাকুক সিক্রেটের মতো। কোনো একদিন পড়ে ফেললেই হবে। এত তাড়াহুড়ার কিছু নেই।
বোনের বিয়ে ঠিক
হাবিবুর রহমান তাঁর বোনের বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন। বরের নাম হেদায়েতুল ইসলাম। সে তার ফার্মেসিতে কাজ করে। ম্যানেজার। বয়স চল্লিশ হয় নি, তবে মাথার সব চুল পেকে গেছে বলে তাকে বেশ বয়স্ক দেখায়। সে চুলে কলপ দেয় না। কলপ দিলে অ্যালার্জির মতো হয়। নাক-মুখ ফুলে উঠে। পাকাচুলের এই মানুষটাকে তুমি তুমি করে বলতে হাবিবুর রহমানের অস্বস্তি লাগে।
হেদায়েতুল ইসলামের এটা দ্বিতীয় বিবাহ। প্রথম স্ত্রী একবছর আগে মারা গেছে। সেই পক্ষের দুটা ছেলেমেয়ে আছে। একজনের বয়স সাত, আরেকজনের চার। এরা থাকে নারায়ণগঞ্জে, নানির বাড়িতে। হেদায়েতুল ইসলাম ঠিক করে রেখেছে, বিয়ের পর বাচ্চাদের নিজের কাছে এনে রাখবে। তার এমন স্ত্রী দরকার যার অন্তরে মায়া মহব্বত আছে। সে নিজের জন্যে বিয়ে করতে চায় না। বাচ্চাদের মানুষ করার জন্যে বিয়ে করতে চায়।
