মতিন বলল, আমি তো লেখক না। আমি অনুবাদক। অনুবাদকের বইয়ের প্রতি আগ্রহ কম থাকে। বই কেমন হয়েছে?
লেখা কেমন হয়েছে সেটা আপনি বলবেন। প্রোডাকশন ভালো হয়েছে। বই চলছেও ভালো।
এর মধ্যে চলাও শুরু করেছে?
নাম দেখে লোকজন কিনছে, কভারে নেংটা মেয়ের ছবি।
কভারে নেংটা মেয়ে নাকি?
কথার কথা বললাম। নগ্ন ছবি শালীনভাবেই আছে। মূল লেখক নতিম না কী যেন নাম, তারও অপছন্দ হবে না। আপনি উনার ঠিকানা দিয়ে যান, কুরিয়ারে উনাকে দুই কপি বই পাঠিয়ে দেব।
মতিন বলল, উনাকে বই পাঠিয়ে কোনো লাভ নাই। অথর্ব হয়ে পড়েছেন। চোখেও দেখেন না। অন্ধ।
আহা, বলেন কী!
মতিনের বই পছন্দ হলো। সুন্দর ছাপা। কভারে নগ্ন মেয়ের ছবিটিও শিল্পী তুলির টানে সুন্দর এঁকেছেন। মেয়েটা কিছু একটা দেখে ভয় পেয়ে নিজেকে লুকাতে চাচ্ছে–এমন ছবি। মতিন বলল, বই সুন্দর।
সারোয়ার খান বললেন, আপাতত পাঁচ কপি বই নিয়ে যান। বেশি বই নিয়ে তো লাভ নাই। বন্ধু বান্ধবরা হাত থেকে নিয়ে নিবে।
দিন, পাঁচ কপিই দিন।
রয়্যালটির কিছু টাকাও দিচ্ছি। আমাদের প্রকাশনার নিয়ম রয়্যালটির টাকার একটা অংশ বই প্রকাশের দিন দেয়া হয়। মূল লেখকের জন্যে ১২% রয়্যালটি। অনুবাদ হলে ৮%। ঠিক আছে?
মতিন বলল, কবুল।
কবুল মানে কী?
কবুল মানে আমি ৮% রয়্যালটি কবুল করে নিলাম।
নিন টাকাটা রাখুন। এখানে তিন হাজার আছে। গুনে নিন। ভদ্রতা দেখিয়ে গুনে চলে যাবেন, পরে টেলিফোন করে বলবেন পাঁচশ কম ছিল তা হবে না।
মতিন টাকা গুনল। বইয়ের প্যাকেট হাতে নিল। কমল একা মেসবাড়িতে বসে আছে, তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার। সে ইয়েলো ক্যাব নিয়ে নিল। ভোরের স্বদেশের সাহিত্য সম্পাদক আজহার উল্লাহ সাহেবকে বইটার একটা কপি আজই দিয়ে দেয়া দরকার। শুধু বই না, বইয়ের সঙ্গে এক কার্টন সিগারেট। এই ভদ্রলোক খুব আগ্রহের সঙ্গে সিগারেট খান। একটা সিগারেট ধরাবার আগে প্যাকেট খুলে কটা সিগারেট আছে গুনে দেখেন। এক কার্টুন সিগারেটের সঙ্গে একটা দামি লাইটার। তিন হাজার টাকা এইভাবেই খরচ করে ফেলতে হবে। নিজের জন্যে কিছু করা যাবে না। একটা গিফট কিনতে হবে কমলের জন্যে। কী গিফট? অবশ্যই অঙ্কের বই। যত জটিল হয় তত ভালো। জটিল অঙ্ক বইয়ের নামধাম আজিজ সাহেবের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।
একটা কিছু কিনতে হবে নিশুর জন্যে। মহিলা জ্ঞানীদের জন্যে উপহার কেনা সহজ। গিফটের পেছনে একটা গল্প বানিয়ে বলতে হবে। মহিলা জ্ঞানীরা যাবতীয় গল্পগাথা বিশ্বাস করে। মতিন যদি রেললাইন থেকে একটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে বলে পাল আমলের পাথর। পালবংশের রাজা দেবপাল-এর পুত্র শূরপাল মন্দির বানানোর জন্যে পাথর সংগ্রহ করেছিলেন। পাথরগুলিকে শুদ্ধ করার জন্যে তিনি দুধ দিয়ে ধোয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমার হাতের পাথরটা তারই একটা।
এই কথা শুনে নিশু চোখ বড় বড় করে বলবে, বলো কী? পেয়েছ কোথায়?
একটা কিছু কিনতে হবে তৌ-এর জন্য। তৌ-এর সঙ্গে দেখা করা সম্ভব। উপহার কিনে পাঠিয়ে দিতে হবে। তৌ-এর জন্য কী কেনা যায়? তার পছন্দ অবশ্যই শাড়ি। একবার রিকশা থেকে নামার সময় তার সবুজ রঙের শাড়ি ছিঁড়ে গিয়েছিল। তৌ কেঁদেকেটে অস্থির। ভাব এরকম যেন তার হাত-পা ছিঁড়ে গেছে। একদিকে ঠিকই আছে। শাড়িকে মেয়েরা আলাদা কিছু ভাবে না। শরীরের অংশ হিসেবে ভাবে।
আজহার উল্লাহ অবাক হয়ে বললেন, এই সিগারেটের কার্টুন, এই লাইটার আমার জন্যে?
মতিন বলল, জি স্যার।
কারণটা বলো।
আপনি খুব আগ্রহ করে সিগারেট খান। একটা সিগারেট ধরাবার আগে প্যাকেট খুলে গুনে দেখেন কয়টা সিগারেট আছে। এইজন্যেই আনলাম।
আজহার উল্লাহ বললেন, আমি হার্টের রোগী, একবার স্ট্রোক হয়েছে। সিগারেট কমিয়ে খাওয়ার জন্যে এই ব্যবস্থা। সারাদিনে সাতটার বেশি খাব না ঠিক করা থাকে বলে সিগারেট গুনি।
স্যার, আপনার জন্যে একটা বই এনেছি।
আজহার উল্লাহ বিড়বিড় করে বললেন, নদ্দিউ নতিমের গল্পগ্রন্থ! মাশাল্লাহ। অবশ্যই মাশাল্লাহ। আমি চট করে মুগ্ধ হই না, তবে নদ্দিউ নতিম সাহেবের কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ।
স্যার, বইটা আপনাকে উৎসর্গ করা।
আজহার উল্লাহ কিছুক্ষণ চুপ করে মতিনের দিকে তাকিয়ে থেকে উৎসর্গ পাতা খুললেন। সেখানে লেখা–
অনুবাদকের উৎসর্গ
জনাব আজহার উল্লাহ খান।
স্বর্ণ হৃদয়খণ্ড বক্ষেতে ধরি
যে-জন বসেছে একা
শতজন মাঝে
এই গল্পগ্রন্থখানি তাঁহাকেই সাজে।
আজহার উল্লাহ হাত থেকে বই নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, কাউকে বই উৎসর্গ করতে হলে তার অনুমতি নিতে হয়, এটা জানো?
না।
একটা নিম্নশ্রেণীর Hoax-এর সঙ্গে তুমি আমাকে যুক্ত করলে। কাজটা ঠিক হলো?
জি-না।
এতবড় মিথ্যা গোপন থাকবে না। একদিন প্রকাশিত হবে। তখন আমার কী হবে?
আপনার কিছু হবে না। কারণ আপনি মিথ্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন না জেনে।
মিথ্যা এমন জিনিস তার সঙ্গে জেনে যুক্ত হওয়া না-জেনে যুক্ত হওয়া একই জিনিস।
স্যার, আমি উঠি?
দুটা মিনিট বসো। আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দাও। তুমি চাকরি বাকরি কিছু কর না। ঠিক না?
জি।
সংসার কীভাবে চলে?
আমি একা মানুষ। আমার কোনো সংসার নেই।
একারও সংসার থাকে। তাকে খেতে হয়। কাপড় পরতে হয়। রাতে ঘুমাতে হয়।
স্যার, আমার এক বন্ধু আছে। সে আমাকে প্রতি মাসে তিন হাজার করে টাকা দেয়। এতেই চলে যায়।
