সালেহ ইমরান বললেন, কমলের মতো বাচ্চাদের নিয়ে Experiment করার যোগ্যতা কি তোমার আছে?
মতিন বলল, আমি Experiment করছি না। আমি তাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছি।
সালেহ ইমরান বললেন, এই পরিচয় সে নিতে পারবে না।
মতিন বলল, আমি যেই মুহূর্তে দেখব সে নিতে পারছে না, আমি তাকে আপনার কাছে ফেরত দেব।
সালেহ ইমরান উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, ও.কে। থ্যাংক ব্যু ফর অ্যাভরিথিং।
মতিন বলল, কমল, দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসো।
কমল বলল, কে চিৎকার করছে?
আমাদের মেসবাড়ির পেছনেই বস্তি। বস্তির লোকজন চিৎকার করছে।
কেন চিৎকার করছে?
কোনো একটা বিষয় নিয়ে ঝগড়া করছে।
বিষয়টা কী?
বিষয়টা কী আমি জানি না।
চিৎকার শুনতে আমার ভালো লাগে না।
চিৎকার শুনতে কারোই ভালো লাগে না। চল বের হয়ে পড়ি। বের হয়ে পড়লে আর চিৎকার শুনতে হবে না।
না।
না কেন?
আগে আমাকে একটা কাগজ কলম দাও।
কী করবে?
আমি ঘোতনা ঘুতনিদের ছেলেমেয়েদের নাম ঠিক করব। অঙ্ক দিয়ে নাম।
অঙ্ক দিয়ে আমি মানে?
ঘোতনার সিম্বল হলো 1, ঘুতনি ০, 1 হলো male আর 0 Female. ওদের যদি ছেলে হয় তার সিম্বল হবে 1 (10)। 1 হলো male-এর সিম্বল, আর 10 হলো বাবা-মার সিম্বল। বুঝতে পেরেছ?
মতিন বলল, Rice water-এর মতো পরিষ্কার।
কমল বলল, Rice water কী?
মতিন বলল, Rice water হলো পান্তাভাত। খুব সহজ বিষয়কে আমরা বলি পান্তাভাত কিংবা ডালভাতের মতো সোজা।
আমাকে কাগজ-কলম দাও।
মতিন কাগজ-কলম দিল। কমল অতি দ্রুত লিখছে। তার চোখে-মুখে আনন্দ। মতিন একবার উঁকি দিল। তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল।
ঘোতনা = 1 ঘুতনি = 0
- 1
- 1(10)
- 1{1(10)0(10)}
- 1[1{1(10)0(10)}0{1(10)0(10)}]
- 1{1(10)0(10)}
- 1(10)
Male = 1 Female = 0
- 0
- 0(10)
- 0{1 (10)0(10)}
- 0[1{1(10)0(10)}0{1(10)0(10)}]
- 0{1 (10)0(10)}
- 0(10)
মতিন বলল, তুমি তো বিরাট অঙ্ক ফেঁদে বসেছ।
কমল বলল, আমার আরো কাগজ লাগবে।
মতিন বলল, কাগজের সমস্যা নেই। ড্রয়ারভর্তি কাগজ। তুমি করছটা কী? 0101 এইসব কী?
নাম। তোমাকে বুঝিয়ে দেব?
কোনো দরকার নাই, অঙ্ক বুঝতে চাই না। স্কুলে যে স্যার আমাদের অঙ্ক পড়াতেন তার নাম গজনবী। তাঁকে সবাই ডাকত নেত্রকোনার যাদব। নেত্রকোনার যাদব স্যার বলতেন, একটা গরু যে অঙ্ক জানে আমি তাও জানি না। তুমি কি যাদব বাবুর নাম শুনেছ? বিরাট অঙ্কবিদ ছিলেন।
নাম শুনি নি।
সে-কী! তুমি এমন অঙ্কওয়ালা ছেলে, তুমি দি গ্রেট যাদববাবুর নাম শোন নি? তিনি এই দেশের মানুষ।
আমি রামানুজনের নাম শুনেছি।
তিনি আবার কে?
তিনি অঙ্ক জানতেন। He was born on 22nd December, 1887.
ও আচ্ছা। পুরনো লোক।
তিনি অনেকগুলি সিরিজ বের করেছিলেন। এর মধ্যে একটার যোগফল 2/π।
বাহ ভালো তো!
সিরিজটা লিখব?
লিখতে পার। তবে কিছু লাভ হবে না। বুঝব না।
সিরিজটা দেখলে তোমার ভালো লাগবে। আলাদা একটা কাগজে লিখি?
লেখ।
কমল দ্রুত লিখল–
1-5(1/2)^3+9(1.3/2.4)^3-13(1.3.5/2.4.6)^3+… =2/π
মতিন বলল, খুবই ভালো লাগল। এইসব কি তোমার মুখস্থ না-কি?
কমল বলল, সিরিজ মুখস্থ করতে হয় না। মনে থাকে।
মতিন বলল, মানসঙ্কের নাম শুনেছ?
না।
আমাদের দেশে একসময় মানসঙ্ক বলে একধরনের অঙ্ক ছিল। মনে মনে করতে হতো। মানসঙ্কের নানান সূত্র ছিল। সূত্র মুখস্থ রাখতে হতো।
কমল আগ্রহ নিয়ে বলল, একটা বলো!
এক এক এগারো মাথে
একশত সাঁইত্রিশ দিয়া তাথে
কি করি পায়ে নাথ
পনেরো বাইশায় শূন্য সাত।
কমল বলল, এর অর্থ কী?
অর্থ ভুলে গেছি। আরেকটা শোন–
মাস মাহিনা যার যত
দিনে তার পড়ে কত?
টাকা প্রতি দশ গণ্ডা দুই কড়া
দুই ক্রান্তি হয়
আনা প্রতি দুই কড়া দুই ক্রান্তি
শিবরাম কয়।
কমল বলল, আরেকটা বলো।
মতিন বলল, এটা হলো বাজার সদাই নিয়ে–
তৈল লবণ মৃত চিনি যাহা
কিনিতে চাই
মণ দরে সেরে টাকায়
আট গণ্ডা পাই।
পোয়া প্রতি দুই গণ্ডা
সেরে ছটাক জেনো
কহেন শুভঙ্কর
এই কথাটা মেনো।
কমল বলল, শুভঙ্কর কে?
উনিও একজন অঙ্কবিদ। তোমার মতো কেউ।
কমল বলল, আমি অঙ্কবিদ না।
মতিন বলল, এখন না হলেও একদিন হবে। তুমি ঘোতনা-ঘুতনির নাম নিয়ে যে অঙ্ক ফেঁদে বসেছ শুভঙ্কর নিজে এই অঙ্ক পারতেন কি-না কে জানে!
তুমি এখন আর কথা বলবে না। আমি নামের কাজটা শেষ করি।
কতক্ষণ লাগবে?
দুই তিন ঘণ্টা।
এতক্ষণ আমি কী করব?
আমি জানি না।
তুমি তাহলে একটা কাজ কর, দরজা বন্ধ করে গুটিগুটি করে লিখে সব কাগজ শেষ কর। আমি আমার একটা কাজ সেরে আসি।
কী কাজ?
আমার একটা বই বের হয়েছে। নদ্দিউ নতিমের বাজেয়াপ্ত নিষিদ্ধ গল্প। বইটার কপি নিয়ে আসব।
ঠিক আছে।
একা থাকতে সমস্যা আছে?
না।
তোমার গাড়ি থাকল। তোমার ড্রাইভার থাকল। চলবে?
হুঁ চলবে।
কাগজ যা আছে তাতে হবে? না আরো কিনে দিয়ে যাব।
আরো দিয়ে যাও।
তোমার যদি ক্ষিধে লাগে তার জন্যে কি খাবার কিনে দিয়ে যাব?
আমার ক্ষিধে লাগবে না।
এক বোতল পানি আর জুস কিনে দিয়ে যাই?
আচ্ছা।
আইসক্রিম খাবে?
খাব।
দুপুরে কী খাবে? পিৎজা?
হুঁ খাব।
মতিন বলল, তুমি যত অঙ্কই কর, তুমি যে বাচ্চা–বাচ্চাই আছ।
কমল জবাব দিল না। সে মহানন্দে 010101 লিখে কাগজ ভরিয়ে ফেলছে।
প্রকাশকের নাম (মতিনের ভাষায় গা প্রকাশক) সারোয়ার খান। তিনি মতিনকে দেখে বিরক্ত গলায় বললেন, আপনি কেমন লেখক বলেন দেখি! পনেরো দিন আগে বই বের হয়েছে, আপনি খোজ নিতে আসেন না। নতুন বই বের হলে লেখকরা আধাপাগলের মতো হয়ে যায়।
