মতিনের দ্বিতীয় দফা চা খাওয়া হয়ে গেছে। চুন্ন মিয়া যে ফ্লাক্স রেখে গেছে। সেখানে আরো এক কাপ চা আছে। শেষ কাপ চা মতিন খেয়ে ফেলবে কি-না এই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। মৃত্যুচিন্তা বিষয়ক প্রবন্ধের সঙ্গে ভোরের চা যায় না। মতিন পড়তে শুরু করল। প্রবন্ধের শুরুটা বেশ নাটকীয়।
তখন গ্রীষ্মকাল। রৌদ্রোজ্জ্বল উজবেক আকাশ। মধ্যগগনের কঠিন সূর্য তার উত্তাপ পূর্ণ শক্তিতে ছড়িয়ে দিচ্ছে। মেঘশূন্য নীল আকাশ সূর্যের কটাক্ষে পিঙ্গল বর্ণ ধারণ করেছে। গ্রীষ্মের তাপদাহে ধরণী ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত।
সেই প্রবল উত্তাপে ঘর্মাক্ত একটি শিশুকে দেখা যাচ্ছে। জলাশয়ের দিকে যেতে। শিশুর খালি গা। পরনে হলুদ রঙের হাফপ্যান্ট। জলাশয়ের শান্ত নিস্তরঙ্গ জলে শিশুটি তার প্রতিবিম্ব দেখতে চায়। সেই শিশুটির নাম তিম। ঘটনার চল্লিশ বছর পর শিশুটি সারা বিশ্বে পরিচিতি পায় নদ্দিউ নতিম নামে। শৈশবে শিশুটির জলাধারে নিজের ছায়া দেখতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক অনেক পরে ভাষা পেয়েছিল তার কবিতায়।
জলে কার ছায়া পড়ে
কার ছায়া জলে
সেই ছায়া ঘুরে ফিরে
কার কথা বলে?
কে ছিল সেই শিশু
কী তাহার নাম?
কেন সে ছায়ারে তার
করিছে প্রণাম।
তিম নামের শিশুটি জলে নিজের ছায়া দেখে কী কারণে জানি চমকালো। সেই চমকে তার পায়ের নিচের মৃত্তিকা এলোমেলো হলো। শিশুটি পড়ে গেল পানিতে। মুহূর্তে বিপুল জলরাশি ঘিরে ধরল তাকে। সে ডুবে যাচ্ছে, ডুবে যাচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছে হিমশীতল গহীনে। তখন কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকল। দূরাগত শঙ্খধ্বনির মতো সেই ডাক–তিম, তুমি কোথায়? তুমি কোথায়?
মে আই কাম ইন?
হাত থেকে পত্রিকা নামিয়ে মতিন তাকাল দরজার দিকে। দরজার ওপাশে সালেহ ইমরান দাঁড়িয়ে আছেন। তার সঙ্গে কমল। সে তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে। তার হাত-পা নড়ছে না। সে শক্ত হয়ে আছে। সে যেন কাঠের কোনো মূর্তি। মূর্তির মাথাভর্তি রেশমি চুলি। বাতাসে সেই চুলগুলি শুধু উড়ছে। মতিন বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল, আসুন আসুন।
মতিনের খালি গা। সে অতি দ্রুত সার্ট গায়ে দিল। সার্টের বোতাম জায়গামতো বসল না। সার্টের একটা দিক বড়, একটা দিক ছোট হয়ে ঝুলবুল। করতে লাগল।
সালেহ ইমরান বললেন, আমি আমার ছেলেকে নিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
মতিন বলল, জি জি।
খবর না দিয়ে চলে এসেছি, সরি। তোমার তো মনে হয় হাত-মুখ ধোয়া হয় নি। আমরা বসছি, তুমি হাত-মুখ ধুয়ে আসো। টেক ইউর টাইম।
মতিন কমলের দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন আছ কমল?
কমল জবাব দিল না। সে তাকিয়ে আছে বন্ধ জানালার দিকে জানালার পাল্লায় দুটি টিকটিকি। টিকটিকি দুটি একই সঙ্গে একটু এগুচ্ছে আবার পিছিয়ে আসছে। কমল ওদের কর্মকাণ্ড দেখছে।
সালেহ ইমরান বললেন, কমলের কী না-কি একটা সিক্রেট আছে, সে তোমার সঙ্গে শেয়ার করবে।
মতিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, অবশ্যই। অবশ্যই। আমাকে সামান্য কিছু সময় দিন। সময় কিছু বেশিও লাগতে পারে। আমাদের একটা মাত্র টয়লেট। সেটা
একতলায়। ছুটির দিনে টয়লেট খালি পাওয়াই সমস্যা।
ইউ টেক ইউর টাইম।
মতিন চলে গেছে। কমলের দৃষ্টি এখনো টিকটিকির দিকে। সালেহ ইমরান বললেন, আমি আমার প্রমিজ রক্ষা করেছি, আমাকে ধন্যবাদ দেবে না?
কমল বলল, ধন্যবাদ।
সালেহ ইমরান বললেন, কী দেখছ? টিকটিকি?
হুঁ। বাবা, ওদের কি কোনো নাম আছে?
ওদের একটাই নাম–টিকটিকি।
ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা, ভাই-বোন সবারই এক নাম? টিকটিকি?
কমল শোন, মাঝে মাঝে তুমি নিতান্তই ছেলেমানুষদের মতো কথা বলো। কখনো কখনো তোমার কথা শুনে মনে হয়, তুমি বয়স্ক জ্ঞানবৃদ্ধ। আবার কখনো মনে হয় তিন-চার বছর বয়েসী শিশু। এই বয়সের শিশুও কিন্তু জানে যে টিকটিকিদের আলাদা নাম হয় না।
সেটা আমিও জানি।
তাহলে জিজ্ঞেস করছ কেন?
ওদের আলাদা নাম নেই এটা অন্যায়, এইজন্যে জিজ্ঞেস করছি। বাবা। শোন, আমি যখন আমার সিক্রেট বলব তুমি তখন আমার সামনে থাকবে না।
ঠিক আছে থাকব না।
মতিন ঘরে ঢুকল চা বিসকিট নিয়ে। সালেহ ইমরান কোনোরকম আপত্তি ছাড়াই চায়ের কাপ হাতে নিলেন। মতিন তার দিকে সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিল। তিনি সিগারেট নিলেন। কমল মতিনের দিকে একঝলক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে অস্পষ্ট গলায় বলল, তোমার ঘরের জানালায় যে দুটি টিকটিকি এদের কি কোনো নাম আছে?
মতিন বলল, অবশ্যই আছে। বড় যেটা দেখছ ওটা মেয়ে। মেয়েটার নাম ঘুতনি। আর রোগাটা ছেলে। ছেলেটার নাম ঘুতনা।
ওদের কোনো ছেলেমেয়ে নেই?
না।
ছেলেমেয়ে হলে ওদের কী নাম রাখবে?
ছেলে হলে নাম রাখব ছে-ঘুতনা। মেয়ে হলে মে-ঘুতনি। ওদের যখন ছেলেমেয়ে হবে, ছে-ঘুতনার ছেলে হলে তার নাম হবে ছেছে-ঘুতনা। মেয়ে হলে মেমে-ঘুতনি।
তোমার নাম দেয়া ভুল হয়েছে। ঘুতনা-ঘুতনির ছেলে হলে তার নাম দেয়া উচিত ছেঘুতানাঘুতনি।
সালেহ ইমরান চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, এই আলোচনা বন্ধ থাকক। মতিন শোন, আমি ঘণ্টাখানিকের জন্যে কমলকে তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। একটা গাড়িও থাকল। কমলের কথা শেষ হলে তাকে তুমি একটু কষ্ট করে বাড়িতে পৌঁছে দেবে। পারবে না?
মতিন বলল, পারব, তবে আপনি সময় বেঁধে দেবেন না। সে যতক্ষণ থাকতে চায় থাকুক। যখন সে চলে যেতে চাইবে আমি তাকে দিয়ে আসব। আমি যতদূর জানি সেভাবে করে আপনারা তাকে কখনো বাইরে নেন না। সে বাইরের লোকজন দেখুক। হৈচৈ শুনুক। এটা তার জন্যে ভালো হবে।
