সালেহ ইমরান সিগারেট ধরালেন। মুনা বলল, শোবার ঘরে সিগারেট ধরালে যে?
সালেহ ইমরান সিগারেট হাতে শোবার ঘরের বারান্দায় চলে এলেন। বারান্দা তার পছন্দের জায়গা। টব দিয়ে বারান্দা ঘেরা। টবভর্তি নানান ধরনের ফুলের গাছ। গাছগুলি যত্নে আছে বোঝা যায়। সতেজ পাতা ঝলমল করছে।
মুনা শোবার ঘর থেকে বলল, তুমি কি চা খাবে?
সালেহ ইমরান বললেন, না।
মুনা বলল, আমার খেতে ইচ্ছা করছে। তুমি যদি খাও তাহলে বারান্দায় বসে এককাপ চা খাওয়া যায়।
দিতে বলো।
চা খেতে খেতে তোমার সঙ্গে একটা জরুরি বিষয় নিয়ে ডিসকাস করব।
আজই করতে হবে?
হ্যাঁ আজই। জরুরি বিষয় নিয়ে আলাপের জন্যে নিশ্চয়ই পঞ্জিকা দেখে দিনক্ষণ ঠিক করার প্রয়োজন নেই।
না নেই।
সালেহ ইমরান বারান্দার বাতি নিভিয়ে বারান্দা পুরোপুরি অন্ধকার করে দিলেন। যেন বাইরে থেকে কেউ কিছুই দেখতে না পারে। তার ভয় মুনাকে নিয়ে। সে ঘুমুতে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছে। সে যখন বারান্দায় এসে চেয়ারে বসবে তখন সম্ভাবনা শতকরা পঞ্চাশ যে তার গায়ে কোনো কাপড় থাকবে না।
মুনা দুকাপ চা নিয়ে ঢুকল। সালেহ ইমরান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মুনার গায়ে কাপড় আছে। মুনা বলল, তুমি সবসময় লিকার চা খাও। এখন থেকে খাবে দুধ চা।
সালেহ ইমরান চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বললেন, কেন?
দুধ চা লেবু চায়ের চেয়ে হাজার গুণ ভালো।
আমি তো এতদিন উল্টোটা জানতাম।
মুনা বলল, ভুল জানতে। চায়ের ভেতর আছে ট্যানিন। এটা একটা কার্মিনোজেন। যখন চায়ে দুধ দেয়া হবে তখন সেই দুধ ট্যানিনের সঙ্গে রি অ্যাক্ট করে একটা পানিতে দ্রবণীয় কম্পাউন্ড তৈরি করবে। তখন সেই কম্পাউন্ড দ্রুত শরীর থেকে ইউরিনের সঙ্গে বের হয়ে যাবে।
জটিল কেমিস্ট্রি। বলেছে কে? ম্যাজিসিয়ান ফারুক?
হ্যাঁ।
সে কি কেমিস্ট্রিও জানে নাকি?
কিছুটা তো জানেই।
Thats very good.
মুনা বলল, ঠিক করে বলো তো, তুমি কি ওকে হিংসা কর?
সালেহ ইমরান বললেন, ওকে হিংসা করার মতো কোনো কারণ কি তৈরি হয়েছে?
মুনা বলল, প্যাঁচানো জবাব দেবে না। বলো Yes কিংবা No।
সালেহ ইমরান বললেন, তোমার কাছ থেকে জরুরি কিছু কথা শুনব বলে আমরা মাঝরাতে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি। এখন তোমার জরুরি কথা শুনি। পরে Yes কিংবা No বলব।
এখন Yes, No বলতে সমস্যা কোথায়?
সালেহ ইমরান বললেন, ম্যাজিশিয়ান ফারুককে নিয়ে কথা বলতে এই মুহূর্তে আমার ইচ্ছা করছে না। তুমি তোমার কথাগুলি বলো, আমি শুনি।
মুনা কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। চায়ের কাপে পর পর দুবার চুমুক দিয়ে হালকা গলায় বলল, তোমার সঙ্গে জীবন্যাপন করে আমি এখন আর কোনো আনন্দ পাচ্ছি না।
আগে কি পেতে?
মনে হয় আগেও পেতাম না।
এটাই তোমার জরুরি কথা?
হ্যাঁ। কেন, কথাগুলি কি তোমার কাছে তেমন জরুরি মনে হচ্ছে না?
সালেহ ইমরান জবাব দিলেন না। মুনা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, আমি ভীষণ বোরড ফিল করি। মনে হয় আমি একজন Extra। আমার কিছু করার নেই। দৈত্য যেমন কলসির ভেতর বন্দি থাকে আমিও সেরকম বন্দি।
কলসির ভেতর থেকে তোমাকে বের করে আনার জেলে কি আছে?
তার মানে?
কথার কথা বললাম। বন্দি দৈত্যকে এক জেলে মুক্ত করেছিল।
আমার সঙ্গে হেঁয়ালিতে কথা বলবে না। দয়া করে আমার মানসিক অবস্থাটা বুঝার চেষ্টা করবে। মানসিকভাবে আমাকে ঠিক রাখার দায়িত্ব তোমার।
কী করলে তুমি মানসিকভাবে ঠিক হবে?
এখনো বুঝতে পারছি না। মাঝে মাঝে মনে হয় কিছুদিন আলাদা কোথাও বাস করলে সব ঠিক হবে।
তাই কর।
কমলকে রেখে যাব কীভাবে?
তাকে নিয়ে যাও।
না, তাকে নেব না। তাকে সঙ্গে নেয়ার মানে বাড়তি টেনশন নেয়া। আমি আমার নিজের টেনশনেই অস্থির।
সালেহ ইমরান বললেন, তুমি যা চাইবে তাই হবে।
মুনা বলল, আমি যা চাইব তাই?
সালেহ ইমরান বললেন, অবশ্যই।
মুনা বলল, আমি যদি বলি গাড়ি বের কর, তোমাকে পাশে নিয়ে লং ড্রাইভে যাব। হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চলতে থাকবে সিলেটের দিকে। গাড়িতে গান। বাজবে। আমরা কোথাও থামব না, চলতেই থাকব। যখন ভোর হওয়া শুরু হবে তখন ঢাকার দিকে রওনা হবো। ড্রাইভার গাড়ি চালাবে না। আমি চালাব। তুমি পাশে বসে থাকবে। রাজি আছ?
সালেহ ইমরান চুপ করে রইলেন। জবাব দিলেন না। মুনা বলল, আমি যা চাইব তাই হবে এটা হলো তোমার কথার কথা। আমি যা চাইব তা কিন্তু হবে না। আমার যে চাওয়াতে তোমার সায় আছে তাই হবে।
সালেহ ইমরান হাতের সিগারেট ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। মুনা বলল, তোমার ঘুম পেলে ঘুমুতে যাও। আমি আরো কিছুক্ষণ রারান্দায় বসে থাকব। বারান্দায় বসে থাকতে আমার ভালো লাগছে।
সালেহ ইমরান শান্ত গলায় বললেন, ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলো, আমরা সিলেটের দিকে রওনা হবো।
মুনা অবাক চোখে তাকাল।
সালেহ ইমরান বললেন, আই মিন ইট।
ভোরের স্বদেশ পত্রিকা
ভোরের স্বদেশ পত্রিকার শুক্রবারের সাহিত্য পাতায় নদ্দিউ নতিমের মৃত্যুচিন্তা বিষয়ক প্রবন্ধটা ছাপা হয়েছে। মতিনের হাতে পত্রিকা। সকাল দশটা। তার ঘুম এখনো পুরোপুরি ভাঙে নি। সাপ্তাহিক ছুটির দিলে সে ঠিক করেই রাখে ঘুম ভাঙুক কি না-ভাঙুক দুপুর বারোটার আগে সে বিছানা থেকে নামবে না। চায়ের তৃষ্ণা পেলে আধশোয়া হয়ে চা খাবে। মেসের বাবুর্চি চুন্ন মিয়া তাকে চা দিয়ে যায়। চায়ের জন্যে মতিনকে টাকা-পয়সা দিতে হয় না। বিনিময়ে মতিনকে চুন্ন। মিয়ার চিঠিপত্র লিখে দিতে হয়। দেশে টাকা পাঠানোর মানি অর্ডার লিখে দিতে হয়। চুন্ন মিয়া ব্যাংকে একটি ডিপোজিট পেনসন স্কিম খুলেছে। তার কাগজপত্র লেখালেখির ব্যাপারও আছে।
