মুনা বলল, তুমি এক কাজ কর, বসার ঘরে গিয়ে বসো। আমি কমলকে নিয়ে আসছি। ম্যাজিক শো শুরু হবে।
সালেহ ইমরান অবাক হয়ে বললেন, কিসের ম্যাজিক শো?
তুমি ভুলে গেছ? আজ ফারুকের ম্যাজিক দেখাবার কথা না!
সালেহ ইমরান বললেন, আজ বাদ থাক। শরীরটা ভালো লাগছে না।
শরীর ভালো লাগছে না, ম্যাজিক দেখলে ভালো লাগবে। বেচারা কবুতর টবুতর নিয়ে এসেছে।
কবুতর কেন?
ওর একটা খেলা আছে–Dove production. একটা খালি টিনের কৌটা থেকে কবুতর বের করে।
সালেহ ইমরান বললেন, আমার আজ কেন জানি কবুতর দেখতে ইচ্ছা করছে না।
তোমার ছেলে ম্যাজিক পছন্দ করবে। ছেলের জন্যে তুমি এটুকু করবে না?
ম্যাজিক শো শুরু হয়েছে। প্রথমেই টিনের খালি কৌটা থেকে কবুতর বের করার খেলা। টিনের খালি কৌটা সবাইকে দেখানো হলো। কমল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। খালি কৌটার ভেতর সিল্কের একটা সাদা রুমাল ঢুকানো হলো। সেই রুমালটা হয়ে গেল ধবধবে সাদা একটা কবুতর।
কমল মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে কবুতরটার দিকে। কী সুন্দর কবুতর! টেবিলের এক কোনায় শান্ত হয়ে বসে আছে। উড়ে চলে যাচ্ছে না। চোখ দুটিও কী সুন্দর! কাচের পুতির মতো জ্বলজ্বল করছে। কমল তার মাকে নিচু গলায় বলল, মা, কবুতরটার নাম কী?
মুনা বলল, কবুতরটার কোনো নাম নেই।
কমল বলল, নাম নেই কেন?
পশু-পাখিদের নাম থাকে না।
কমল বলল, কেন পশু-পাখিদের নাম থাকবে না?
মুনা বলল, বিরক্ত করবে না। ম্যাজিক দেখ।
ম্যাজিশিয়ান ফারুক অনেকগুলি আইটেম দেখালেন। দড়ি কাটার খেলা। যতবার দড়ি কাটা হচ্ছে ততবারই জোড়া লেগে যাচ্ছে। লিংকিং রিং। একটা রিং আরেকটা রিং-এর ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। অথচ রিং-এর মধ্যে কোনো ফাঁক ফোকর নেই। পিং পং বলের খেলা। একটি বল হয়ে যাচ্ছে দুটি বল। দুটি হয়ে যাচ্ছে তিনটি। তিনটি থেকে চারটি।
কমল ম্যাজিক দেখছে না। তার স্থির দৃষ্টি কবুতরটার দিকে। কবুতর যেদিকে তাকাচ্ছে সে ঠিক সেদিকেই তাকাচ্ছে। কবুতর তাকাল মাথার উপরের সিলিং ফ্যানের দিকে। কমলও সেদিকে তাকাল। একসময় সে বাবার দিকে ঝুঁকে এসে বলল, বাবা, আমি কি এই কবুতরটার নাম দিতে পারি?
সালেহ ইমরান বললেন, অবশ্যই পার।
কমল বলল, তার আগে আমাকে জানতে হবে এটা ছেলে কবুতর, না মেয়ে কবুতর।
এটা ছেলে না মেয়ে আমি জানি না। তুমি বরং এমন একটা নাম রাখ, যে নাম ছেলের জন্যেও চলে, মেয়ের জন্যেও চলে।
আমি ওর নাম রাখলাম Xodarap.
সুন্দর নাম। মানে কী?
মুনা তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা তো কথাই বলে যাচ্ছ। ম্যাজিক দেখছ না। ফর গডস সেক, চুপ করবে?
পিতাপুত্র দুজনই চুপ করে গেল।
এখন শুরু হয়েছে আঙুল কাটার খেলা। একটা ধারালো ছুরি দিয়ে মাজিলিয়ান তার তর্জনী কেটে ফেলবেন। সেই আঙুল আবার জোড়া দেয়া হবে। মুনা বললেন, এই ম্যাজিকটা থাক। আমার কেমন যেন লাগে। মনে হয় রিয়েল। কাটা আঙুল জোড়া লাগবে না ভেবে টেনশন হয়।
ফারুক বললেন, এটাই সবচে ইন্টারেস্টিং আইটেম।
আঙুল কাটা ম্যাজিকের প্রস্তুতি চলছে। কমল এখনো তাকিয়ে আছে কবুতরের দিকে। সে বাবার দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে বলল, বাবা, দেখ কবুতরটা টেবিলে পুপু করে দিয়েছে। ইন্টারেস্টিং না?
সালেহ ইমরান বললেন, হুঁ।
পুপু করার পর কবুতরটা একটু সামনে এসেছে।
হুঁ।
কেন বাবা?
জানি না কেন।
আমার ধারণা তারা পরিষ্কার জায়গা ছাড়া পুপু করে না।
সালেহ ইমরান চাপা গলায় বললেন, বাবা চুপ কর, তোমার মা আবার রাগ করবেন। ম্যাজিক দেখ।
ম্যাজিসিয়ান ফারুক তার তর্জনী কেটে ফেলেছে। গলগল করে কাটা আঙুল দিয়ে রক্ত পড়ছে। মুনা ভয়ে মুখে আঁচল চাপা দিয়েছেন। কমল এইসব কিছুই দেখছে না। তার দৃষ্টি কবুতর এবং কবুতরের পুপুতে নিবদ্ধ।
সে ভাবছে কবুতরটা কথা বলতে পারলে ভালো হতো। তাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করা যেত। যেমন, এই মুহূর্তে তার মাথায় একটা প্রশ্ন এসেছে। কবুতরের পা আছে কিন্তু হাত নেই। হাতের বদলে ডানা। ডানা কি হাতের চেয়ে ইম্পোর্টেন্ট? মানুষের যদি হাতের বদলে ডানা থাকত তাহলে কেমন হতো? পৃথিবীতে এমন কোনো পাখি বা প্রাণী কি আছে যাদের হাতও আছে আবার ডানাও আছে?
রাতে ঘুমুবার সময় মুনা মুখে ফেসপ্যাক দেয়। সারা মুখে সাদা আস্তরণ, শুধু চোখ আর ঠোঁট বের হয়ে থাকে। তাকে তখন ভয়ঙ্কর দেখায়। রাতের পর রাত এই দৃশ্য দেখে সালেহ ইমরানের অভ্যস্ত হয়ে যাবার কথা। তিনি অভ্যস্ত হতে পারেন নি। বিছানায় যাবার আগ পর্যন্ত তিনি চেষ্টা করেন স্ত্রীর দিকে না তাকাতে। বিছানায় যাবার পর তাকে বাধ্য হয়েই স্ত্রীর দিকে তাকাতে হয়। স্বামী অন্যদিকে ফিরে ঘুমাবে এটা তিনি পছন্দ করেন না।
মুনা বলল, তুমি কি জানো ক্লিওপেট্রা মোটেই রূপবতী মহিলা ছিলেন না?
সালেহ ইমরান বললেন, এই তথ্য জানি না।
মুনা বলল, সারা পৃথিবীতে ক্লিওপেট্রাকে নিয়ে মাতামাতি, অথচ সে ছিল আগলি।
আগলি?
হ্যাঁ, তার পা ছিল বাঁকা। ধনুকের মতো বাঁকা। সারা গাভর্তি লোম।
কে বলেছে? ফারুক বলেছে। তার পড়াশোনা ভালো। তার প্রিয় বিষয় হলো ইতিহাস।
ও আচ্ছা।
সে খুব মজার মজার ইতিহাসের গল্প জানে।
সালেহ ইমরান বললেন, ম্যাজিক শোর মতো একদিন তার ইতিহাস শোর আয়োজন করো। সে ইতিহাসের গল্প বলবে, আমরা শুনব।
ঠাট্টা করছ?
না, ঠাট্টা করছি না।
তোমার গলার স্বরে ঠাট্টা ভাব আছে।
