এই নিয়ে সে হয়তো কুলসুমকে কিছু বলতো, কিন্তু এর মধ্যে চলে আসে বুধার মেয়ে, ও চাচী, ঢেকিত দুইটা পাড় দিয়া তুমি ঘরত আসিছে, হামি একলা এখন কী করি, কও তো?
চল। বলে কেরামতের উপহার সিঙি মাছগুলো মাটির বড়ো মালসায় পানিতে জিইয়ে রেখে তার ওপর মাটির সরা চাপা দিয়ে দরজা আগলে রেখে চলে যায় কালাম মাঝির বাড়ি। আজ ভোর থেকে সেখানে ধান কোটার ধুম। বাড়ির জন্যে চাল তো লাগবেই, তহসেনের টাউনের বাসাবাড়ির জন্যে লাগবে এক মণ।।
কালাম মাঝির বৌটা মানুষ ভালো, কুলসুমকে খুব একটা খাটায় না। কুলসুমের টেকির পাড় ভালো, আবার সারাদিন পাড় দিয়েও হাপসে যায় না। আবার এই অছিলায় ওই বাড়িতে থাকলে দুপুরের খাওয়াটা পাওয়া যায়, ভাতের সঙ্গে মাছও জোটে। তহসেনের সৎ মা তাকে একটু পছন্দই করে। কিংবা মাঝিপাড়ায় স্বামীর অপরাধের ভারটা একটু কমাতে চায় তাকে খুশি করে। আবার অন্য ব্যাপারও থাকতে পারে। সেদিন সন্ধ্যাবেলা তাকে আড়ালে পেয়ে আস্তে করে বলে, কুলসুম, কেরামতের সাথে তুই লিকা বস। কেরামত মানুষ ভালো। তবু পুরুষমানষের মন, উলটাতে কতোক্ষণ? কিন্তু মনে হয় অন্য কোনো পুরুষমানুষ তার উদ্বেগের কারণ। আজ সকালে বলছিলো, কুলসুম, হামার ঘরের বারান্দাত না শুয়া তুই বুধার ঘরের সাথে থাকিস। ওটি বিছনা। পাতিস। কুলসুম ঠিক বুঝতে পারে না। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে সে তার বিছানার পাশে লম্বা একটি ছায়া দেখতে পেয়ে বরং খুশিই হয়েছিলো, তমিজের বাপ তবে এখানেও এসে হাজির হয়েছে। তহসেনের মাকে এই ঘটনা বলার কয়েক ঘণ্টা পর সে তার শোবার জায়গা বদলাতে বলে।
তমিজের বাপ আবার বুধার ঘরের বারান্দা ঠাহর করে যেতে পারবে তো?-কুলসুম একটু দুশ্চিন্তায় পড়ে। তবে চেঁকিশালেই বিকালের দিকে হঠাৎ আস্তে করে গায়ে তার ঠাণ্ডা হাওয়া লাগলে মাথাটা সাফ হয়ে যায়। দুপুরে বুধার মেয়ের সঙ্গে এখানে আসার পরই এক পশলা বৃষ্টি হলো। তারপর শুরু হলো গুমোট, ভ্যাপসা গরম আর কাটে না। চেঁকিশালে সবাই ঘামছে দরদর করে ঘাম নাই খালি কুলসুমের শরীরে। তার গায়ে ফুরফুরে হাওয়া। এর মানে কী? এটা কি ফকিরের কাম? না। এই ভ্যাপসা গরমে হঠাৎ করে ঝিরঝিরে হাওয়া খেলাতে পারে এক মুনসি। কিন্তু তার হাওয়া আসে পাকুড়তলা থেকে, বিলের শিংমাগুর আর পাবদা ট্যাংরা আর খলশে পুঁটি আর রুই কাতলা, সাঁতরানো পানির ওপর ভাসতে ভাসতে সেই হাওয়ায় জমে হালকা মিষ্টি আঁশটে গন্ধ। আর আজ এই ফুরফুরে হাওয়ায় মিশেল রয়েছে জর্দার হালকা গন্ধ। দুটো গন্ধ এক হয়ে যাচ্ছে বলে কুলসুম এগুলোকে আলাদা করে ঠাহর করতে পাচ্ছে না। টেকির পিছাড়ির ওপর তার পা ধীর হয়ে আসে, বুধার মেয়ে বলে, ও চাচী, কী হলো তোমার? মনুয়া তো হামার হাতের উপরে পড়িচ্ছিলো। পেঁকির মুগুর হাতে পড়লে বুধার মেয়ের হাতটা ঘেঁচে যাবে না? বুধার ছোট্ট মেয়েটা ছড়া কাটে, আড় মাছে পাড় দেয়, বেলে মাছে এলে দেয়। শোলোক শুনতে শুনতে কুলসুমের মাথাটা ঘোরে, সেকি জর্দার গন্ধে, না বাঘাড়ের আঁশটে গন্ধে, না-কি শুধুই শিশুকণ্ঠের শোলোকের বোলে তা ধরতে না পেরে কুলসুম বলে, এখন থাক রে। একটু দম লেই।
৫৪. ভোরবেলা বৃষ্টিতে সবাই কমবেশি ভেজে
ভোরবেলা বৃষ্টিতে সবাই কমবেশি ভেজে। রাতভর যে ঝড়টা গেলো, ভোরে রওয়ানা হওয়া যায় কি-না সন্দেহ ছিলো। স্টেশনে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের জিপ থেকে নামাবার সময় ছোটো বড়ো মেজো তিনটে সুটকেস, ট্রাংক, হোল্ডঅল ও খাবার বাস্কেট একটু একটু ভেজে। এমন কি যত্ন ও সতর্কতা সত্ত্বেও বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে কাদেরের হাতের পানির সোরাই টইটম্বুর হয়ে যায়। ট্রেন প্রায় আধ ঘণ্টা লেট। এর মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেলো, তবে আকাশ মেঘলাই হয়ে রইলো।
ইসমাইল হোসেনের বেগম সাহেবা, তার এক ছেলে, দুই মেয়ে ও কাজের মেয়েটিকে ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার ভার পড়েছে কাদেরের ওপর, ঘাড় পেতে এই দায়িত্ব সে নিয়েছে নিজেই। এই সঙ্গে তার বিয়ের বাজারটাও সেরে নেবে। শাড়ি, গয়নাপাতি, কাপড়চোপড়, প্রসাধন ও সুটকেস কেনা হবে ইসমাইলের তত্ত্বাবধানে। শরাফত মণ্ডল সেদিন হোসেন মঞ্জিলে নিজে রিজিয়া বেগমকে অনুরোধ করে এসেছে, মা, আপনাগোরে বাড়ির মেয়ে ঘরে আনিচ্ছি, আপনার পছন্দমতো দেখাশুন্যা যা ভালো মনে হয় তাই কিনবেন।
এই সুযোগে আবদুল কাদের ঢাকায় পার করে দিচ্ছে তমিজকে। ইসমাইল হোসেনের ঢাকার বাড়িতে একবার পাচার করে দিতে পারলে পুলিসের সাধ্য কি তাকে ধরে? তদবির করে তার নামে মামলাটাও খারিজ করে নিয়ে ফের তাকে নিয়ে আসা যাবে গিরিরডাঙায়। তখন দেখা যাবে, কালাম মাঝি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ভোট কীভাবে করে!
ইসমাইল হোসেনের ঢাকার বাড়িতে এরকম বিশ্বাসী চাকর একটা দরকার। রিজিয়া বেগম তাকে স্বামীর একটা পুরনো টুইলের শার্ট, প্রায় নতুন একটা লুঙি, এমন কি একটুখানি ছেড়া ছাই রঙের একটা শেরোয়ানি পর্যন্ত দান করে দিয়েছে অকাতরে। বৌ ও বাচ্চার জন্যে যথাক্রমে শাড়ি, ব্লাউজ ও ফ্রক কিনে দিয়েছে, কাদের সেসব পাঠাবার ব্যবস্থা করেছে নিজগিরিরডাঙায়। তমিজের ওপর রিজিয়া বেগম খুব খুশি। শাশুড়ি ও দেওরের মুখভারের তোয়াক্কা না করেই তাকে সে একরকম ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তা তমিজও তাকে খেদমত করার চেষ্টা করে যতোখানি তার বুদ্ধিতে কুলায়। বৃষ্টি থেকে বাঁচাবার তাগিদে রিজিয়া বেগমের সবচেয়ে ছোটো সুটকেসটা সে তুলে নেয়। কুলির মাথা থেকে এবং ওয়েটিংরুম পর্যন্ত সেটাকে বুক ও পেটের সঙ্গে আঁকড়ে রাখায় সে একবার হোঁচট খায় মাল ওজন করার যন্ত্রের সঙ্গে এবং দ্বিতীয়বার প্ল্যাটফর্মের এক ধারে স্থূপ করে রাখা চালের বস্তায়। বলতে কি, রিজিয়া বেগমকে খুশি করতেই হোসেন। মঞ্জিল থেকে রওয়ানা হবার আগে ছাই রঙের শেরোয়ানিটা সে একবার পরার উদ্যোগ নিয়েছিলো। কিন্তু সবাই এ কী? হাত ঢোকালে না এই গরমে এটা পরো কেন? এটা পরলে তোমাকে বড়দা ভেবে স্টেশন মাস্টার সালাম করে বসবে, এখন খোলো, খুলে। তোমার ওই ব্যাগে রেখে দাও প্রভৃতি মন্তব্য ও পরামর্শে সে ওটাকে ঢুকিয়ে রেখেছে ওর ছালার মধ্যে। ছালাটা কিছুতেই হাতছাড়া করছে না।