এইকথা বলার জন্যেই টেলিফোন করেছিস–না আরো কিছু বলবি?
হ্যাঁ বলব। মীরা নাকি তোকে ছেড়ে চলে গেছে?
হুঁ।
ব্যাপারটা ঘটল কবে?
এই ধর দিন বিশেক।
আমি তো কিছুই জানতাম না। আজ জালাল সাহেব আমাকে বললেন–মীরার বড় ভাই। চিনতে পারছিস?
হ্যাঁ পারছি।
তাঁকে খুব খুশি দেখলাম। তাঁর সঙ্গে তোর কোনো গণ্ডগোল ছিল নাকি?
না।
এত চমৎকার একটা মেয়ে ধরে রাখতে পারলি না? তুই তো বিরাট গাধা।
মীরাও আমাকে ধরে রাখতে পারল না–তাকেও কি মহিলা গাধা বলা যায় না?
তোর সঙ্গে পরে কথা বলব। গাড়ি হর্ন দিচ্ছে।
নুরুল আফসার লাইন কেটে দিলেন।
মীরার সঙ্গে মনজুরের পরিচয় নুরুল আফসারের মাধ্যমে। মীরার বাবা মনসুরউদ্দিন, কুল অফসারের আপন ৰূপা। সে-ই মনসুরউদিনের কাছে মনজুর একটা চিঠি নিয়ে
ক্ষমতাবান মানুষরা সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষাৎপ্রাথীকে সাক্ষাৎ দেন না। তিনি বলে পাঠালেন–অপেক্ষা করতে। সে ঘণ্টাখানিক বারান্দায় রাখা বেতের চেয়ারে বসে রইল। তারপর বিরক্ত হয়ে বাড়ির সামনের বাগানে হাঁটতে লাগল। মনসুরউদ্দিন সাহেব এই সময় বের হয়ে এলেন এবং কঠিন গলায় বললেন–এই যে ছেলে, তুমি কী মনে করে আমার ফ্লাওয়ার বেডের উপর হাঁটছ? কটা গাছ তুমি নষ্ট করেছ জান? ফ্লাওয়ার বেড কাকে বলে সেটা জান? তুমি কোথাকার মূর্খ?
মনজুর পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। একী সমস্যা!
কথা বলছি না কেন? তুমি কোথাকার মূর্থ সেটা জানতে চাই।–Speak out loud.
মীরা হৈচৈ শুনে ঘর থেকে বের হয়ে হাসিমুখে মনজুরকে বলল, আপনি কাইন্ডলি আমার সঙ্গে আসুন তো। প্লিজ আসুন। প্লিজ।
মীরা তাকে বারান্দার এক কোণায় নিয়ে নিচু গলায় বলল, বাবার ব্যবহারে আমি খুবই দুঃখিত, খুবই লজ্জিত। বাবার মাথা পুরোপুরি ঠিক না। বাবাকে প্রথম দেখছেন বলে এ রকম মনে হচ্ছে। আপনাকে বাবা যেভাবে ধমক দিলেন ফুলের গাছগুলোকেও তিনি ঠিক সেইভাবে ধমক দেন। মাঝে মাঝে কিছু কিছু গাছকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আশা করি বাবার মানসিকতা কিছুটা বুঝতে পারছেন। আপনি এখানে চুপ করে বসুন। আমি চা নিয়ে আসি। বাবা যদি কিছু বলেন–কোনো উত্তর দেবেন না। তবে আমার মনে হয় না। তিনি কিছু বলবেন। একবার রেগে যাবার পর ঘণ্টা দু’এক তিনি খুব ভালো থাকেন।
মীরার কথা দেখা গেল সত্যি। কিছুক্ষণ পরই মনসুর উদ্দিন বারান্দায় উঠে এলেন এবং কোমল গলায় মনজুরকে বললেন–আপনাকে তো চিনতে পারলাম না! আপনার পরিচয়? আপনাকে কি চা-নাশতা কিছু দেয়া হয়েছে?
কুদ্দুসের বাসা যাত্রাবাড়িতে।
হাফ বিল্ডিং। পাকা মেঝে, উপরে টিন। বাঁশের বেড়া দিয়ে বাড়ি ঘেরা। বেড়ার আড়াল থেকে কলাগাছের নধর পাতা উকি দিচ্ছে।
মনজুর খানিকটা বিস্ময় নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। এটা কুদ্দুসের বাড়ি তা ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। বেশ শ্ৰীমন্ত চেহারা। বাড়ির ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ আসছে না। সব কেমন ঝিম মেরে আছে। তাই অবশ্যি থাকার কথা। মৃত্যুর প্রথম ধাক্কাটা কেটে গেলে সবাই বেশ দীর্ঘ সময়ের জন্যে চুপ করে যায়। আবার কান্নাকাটি শুরু হয় দিন দুএক পর।
মনজুর কড়া নাড়তেই বুড়ো মতো এক ভদ্রলোক বের হয়ে এলেন। এই প্রচণ্ড শীতেও তাঁর গায়ে পাতলা জামা। তবে গলায় মাফলার আছে। পায়ে মোজা। চোখে চশমা। শিক্ষক শিক্ষক চেহারা।
এটা কুদ্দুসের বাসা?
জ্বি।
কুদ্দুস আছে বাসায়?
না।
আমি কুদ্দুসের জন্যে কিছু টাকা নিয়ে এসেছিলাম।
আমার কাছে দিতে পারেন। আমি তার পিতা। কত টাকা?
আটশ’ টাকা। কবর দিতে মোট কত খরচ হয়েছে?
ভদ্রলোক হতভম্ব হয়ে বললেন, কীসের কবর?
মনজুর হকচাকিয়ে গেল।
সাবিহা নামের একটা মেয়ে মারা গেছে না। এই বাড়িতে?
সাবিহা আমার ছোট মেয়ের নাম। সে মারা গেছে দশ বছর আগে। আপনে কে?
আমি তেমন কেউ না। নাম বললে চিনবেন না।
টাকাটা আমার কাছে দিয়ে যান। আমি দিয়ে দিব।
কুদ্দুসকেই দিতে চাই। আমি অন্য একসময় আসব।
আমার কাছে দিতে না চাইলে অপেক্ষা করেন। কুদ্দুস। দশটার মধ্যে আসে। চা খান। চায়ের অভ্যাস আছে?
আরেক দিন এসে চা খেয়ে যাব।
মনজুর রাস্তায় নেমে এল। তাড়াতাড়ি কোনো একটা রিকশায় উঠে হুড তুলে দিতে হবে। এখন কুন্দুসের সঙ্গে দেখা না হওয়াই ভালো। জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। অসম্ভব ঠাণ্ডা লাগছে। বুকে ঠাণ্ডা বসে না গেলে হয়।
ঘুমাবার আগে আয়নায়
ঘুমাবার আগে আয়নায় নিজেকে দেখার যে বাসনা সব তরুণীর মনেই থাকে। সে বাসনা মীরার ভেতর অনুপস্থিত। ওই কাজটি সে কখনো করে না। চুল বঁধে হাঁটতে হাঁটতে। সেই সময় সে গুনগুন করে গানও গায়। সে কখনো গান শেখে নি, তবে দু একটা সহজ সুর ভালোই তুলতে পারে।
আজ সে আয়নার সামনে বসে আছে।
বিশাল আয়না। এক ইঞ্চি পুরো বেলজিয়াম গ্লাস। সামনে দাঁড়ালে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখা যায়। মনসুরউদ্দিন, মেয়ের ষোল নম্বর জন্মদিনে এই আয়না তাকে উপহার দুবলেছিলেন—রোজ এক বার আয়নার সামনে দাঁড়াবি এবং নিজের সঙ্গে কথা বলবি।
মীরা বিস্মিত হয়ে বলেছিল–কী কথা বলব?
নিজেকে প্রশ্ন করবি।
নিজেকে প্রশ্ন করার জন্যে আয়না লাগবে কেন?
তিনি বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন–তোর সঙ্গে কথা বলাই এক যন্ত্রণা। তুই আমার সামনে থেকে যা।
মীরা হাসতে হাসতে বলল, জন্মদিনে তুমি আমাকে ধমক দিয়ে কথা বলছি। এটা কি বাবা ঠিক হচ্ছে? এখনো সময় আছে। ধমক ফিরিয়ে নাও।
