সোভাহান হেসে ফেলল। রফিক বিরক্ত হয়ে বলল, হাসবেন না। ব্যাপারটা বেশ সিরিয়াস। আপনার হাত দেখার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বাসায় চলুন, সেখানে আমি সব বলব।
বেশ তো চলুন! কিন্তু তার আগে আপনি কি একটা খবর দেবেন না?
কী খবর?
আপনার মামার যে জ্ঞান ফিরেছে, সেই খবর।
খবর দেবার দরকার নেই। আটটার সময় নীলু ভাবী এসে নিজের থেকেই জানবে। মরবার খবর চটপট দিতে হয়। বাঁচার খবর না দিলেও চলে।
সোভাহান যেখানে থাকে, তাকে ঠিক বস্তি বলা যাবে না। কাঁচা ঘর নয়। হাফ বিল্ডিং। দুটি কামরা! আসবাবপত্র যা আছে, তা বেশ গোছানো। হাত দেখা, কোষ্ঠি গণনার প্রচুর বইপত্র।
রফিক বলল, এইসব বই পড়েছেন নাকি?
হ্যাঁ, পড়েছি।
তার পরেও বলেন, আপনি এসব বিশ্বাস করেন না?
জ্বি-না, করি না।
অদ্ভুত লোক ভাই আপনি। দেখি, চায়ের ব্যবস্থা করুন।
সোভাহান কেরোসিনের চুলা ধরাল। চায়ের কাপ সাজোল। সহজ গলায় বলল, রফিক সাহেব, চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবেন?
খিদে-খিদে অবশ্যি লাগছে। কী আছে ঘরে?
মুড়ি খাবেন? তেল-মরিচ দিয়ে মেখে দিই?
দিন। লোকজন আসে কেমন আপনার কাছে?
বেশি আসে না। তবে আসে কিছু কিছু। টাকা যা পাই, তার থেকে বাড়িভাড়া দিই। খাবার খরচ ওঠে।
জমে না কিছু?
না। সঞ্চায়ের ব্যাপারটা আমার মধ্যে নেই। কার জন্যে সঞ্চয় করব বলুন। আমরা নগ্ন হয়ে পৃথিবীতে এসেছিলাম, নগ্ন হয়ে ফিরে যেতে হবে।
কিন্তু দিন বাঁচবেন, নগ্ন হয়ে বাঁচতে পারবেন না। কিছু একটা গায়ে হবে।
দিতেই হবে, এমন কোনো কথা কিন্তু নেই। কেউ কেউ জীবনও নগ্নগাত্রে কাটিয়ে দেন।
কাইণ্ডলি আপনার হাই ফিলসফি রেখে আমার হাতটা দেখুন। আপনি বলেছিলেন, আমি প্রচুর পয়সা করব।
তা বলেছিলাম।
সে-রকম লক্ষণ অবশ্যি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু স্ত্রীভাগ্যে ধন, তা তো মনে হচ্ছে না। যা হচ্ছে, বন্ধুভাগ্যে হচ্ছে।
তাই নাকি?
জ্বি, তাই। আজ একটু সময় নিয়ে হাতটা দেখুন। ম্যাগনিফাইয়িং গ্রাসফ্লাস যা আছে বের করুন। বিনা পয়সায় হাত দেখাব না, রীতিমতো ফী দেব। কত নেন। আপনি? রেট কত?
বাঁধা কোনো রেট নেই। যার যেমন খুশি দেয়।
আমার কাছে কুড়িটা টাকা আছে, এর অর্ধেক আপনাকে দিয়ে দেব। দেরি করে লাভ নেই। এখনই নিয়ে নিন।
সোভাহান হাসল। চায়ের পানি ফুটছে। কোৎলিতে চায়ের পাতা ছাড়ল। রফিক ছেলেটিকে তার বেশ পছন্দ হয়েছে। চমৎকার ছেলে।
রফিকের ভাগ্য পরিবর্তনের একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ব্যাপারটা অনেকটা গুপ্তধন পাওয়ার মতো। ঢাকা কলেজে তার সঙ্গে ইদরিস বলে একটা ছেলে পড়ত। মহা হারামি। সবার সঙ্গে ফাজলামি করত। ফিজিক্স-এর নবী স্যারের মতো কড়া লোকের ক্লাসেও এক দিন বাঘের একটা মুখোশ পরে হাজির। নবী স্যার বেশ অনেকক্ষণ। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। সবার নিঃশ্বাস বন্ধ। না জানি কী হয়। নবী স্যার খুব ঠাণ্ডা গলায় বললেন, কী ব্যাপার?
ইদরিস বলল, কোনো ব্যাপার না স্যার। ছোট ভাইয়ের জন্যে কিনেছিলাম। একটু পরে দেখলাম। এখন খুলে ফেলব।
খুব ভালো কথা। নাম কী তোমার?
আমার নাম ইদরিস।
ক্লাসের শেষে আমার সঙ্গে দেখা করবে।
জ্বি-আচ্ছা, স্যার।
নবী স্যার ইদরিসকে পঁচিশ টাকা ফাইন করে দিলেন।
সেই ইন্দরিস এক দিন বাসায় এসে উপস্থিত। গলায় মাইক লাগিয়ে চিৎকার-তুই দেখি ব্যাটা দাড়ি-গোঁফ গজিয়ে রবীন্দ্রনাথ হয়ে গেছিস!
চেষ্টা করছি।
শুনলাম, বেকার।
আগে তো শুনেছিস, এবার স্বচক্ষে দেখ।
হা হা হা। ব্যাটা তোর রস কমে নি দেখি। চল আমার সঙ্গে।
কোথায়?
একটা ব্যবস্থা করে দিই।
কী ব্যবস্থা করবি?
বিজনেসে লাগিয়ে দিই। একটা ইনডেনটিং ফার্ম খুলে ফেলা।
সেটা আবার কী?
কাগজে-কলমে ব্যবসা। দালালি যাকে বলে।
করতে হয় কী?
কিছুই করতে হয় না। বড়ো-বড়ো কানেকশন থাকতে হয়। তোর তা আছে। তোর শ্বশুর তো বিরাট মালদার পাটি। চল তোকে নিয়ে বের হই।
রফিক বের হল। সারা দিন ঘুরল। ব্যবসার কথাটথা বলল।
বুঝলি রফিক, তোর ব্রেইন আছে, তুই এই লাইনে উন্নতি করবি। ব্যবসা বুঝে নিতে মাস ছয়েক লাগবে, তারপর দেখবি আঙুল ফুলে বটগাছ। মানুষের বেলায় সাধারণত কলাগাছ হয়, আমার ধারণা তোর বেলা হবে বটগাছ। যাকে বলে বটবৃক্ষ।
ক্যাপিটেল লাগবে না? তা তো লাগবেই। লাখ তিনেক টাকা শুরুতে লাগবে।
সর্বনাশ! নয় মন তেলও পুড়বে না, রাধাও নাচবে না। তিন লাখ টাকা কে দেবে আমাকে।
ব্যাঙ্ক দেবে।
ব্যাঙ্ক কেন দেবে।
কেনার প্রশ্ন তুলিস না। ব্যাঙ্কের লক্ষ লক্ষ টাকা দশ ভূতে লুটে খাচ্ছে। ব্যাঙ্কগুলি হচ্ছে কিছু সুবিধাবাদী লোকের টাকা মারার যন্ত্র। তোকে আমি লোন পাইয়ে দেব।
তোর স্বাৰ্থ কী?
আছে, স্বাৰ্থ আছে। বিনা স্বার্থে আমি কিছু করব নাকি? ইদরিস সেই ইদরিস নয়। এখনই সেটা বলব না। তুই আগে মনস্থির কর, বিজনেস করবি, না আদর্শ বাঙালি ছেলের মতো দশটা-পাঁচটা অফিস করবি। তোকে সাত দিন সময় দিলাম। সাত দিন বসে বসে ভাব। এই সাত দিন আমার অফিসের কাজকর্ম দেখ। লোকজনের সঙ্গে কথাটথা বল। তারপর এসে বল-ইয়েস অর নো।
আজ রফিকের সেই সাত দিনের শেষ দিন। সন্ধ্যাবেলায় ইদরিসকে কিছু একটা বলতে হবে। রফিক ঠিক করেছে, সোভাহানের এখান থেকে বের হয়েই সোজাসুজি ইদরিসের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হবে। হ্যাঁ বলবে। না বলার কোনো অর্থ হয় না।
সোভাহান দীর্ঘ সময় হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। এক সময় বলল, আপনার ব্যবসা হবে। লেগে যান।
