নীলু অবাক হয়ে বলল, হ্যাঁ। কেন?
একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম কাগজে, চোখে পড়ে নি?
তিনি খবরের কাগজ মেলে ধরলেন।
ভাবলাম, একটা বিদ্যা যখন শিখলাম, কষ্ট করে তখন কাজে লাগানো যাক। কি বল?
তা তো ঠিকই।
এটাও এক ধরনের সমাজসেবা, কি বল মা?
তা তো নিশ্চয়ই।
গরিব-দুঃখীদের কাছ থেকে পয়সা নেব না ঠিক করেছি। তবে অন্যদের কাছ থেকে নেওয়া হবে। বাসায় এলে দশ টাকা, আর কল দিয়ে নিয়ে গেলে কুড়ি টাকা। বেশি হয়ে গেল নাকি?
না, বেশি হয় নি, ঠিকই আছে।
হোসেন সাহেব ইতস্তত করে বললেন, বাড়ির সামনে একটা সাইন বোর্ড দিতে হবে। ডাঃ এম হোসেন হোমিও-কী বল মা? লোকজন বিজ্ঞাপন দেখে আসবে, বাসা খুঁজে বের করতে হবে তো?
সাইন বোর্ড তো দিতেই হবে। আপনি রফিককে বলে দিন, ও সাইন বোর্ড করিয়ে নিয়ে আসবে।
হ্যাঁ, বলব। ইয়ে, আরেকটা কথা মা।
তোমার শাশুড়িকে কিছু না-বলাই ভালো। মানে, কিছু চিন্তা-ভাবনা না করেই রেগে যায় তো, সে জন্যেই বলছি।
না বাবা, আমি কিছু বলব না।
নীলুর কথার মাঝখানেই মনোয়ারা ঢুকলেন। হোসেন সাহেবকে দেখেই রেগে উঠলেন।
রান্নাঘরে ঘুরঘুর করছ কেন? পুরুষমানুষদের রান্নাঘরে ঘুরঘুর করা আমার পছন্দ না। যাও, টুনীদের বই নিয়ে বসাও।
অন্য দিন হলে তিনি কিছু বলতেন। রান্নাঘরে পুরুষমানুষদের থাকা উচিত, না উচিত নয়-এই নিয়ে মোটামুটিভাবে একটা তর্ক বাঁধিয়ে বসতেন। আজ কিছুই বললেন না। টুনী এবং বাবলুকে নিয়ে পড়াতে বসলেন।
মনোয়ারা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোমার শ্বশুরের কাণ্ডকারখানায় লজ্জায় মুখ দেখানো দায়। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে, দেখেছ? এম. হোসেন দেখেই সন্দেহ হয়েছিল, ঠিকানা দেখে বুঝলাম। তোমাকে বিজ্ঞাপনের কথাই বলছিল বোধহয়।
জ্বি।
লোকটা যে বোকা, তাও না। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন সব কাণ্ড করে! সে এক মহা ডাক্তার হয়ে গেছে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে। চিন্তা কর অবস্থা।
নীলু মৃদুস্বরে বলল, কিছু বলার দরকার নেই মা।
না বললে তো আশকারা দেওয়া হবে। এসব জিনিস আশিকার দিতে নেই।
টুনী এবং বাবলু পড়তে বসেছে। এদের পড়ানোর কাজটা হোসেন সাহেব নিজেই আগ্রহ করে নিয়েছেন। পড়াশোনা চলছে তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে। প্রতিদিন একটি করে অক্ষর নানানভাবে শেখানো হচ্ছে। হোসেন সাহেব হিসাব করে দেখেছেন, এগারটি স্বরবর্ণ শিখতে লাগবে এগার দিন এবং ব্যঞ্জনবর্ণ শিখতে লাগবে আটত্রিশ দিন! মোট এক মাস উনিশ দিনে প্রতিটি বর্ণ তারা পড়তে এবং লিখতে শিখবে।
আজ শেখান হচ্ছে গ। হোসেন সাহেব প্রকাণ্ড একটা গ লিখে দেয়ালে বুলিয়েছেন। গ দিয়ে দু লাইনের একটি ছড়া তৈরি করা হয়েছে। টুনী এবং বাবলু মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ছড়াটি পড়ছে।
গ তে হয় গরু
তার পা দুটি সরু।
গরুর শিং বাঁকা
গরু যায় ঢাকা।
বাবলু এমনিতে কথাবার্তা একেবারেই বলে না, কিন্তু ছড়া বলতে তার একটা আগ্রহ আছে। সে টুনীর সঙ্গে গলা মিলিয়ে সুর করে ছড়া পড়ছে।
হোসেন সাহেব বললেন, এইবার লেখা। প্রথমে একটা গরুর ছবি আঁক। শিংওয়ালা গরু, যে ঢাকার দিকে যাচ্ছে। এবং গরুর পাশে আঁক একটা গ। তারপর তোমাদের ছুটি।
টুনী বলল, না দাদু ছুটি না, তুমি গল্প বলবে।
আজ আর গল্প না।
উঁহু, বলতে হবে। শীত-বসন্তের গল্প বলতে হবে।
না, আজ আর কোনো গল্পটল্প হবে না।
বলতেই হবে, বলতেই হবে।
গল্প বলায় হোসেন সাহেবের যথেষ্ট আগ্রহ আছে। গল্প বলতে না চাওয়া হচ্ছে তাঁর দাম বাড়াবার একটা কৌশাল। রোজই বেশ খানিকক্ষণ না-না করেন এবং শেষ পর্যন্ত লম্বা-চওড়া একটা গল্প শুরু করেন-যেটা শেষ হতে দীর্ঘ সময় নেয়। এক সময় টুনী এবং বাবলু দুজনের চোখই ঘুমে জড়িয়ে আসে, তবু তারা জেগে থাকে।
বাবলু। এ বাড়িতে মোটামুটিভাবে সুখেই আছে বলা চলে। কোনো এক বিচিত্ন কারণে শফিক বাবলুকে খুবই পছন্দ করে। সে যে আগ্রহ বাবলুর ব্যাপারে দেখায়, টুনীর ব্যাপারে তা দেখায় না। এটা নীলুকে বেশ পীড়িত করে। এর মধ্যে রহস্য আছে কিনা কে জানে!
অফিস থেকে ফিরেই শফিক ডাকবে, বাবলু সাহেব কোথায়? বাবলু যেখানেই থাকুক গলার স্বর শুনে ছুটে আসবে উস্কার বেগে।
তারপর বাবলু সাহেব, কেমন আছেন?
ভালো।
সারা দিন কী কী করলেন?
(একগাল হাসি)
কী, কিছুই করা হয়নি?
(না-বোধক মাথা নাড়া)
শফিক অফিসের কাপড় ছাড়বে, সে দাঁড়িয়ে থাকবে পাশে। শফিক বাথরুমে যাবে হাত-মুখ ধুতে, সে দাঁড়িয়ে থাকবে দরজার পাশে। শফিক অফিস-ফেরত চা বারান্দায় বসে খাবে। সেও থাকবে বারান্দায়।
নীলু অনেক বার ধমক দিয়েছে, কী সব সময় বড়োদের সঙ্গে ঘুরঘুর করা? যাও, খেলতে যাও।
শফিক প্রশ্রয়ের সুরে বলেছে, আহ, থাক না। বিরক্ত করছে না তো।
ছুটির দিনগুলিতে শফিক দুপুরবেলা শুয়ে থাকে। বাবলু ঠিক তখন শফিকের পাশে বসে থাকে। এবং একটা হাত তুলে দেয় শফিকের গায়ে। এতটা বাড়াবাড়ি নীলুর ভালো লাগে না। কোনো কিছুর বাড়াবাড়িই ভালো th]।
নীলু প্রায়ই ভাবে এই প্রসঙ্গে শফিককে সরাসরি একদিন কিছু বলবে। বলা হয়ে উঠছে না। শফিক আজকাল আগের চেয়েও গভীর। অফিসের ঝামেলা নিশ্চয়ই অনেক বেড়েছে। অফিস সম্পর্কে শফিক কখনো কিছু বলে না, কাজেই আসলে কী হচ্ছে জানার উপায় নেই। অবশ্যি সে এখন ঘরে ফিরছে। সকাল-সকল। টঙ্গি যাচ্ছে না। নীলুর ধারণা ছিল, টঙ্গির কাজ শেষ হয়ে গেছে বলেই যেতে হচ্ছে না। সে ধারণাও ঠিক না। টঙ্গির কাজ শেষ হয় নি। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অন্য এক জনকে। কেন, কে জানে?
