বয়স তো তাহলে অনেক বেশি।
না, বয়স বেশি না। এ বছরই বারে জয়েন করেছে। তুমি যাও তো বৌমা, শাহানাকে কলেজে যেতে নিষেধ করা। ওকে কিছু বলবে না। জানতে পারলে কানাকাটি চেঁচামেচি শুরু করবে।
শাহানা কলেজে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল। নীলুকে দেখে অবাক হয়ে বলল, তুমি আজ অফিসে যাও নি ভাবী?
না।
কেন?
ভালো লাগছে না।
তাহলে আমিও আজ কলেজে যাব না।
ঠিক আছে, না গেলো।
মা বকাবকি করবে।
তা হয়তো করবেন।
করলে করুক। আমি কলেজে যাব না। আজ। তুমি মাকে একটু বলে আস। আমার মাথা ধরেছে কিংবা কিছু একটা হয়েছে।
শাহানা হৃষ্টচিত্তে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কলেজে যেতে হচ্ছে না-এতে সে দারুণ খুশি। তার ধারণা ছিল মা কিছু বলবেন, কিন্তু তিনি কিছু বলছেন না। এ-রকম সৌভাগ্য তার খুব বেশি হয় না। সে টুনীকে সঙ্গে নিয়ে ছাদে বেড়াতে গেল।
আনিসের ঘরের দরজা খোলা। শাহানা উঁকি দিল।
কি করছেন আনিস ভাই?
তেমন কিছু না। এস ভেতরে।
শাহানা ভেতরে ঢুকল না। আনিস হাসিমুখে বলল, নতুন একটা চাইনীজ টিক, শিখেছি দেখবো?
না।
শাহানা দরজার সামনে থেকে সরে এল। আনিস বেরিয়ে এল সঙ্গে সঙ্গে।
এই যে শাহানা, তাকাও এদিকে? কি আছে হাতে? আহ, চুপ করে আছ কেন, বাল।
কিছু নেই।
গুড। এই দেখি হাত বন্ধ করলাম।
আনিস মুঠি খুলল। চমৎকার একটি গোলাপ তার হাতে। শাহানা রাগী গলায় বলল, আবার আপনি আমাদের টবের গোলাপ ছিঁড়েছেন?
গোলাপ ছিঁড়েছি কি না-ছিঁড়েছি সেটা পরে, আগে বল ম্যাজিকটা কেমন?
এই ম্যাজিকটা শেখার পর আপনি আমাদের টবের সবগুলি গোলাপ নষ্ট করেছেন। এটা ছিঁড়েছেন আজ সকালে কেমন মানুষ আপনি, বলেন তো।
আচ্ছা যাও, আর ছিঁড়ব না। কথা দিচ্ছি।
গোলাপ কি আর আছে যে ছিড়বেন? সবই তো শেষ করে ফেলেছেন। আপনার একটু মায়াও লাগে না, না?
আনিস লজ্জা পেয়ে গেল। গোলাপ গাছগুলি শাহানার খুব প্রিয়। সব তুলে ফেলা ঠিক হয় নি। শাহানার যারাগ! পড়তে সময় লাগবে। আনিস মৃদুস্বরে বলল, গোলাপটা নাও শাহানা।
আমার দরকার নেই।
টুনী হাত বাড়াল। শাহানা তাকে একটা ধমক দিল। কড়া গলায় বলল, এদিকে আয়, নিতে হবে না। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে মনোয়ারা ডাকছেন শাহানাকে। শাহানা আষাঢ়ের আকাশের মতো মুখ করে নিচে নেমে গেল।
আনিস গোলাপ নিয়ে প্রাকটিস চালাল খানিকক্ষণ। ফুলটা প্রকাণ্ড। একে ঠিকমতো পাম করা মুশকিল। কিন্তু প্রাকটিসের একটা মূল্য আছে। হাত অভ্যস্ত হয়ে আসছে। এখন সে অনায়াসে ফুলটি লুকিয়ে রাখতে পারে। গোলাপ তৈরির ম্যাজিকে সে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ হতে চায়। যেখানেই সে হাত দেবে, সেখানেই তৈরি হবে একটি রক্ত গোলাপ।
দশটার মতো বাজে। আনিসের তেমন কিছু করার নেই। শরাফ আলির কাছে গেলে কেমন হয়? ফুলের এই ম্যাজিকটি শরাফ আলির কাছ থেকে শেখা। তাকে অবশ্যি কখনোই পাওয়া যায় না। তাকে ধরার একমাত্র কৌশল হচ্ছে বারবার যাওয়া। কিন্তু শরাফ আলি যে জায়গায় থাকে, সেখানে বারবার যাওয়া সম্ভব নয়, এবং যাওয়া ঠিকও নয়।
প্রথম বার গিয়েছিল বদরুলের সঙ্গে। নওয়াবপুর রোডের এক গলিতে বদরুল ঢুকে পড়ল। নর্দমার পাশ দিয়ে যাবার রাস্তা। পচা গন্ধে গা গোলাতে শুরু করল। গলির ভেতর তস্য গলি। নবাবী আমলের বাড়িঘর সেদিকে। যে-কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ার কথা, কিন্তু ভেঙে পড়ছে না। অধিকাংশ বাড়িরই দরজা-জানালা নেই। মোটা চট ঝলছে। দিনের বেলাতেও কেমন অন্ধকার অন্ধকার ভাব।
আনিস ঘাবড়ে গিয়ে বলল, কোথায় নিয়ে এলেন বদরুল ভাই?
আসল জায়গা।
আসল জায়গা মানে?
সন্ধ্যা না হলে বুঝবে না। ঢাকা শহরের এটা খুব-একটা খান্দানী অঞ্চল।
তারা একটি দোতলা জরাজীর্ণ লাল ইটের দালানের সামনে দাঁড়াল। বদরুল গলা উঁচিয়ে ডাকতে লাগল, শরাফ আলি ভাই আছেন? শরাফ আলি ভাই। কেউ কোনো সাড়া দিল না। বদরুল নিচু গলায় বলল, পামিংয়ের আসল লোক। ওস্তাদ আদমি। তবে শালা মারাত্মক খচ্চর।
বহু ডাকাডাকির পর নীল লুঙ্গি পরা বড়োমতো এক জন লোক বেরিয়ে এল। কাঁচা ঘুম থেকে উঠে এসেছে। তাকাচ্ছে চোখ লাল করে। বদরুল দাঁত বের করে বলল, শরাফ ভাই, ভালো আছেন?
হুঁ।
ঘুমাচ্ছিলেন নাকি?
হুঁ।
আনিসকে নিয়ে এলাম। আপনার কাছে। বলেছিলাম তো তার কথা আপনাকে। খুব বড়ো ঘরের ছেলে। আপনার কাছ থেকে দু-একটা কৌশল শিখতে চায়। সাধ্যমতো টাকা পয়সা খরচ করবে। কয়েকটা পামিং যদি
আরেক দিন আসেন।
আপনাকে তো শরাফ ভাই পাওয়া যায় না। এসেছি। যখন একটু বসি, আলাপ-পরিচয় হোক।
আরেক দিন আসেন। সাইল ভালো না।
শরাফ আলি দ্বিতীয় কোনো কথার সুযোগ না দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। বদরুল আরো খানিকক্ষণ ডাকাডাকি করল, কিন্তু লাত হল না। শরাফ আলির সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়।
ফেরবার পথে বদরুল বলল, এই লোক অনেক কিছু জানে। ম্যাজিক শিখতে হলে এর সঙ্গে লেগে থাকতে হবে। জায়গাটা খারাপ। তোমাকে ঘন ঘন। এখানে আনা ঠিক না, তবে গরজটা যখন তোমার।
লোকটা কেমন?
শরাফ মিয়ার কথা বলছ? এই শ্রেণীর লোক যতটা ভালো হতে পারে ততটাই। বেশিও না, কমও না।
শরাফ মিয়াকে আনিসের মনে ধরল। অসাধারণ পামিং জানে লোকটা। চোখের পলকে সিগারেটের প্যাকেট লুকিয়ে ফেলল। হাত উন্টে পান্টে দেখাল, হাতে সিগারেটের প্যাকেট নেই। কিন্তু হাতেই আছে-দর্শকের চোখে পড়ছে না। অপূর্ব কৌশল্য! আনিসের বিস্ময়ের সীমা রইল না। সে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার পক্ষে কি শেখা সম্ভব?
