কিন্তু তবু সঙ্গে যেতে হল। কবির মামা নিউ মার্কেটে বাস থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলেন। রফিক গম্ভীর গলায় বলল, চাঁদা তোলার ব্যাপারটা কি মামা হেটে হেটে করা হবে?
হ্যাঁ। আপত্তি আছে?
আছে।
তোর জন্যে মোটরগাড়ি লাগবে?
পেলে ভালো হত, আপাতত একটা রিকশা হলেই চলবে।
টাকা যেটা উঠবে, সেটা তো রিক্সা ভাড়াতেই চলে যাবে।
রিক্সা ভাড়া আমি দেব।
তুই দিবি কোত্থেকে? তুই তো এখনো সিন্দাবাদের ভূতের মতো ভাইয়ের ঘাড়ে বসে আছিস।
সেটা নিয়ে এখন কোনো আগুমেন্টে যেতে চাই না। শুধু এইটুকু অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, হাঁটাহাঁটি সম্ভব না।
যা, তুই চলে যা আমি একাই পারব।
রফিক গেল না! মুখ আমশি করে আসতে লাগল পাশাপাশি। আল সাহেবকে বাসায় পাওয়া গেল। ভদ্রলোক স্যারকে দেখে যো-পরিমাণে উৎসাহিত হলেন, স্যারের নীলগঞ্জ প্রজেকটের কথা শুনে ঠিক সে-পরিমাণ নিরুৎসাহিত হয়ে পড়লেন।
আপনি একা কতটুকু করবেন স্যার?
একা কোথায়? তোমরা সবাই আছ আমার সঙ্গে। আছ না? তাছাড়া পৃথিবীর অনেক বড়ো বড়ো কাজ একা একাই করা হয়েছে।
বহু টাকা পয়সার ব্যাপার স্যার।
টাকাপয়সার ব্যাপার তো আছেই। তুমি কত দেবে বল? কবির মামা খাতা খুলে ফেললেন।
তোমাকে দিয়েই শুরু।
ভদ্রলোক শুকনো গলায় বললেন, মাসের প্রথম দিক ছাড়া তো স্যার আমার পক্ষে সম্ভব না। ইউনিভার্সিটির মাস্টারদের মাসের প্রথম দিকে কিছু টাকা পয়সা থাকে, তারপর নুন নাই পান্তাও নাই অবস্থা।
মাসের প্রথম দিকে আসব?
আপনার আসার স্যার দরকার নেই। ঠিকানা রেখে যান। আমি কিছু পাঠিয়ে দেব।
তোমার কথাবার্তা শুনে কিন্তু মনে হচ্ছে না তুমি পাঠাবে। মনে হচ্ছে তুমি চেষ্টা করছি আমাকে বিদায় করতে।
মুকসুদ আলি সাহেবের চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। রফিক দারুণ অস্বস্তিবোধ করল। কবির মামার কথাবার্তার কোনো মাত্রা নেই। যা মনে আসছে বলে ফেলছেন। এই যুগে মনের কথা সব সময় বলা যায় না। চেপে রাখতে হয়।
মুকসুদ, আমি উঠলাম। মাসের প্রথম দিকে আবার আসব। আমি হচ্ছি। কচ্ছপ, যেটা কামড়ে ধরি, সেটা ছাড়ি না। ইউনিভার্সিটির মাস্টারদের মধ্যে আমার আর কোনো ছাত্র আছে?
ঠিক বলতে পারলাম না।
একটু খোঁজ করবে। আর শোন, বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে আমার প্রজেকটের কথা বলবে। সবাই তো আর তোমার মতো না। কেউ কেউ উৎসাহিত হবে।
আমি বলব।
নীলক্ষেত থেকে কবির মামা গেলেন মতিঝিলে। তিন-চার জন ছাত্রের নাম-ঠিকানা আছে। তাদের মধ্যে এক জনকে শুধু পাওয়া গেল। সেই ছাত্র স্যারকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। স্যারের কথাবার্তা শুনে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। আমতা-আমতা করে বলল, এত বড়ো কাজ কি স্যার প্রাইভেট সেকটরে হয়? সরকারি সাহায্য ছাড়া এটা সম্ভব না।
প্রথমেই যদি তুমি ধরে নাও সম্ভব না, তাহলে আর সম্ভব হবে কীভাবে?
আবেগতাড়িত হয়ে স্যার অনেকে অনেক প্রোগ্রাম নেয়। সোনার বাং করতে চায়। তা কি আর হয়?
হবে না কেন?
ছাত্রটি মৃদুস্বরে বলল, চা খান স্যার। আপনি রেগে যাচ্ছেন।
তুমি বেকুবের মতো কথা বলবে, আমি রাগতেও পারব না।
আমি স্যার প্র্যাকটিক্যাল প্রবলেমগুলির দিকে আপনার দৃষ্টি ফেরাতে চাচ্ছি।
কাজে নামার আগেই তুমি প্রবলেমের কথা ভাবতে শুরু করেছ? আমার ছাত্র থাকাকালীন তো তুমি এতটা বোকা ছিলে না! সেই সময় তো তোমার কিছু বুদ্ধিসুদ্ধি ছিল।
রফিক, কবির মামার কথাবার্তায় স্তম্ভিত। বলে কী এ লোক! ছাত্রটি অবশ্যি মোটামুটি ভদ্র ব্যবহারই করল। চা কেক—টেক আনিয়ে খাওয়াল এবং ফিরে আসার সময় পাঁচ শ টাকার দুটি চকচকে নোট দিল। এটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। রফিক ধরেই নিয়েছিল, এই লোকের কাছ থেকে কিছু পাওয়া যাবে না। মুখ শুকনো করে বলবে, পরে এক দিন আসুন, দেখি কিছু করা যায়। কিনা।
সে-সব না বলে বলল, সামনের মাসে আসেন এক বার, দেখি আর কিছু করা যায় কিনা।
করা যায় কিনা বললে তো হবে না। করতেই হবে।
রাস্তায় নেমেই রফিক বলল, চল মামা, বাড়ি যাওয়া যাক। এক দিনে তো রোজগার ভালোই হল।
কবির মামা চোখ কপালে তুলে বললেন, এখনই বাড়ি যাবি কী!
আরো ঘুরবে?
ঘুরব না মানে? কাজটা সহজ ভাবছিস তুই?
আগামীকাল থেকে নতুন উদ্যমে শুরু করলে কেমন হয়?
তোর কাজ থাকলে তুই চলে যা।
দুপুর হয়ে গেছে, খাওয়াদাওয়া করবে না? তাছাড়া এখন লাঞ্চ টাইম, কাউকে পাবে না। তারচে চল খানাপিনা করা যাক।
কোথায় খাবি?
সস্তার একটা হোটেল আছে সেগুনবাগানে, সেখানে যেতে পারি। কিংবা তুমি চাইলে ভাবীর অফিসে গিয়েও খেতে পারি। ভাল ক্যান্টিন আছে।
চল যাই সেখানে।
তবে মামা সেখানে না যাওয়াই ভালো।
কেন?
আমি তো বলতে গেলে রোজ দুপুরে খাচ্ছি। সেখানে। এখন তোমাকে নিয়ে গেলে অফিসের লোকজন ভাববে পুরো ফ্যামিলি এনে পার করে দিচ্ছে।
চল তাহলে, সেগুনবাগানের দিকেই যাই।
একটা রিকশা নেয়া যাক, কী বল?
নে একটা।
সেক্রেটারিয়েটের কাছে এসে রিকশা থেকে নেমে যেতে হল। মিছিল বের হয়েছে একটা। আকাশ ফাটানো গর্জন উঠছে, গণতন্ত্র চাই, গণতন্ত্র চাই! কবির মামা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, স্বাধীন দেশে গণতন্ত্রের জন্যে মিছিল বের করতে হচ্ছে, এরচে লজ্জার ব্যাপার আর কী হতে পারে?
রফিক কিছু বলল না। কবির মামা বললেন, মিছিলটা কাদের?
রফিক বিরক্ত হয়ে বলল, মানুষদের মিছিল, আবার কাদের? তুমি কি মামা মিছিলে ভিড়ে যাবে নাকি? খাবে না?
