নীলু অস্পষ্ট স্বরে বলল, এক দিন হয়তো বাড়ি হবে।
মনোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, হবেটা কী ভাবে? আকাশ থেকে টুপ করে একটা পড়বে নাকি? না তোমরা আলাউদ্দিনের চেরাগটেরাগ পেয়েছি? যাও, তোমার শ্বশুরকে জিজ্ঞেস করে এস তো, তিনি এখন দয়া করে। ভাত খাবেন। কিনা। না খেলে কখন ওনার মার্জি হবে?
মনোয়ারা আজ বিকাল থেকে হোসেন সাহেবের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। এ রকম তিনি প্রায়ই করেন এবং হোসেন সাহেব বড়োই কাবু হয়ে পড়েন। স্ত্রীর রাগ ভাঙানোর জন্যে সম্ভব-অসম্ভব নানা রকম কায়দা করেন। আজ কিছুই করছেন না। সন্ধ্যা থেকে চাদর গায়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন। ঘর অন্ধকার; বাতি জ্বালানো হয়নি।
নীলু মৃদুস্বরে ডাকল, বাবা।
হোসেন সাহেব উঠে বসলেন।
মা জিজ্ঞেস করেছেন, ভাত খাবেন কিনা।
খাব। বলে আসা, খাব।
মার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ নাকি?
হুঁ।
কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছে?
তেমন কিছু না। পেনশন তুলতে গিয়েছিলাম, তুলতে পারি নি। তাতেই তোমার মা গেছে ক্ষেপে। বললাম, কাল তুলব। এই ভিড়ের মধ্যে আমি বুড়ো মানুষ ধাক্কা-ধাব্ধি করতে পারি নাকি?
তা তো ঠিকই।
এই জিনিসটা তোমার শাশুড়িকে বোঝাব কীভাবে? অন্যদেরও যে শ্লেটো প্রবলেম হতে পারে, এটা সে বুঝবে না। কী মুশকিল বল তো দেখি।
হোসেন সাহেব চাদর গায়ে দিলেন। বাতি জ্বালিয়ে ঘড়ি দেখলেন। তাঁর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, তিনি কিছু বলবেন। নীলু তার শ্বশুরের এই ইতস্তত ভঙ্গিটি খুব ভালো চেনে।
কিছু বলবেন বাবা?
হুঁ। ছাদে চল তো মা আমার সঙ্গে। তোমার শাশুড়ি যেন আবার না দেখে। বড়ো সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত মহিলা, তিলকে তাল করবে।
তারা নিঃশব্দে ছাদে উঠে এল। হোসেন সাহেব নির্জন ছাদেও গলা নিচু করে তাঁর সমস্যার কথা বললেন। সেই সমস্যার কথা শুনে নীলুর মাথায় বাড়ি পড়ল।
হোসেন সাহেব পেনশন না তুলে ফিরে এসেছেন কথাটা ঠিক না। পেনশনের সাত শ এগারো টাকা তেত্রিশ পয়সা যথারীতি তুলেছেন। এবং একটা রিক্সা নিয়ে গিয়েছিলেন বায়তুল মুকাররমে এক পাউণ্ডের একটা ফুট কেক কেনবার জন্যে। ফুট কেকও ঠিকই কিনেছেন, দাম দিতে গিয়ে দেখেন পকেট ফাঁকা–একটা পয়সাও নেই। নীলু শুকনো গলায় বলল, ভালো করে পকেট দেখেছেন?
খুব কম হলেও দশ বার করে প্রতিটি পকেট দেখলাম। পকেটে টাকা না থাকলে টাকা পাওয়া যাবে না। এক বার খোঁজাও যা, এক শ বার খোঁজাও তা।
তা ঠিক।
এখন কী করি, তুমি বল বৌমা। কাল তো তোমার শাশুড়ি ঠেলোঁঠুলে আমাকে আবার পাঠাবে। পাঠাবে না?
হুঁ, পাঠাবেন।
চিন্তায় আমার খাওয়াদাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। কী করব, একটা বুদ্ধি দাও মা।
নীলু ক্ষীণস্বরে বলল, সত্যি কথাটা বললে কেমন হয় বাবা?
হোসেন সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, সত্যি কথা বললে উপায় আছে?
আমাকে টিকতে দেবে এ বাড়িতে? তুমি তোমার শাশুড়িকে কতটুকু চেন? আমি চিনি চল্লিশ বছর ধরে।
নীলু চুপ করে রইল। হোসেন সাহেব বললেন, তুমি বরং শফিককে আজ রাতে কথাটা বল। সে কাল সাত শ টাকা জোগাড় করে রাখুক। আমি তার অফিস থেকে নিয়ে আসব।
ঠিক আছে, বলব।
এইটাই হচ্ছে একমাত্র সমাধান। এর আর দ্বিতীয় কোনো সমাধান নেই।
হোসেন সাহেব হৃষ্টচিত্তে নিচে নেমে এলেন। তাঁর মনের মেঘ কেটে গেছে। খেতে বসে রান্নার খুব প্রশংসা করলেন। তাঁর কলেজ জীবনের দুএকটা মজার মজার গল্প বললেন। খাওয়াদাওয়ার পর বাড়িওয়ালার বাসায় রওনা হলেন। খানিকক্ষণ টিভি দেখবেন।
মনোয়ারা বিরক্ত হয়ে বললেন, লজ্জা লাগে না পরের বাড়িতে বসে টিভি দেখতে?
এর মধ্যে লজ্জার কী আছে?
রোজ রোজ অন্যের বাড়িতে গিয়ে বসে থাকার মধ্যে লজ্জার কিছু 6নাाग्ने?
না, কিছুই নেই। তাছাড়া ওরা আমাকে পছন্দ করে। বাড়িওয়ালার মেয়েটা আমাকে চাচাজান ডাকে। রশীদ সাহেবও আমাকে খুব খাতির করে।
বাজে বকবক করবে না। দুনিয়াসুদ্ধ লোক;তোমাকে খাতির করে। যা মনে আসে বলেই খালাস। আজ কোথাও যেতে পারবে না, বসে থাক q夺忆可!
বসে থেকে করবটা কী?
যা ইচ্ছা কর।
হোসেন সাহেব দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন, তবে খুব একটা বিচলিত হলেন না। মনোয়ারা কথা বলা শুরু করেছেন, এটা একটা সুলক্ষণ। তিনি তাঁর হোমিওপ্যাথি বই নিয়ে বসলেন। গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়তে শুরু করলেন। এক ফাঁকে নীলুর কাছ থেকে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে টেনে এলেন। তাঁকে দেখে মনে হল তিনি একজন সুখী পরিতৃপ্ত মানুষ। তাঁর কোনো দুঃখ-কষ্ট নেই। এই পৃথিবীতে বাস করতে পেরে তিনি আনন্দিত।
শাহানা লক্ষ করল, বই পড়তে পড়তে হোসেন সাহেব গুনগুন করে গান গাইছেন। গানের কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে না, তবে না গো না গো এই শব্দগুলি আছে। শাহানার বড়ো মজা লাগল। বাবার মনে এত ফুর্তি কেন কে জানে; মাঝে মাঝেই তাঁর মধ্যে এমন ফুর্তির ভাব আসে। শাহানা বলল, তোমাকে এত খুশি-খুশি লাগছে কেন বাবা? হোসেন সাহেব জবাব না। দিয়ে পা নাচাতে লাগলেন।
নীলু পেনশনের ব্যাপারটা কী করে বলবে বুঝতে পারছে না। আজকের দিনটিতে শফিককে কোনো খারাপ খবর দিতে ইচ্ছা করছে না। হঠাৎ করে বেচারা এক দিনের মধ্যে সাত শ টাকা জোগাড় করবে। কী ভাবে?
শফিক ঘুমুবার আয়োজন করছে। শেষ সিগারেটটি ধরিয়েছে। এখন সে খানিকক্ষণ পায়চারি করবে। নীলু হালকা গলায় বলল, আজ আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল——বন্যা নাম। শফিক কিছু বলল না। নীলু বলল, তোমাকে তো তার কথা বলেছিলাম, এক পুলিশ ইন্সপেকটরেব মেয়ে। খুব ছটফট করত। সারাক্ষণ কথা বলত। ক্লাসে ওর নাম ছিল ফর ফরানি! প্ৰায় ন বছর পর ওর সঙ্গে দেখা। অবিকল আগের মতোই আছে।
