নিতু আরো উঁচু করে আনে তার গলার স্বর, মনে হয় তার গলা থেকে বুঝি ঝলক দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসবে এক্ষুনি। সমস্ত প্রাঙ্গণ তার গমগমে তেজী গলার স্বরে কাঁপতে থাকে এবং হঠাৎ ঝনঝন শব্দ করে জানালার কাচ ভেঙ্গে পড়ল। মাঠে দাঁড়ানো শখানেক মেয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখল দোতালার জানালা থেকে কাচ ভেঙ্গে পড়ছে নিচে, খোরাসানী ম্যাডাম আর হোস্টেল সুপারের মাথায়।
বিকট আর্তনাদ করে দুজনে মাথায় হাত দিয়ে লাফ দিয়ে সরে যাবার চেষ্টা করল। হোস্টেল সুপারের পায়ের সাথে পা বেধে প্রায় আছাড় খেয়ে পৃড়তে কোনোভাবে নিজেকে সামনে নিল দুজনে কিন্তু মেয়েরা সেটি ভালো করেও লক্ষও করল না তারা অবাক বিস্ময়ে মিতুলের দিকে তাকিয়ে রইল। নিতু মিতুলের দিকে তাকিয়ে নিজের চোখের থেকে দুই ফোঁটা পানি মুছে হাত তালি দিতে শুরু করে, তার দেখাদেখি মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় শখানেক মেয়েও যোগ দেয়। এরকম অভূতপূর্ব দৃশ্য তারা তাদের জীবনে কখনো দেখে নি। খোরাসানী ম্যাডাম আর হোস্টেল সুপার রক্ত চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু তারা ক্ৰক্ষেপ করল না, হাত তালি দিয়ে যেতেই লাগলো সবাই মিলে।।
খোরাসানী ম্যাডাম আর হোস্টেল সুপার যখন নিজেদের ঘরে ফিরে গেল তখন তারা ছিল হেরে যাওয়া মানুষ। বাচ্চা দুটি মেয়ের কাছে আজ তারা হেরে গেছে।
০৭. নেংটি ইঁদুর
নিতুর হাতের তালুতে ছোট্ট একটা নেংটি ইঁদুরের বাচ্চা বসে দুই হাত দিয়ে এক টুকরা বিস্কুট ধরে কুট কুট করে খাচ্ছে। নিতু হাত দিয়ে হালকাভাবে ইঁদুর ছানাটার পিঠে আদর করে বলল, দেখে যা, ইঁদুরের বাচ্চাটা কী সুইট!
এই ঘরের ছয়জন উঁদুরের বাচ্চার ব্যাপারে দুই দলে ভাগ হয়ে আছে। নিতু রেবেকা আর তানিয়া মনে করে এই ছোট ইঁদুরের বাচ্চার মতো সুন্দর কিছু পৃথিবীতে সৃষ্টি হয় নি। রুনু ঝুনু আর মিতুল মনে করে একজন মানুষের পুরোপুরি মাথা খারাপ হলেই সে ইঁদুরের বাচ্চার সাথে মাখামাখি করতে পারে। কাজেই নিতু যখন তার হাতের তালুতে বসে থাকা ইঁদুরের বাচ্চাটা দেখে যাওয়ার জন্যে ডাকল তখন শুধুমাত্র রেবেকা আর তানিয়া উঠে এল। রেবেকা বলল, আমার হাতে একটু দিবি?
তানিয়া বলল তোর হাতে মনে হয় যাবে না।
কেন যাবে না?
ইঁদুরের বাচ্চাটার তো আগে চোখ ফোটে নি—যখন চোখ ফুটেছে তাকিয়ে দেখেছে নিতুকে, তাই এটা মনে করে নিতু হচ্ছে তার মা। এই জন্যে নিতুর সাথে এত খাতির।
আমি না হয় খালাই হলাম। খালার কাছে একটু আসতে পারে না?
দেখা গেল ইঁদুরের বাচ্চাটা খুব সহজেই মায়ের হাত থেকে খালার হাতে চলে গেল। শুধু চলেই গেল না, বিস্কুটটা খাওয়া শেষ করে নাক উঁচু করে গন্ধ শুকতে শুকতে সেটা হাত বেয়ে ওপরে উঠে গিয়ে রেবেকার কাপড়ের ভেতর ঢুকে গেল, বগলের পাশে দিয়ে নেমে পেটের উপর দিয়ে তিরতির করে হেঁটে নামতে থাকে আর রেবেকা কাতুকুতু লাগছে কাতুকুতু লাগছে— বলে হি হি করে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে থাকে।
রেবেকার হাসি শুনে মজা দেখার জন্যে রুনু ঝুনু আর মিতুলও এসে হাজির হল। ইঁদুরের বাচ্চাটা অবলীলায় রেবেকার শরীরের ভেতর দিয়ে তিরতির করে হেঁটে হেঁটে বের হয়ে এসে আবার নিতুর হাতে হাজির হল। সামনের দুই পা উপরে তুলে এটা পিছনের পায়ের উপর ভর দিয়ে বসে ইতিউতি তাকাচ্ছে। ইঁদুরের বাচ্চাটাকে দেখে এত বড় ইঁদুর, বিদ্বেষী রুনু ঝুনুও ফিক করে হেসে ফেলল। নিতু বলল, হাতে নিবি?
হ্যাক! খুঃ। বলেও ঝুনু অবশ্যি ইঁদুরের বাচ্চাটাকে আদর করে দেয়।
চোখ ফোটার কয়েক ঘণ্টার মাঝে অবশ্যি সবাই টের পেয়ে গেল একটা ইঁদুরের বাচ্চা মা হিসেবে একটা মানুষকে পেলে কী কী সমস্যা হতে পারে। যেহেতু বাচ্চাটা চোখ ফুটে নিতুকে মা হিসেবে আবিষ্কার করেছে কাজেই সেটি ধরে নিয়েছে মানুষ সম্প্রদায় মাত্রই তার শুভাকাক্তক্ষী। এটি যখন তখন শুধু যে নিতু রেবেকা বা তানিয়ার পা বেয়ে তাদের শরীরে উঠে পড়তে লাগল তাই নয়। সুযোগ পেলেই রুনুঝুনু কিংবা মিতুলের পা বেয়েও তাদের শরীরে উঠে পড়ার চেষ্টা করতে লাগল। নিতু, রেবেকা বা তানিয়া ব্যাপারটাকে একটা মজার ব্যাপার হিসেবে নিয়ে হেসে কুটি কুটি হয়। রুনু ঝুনু আর মিতুলের বেলায় অন্য ব্যাপার, তারা ভয়ে চিৎকার করতে শুরু করে, শরীর থেকে ঝেড়ে বাচ্চাটাকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। হোস্টেলে এরকম চিৎকার এবং চেঁচামেচি খুব ভয়ের ব্যাপার। খবরটা কোনোভাবে হোস্টেল সুপার কিংবা খোরাসানী ম্যাডাম পর্যন্ত পৌছে গেলে বড় বিপদ হতে পারে।
রাত্রে ঘুমানোর সময় ইঁদুরটি যেন ঘুমন্ত কারো শরীরে উঠে পড়তে না পারে সে জন্য নিতু সেটাকে একটা কার্ড বোর্ডের বাক্সে আটকে রাখল, রাতে খিদে পেলে খাবার জন্যে ভেতরে দুই টুকরা বিস্কুট, তৃষ্ণা পেলে খাওয়ার জন্যে ছোট একটা কৌটায় একটু পানি এবং ঘুমানোর জন্যে কম্বল হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে একটা রুমাল। নিতু মোটামুটি নিশ্চিত ছিল রাতটা কাটিয়ে দেওয়ার জন্যে যা যা প্রয়োজন সবই দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু গভীর রাতে প্রথমে রেবেকা এবং তারপর রুনু চিৎকার করে জেগে উঠে, ইঁদুরের বাচ্চাটি নাকি তাদের পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছে, বগলের কাছাকাছি একটা আরামদায়ক জায়গা বের করে সেখানে ঘুমানোর চেষ্টা করেছে। নিতু জেগে উঠে ইঁদুরের বাচ্চাটিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করল। সাধারণত একটা ইঁদুরের বাচ্চাকে খুঁজে বের করা খুব কঠিন, ঘরের নানা জিনিস পত্রের আড়ালে সেটি লুকিয়ে থাকতে পারে কিন্তু এই বাচ্চাটির কথা ভিন্ন, মানুষ থেকে যে লুকিয়ে থাকতে হয় সেটি এটা জানে না। তার ধারণা মানুষ হচ্ছে তার সবচেয়ে বড় বন্ধু এবং বিপদের সময় মানুষের কাছে ছুটে যেতে হয়। তাই ঘরের বাতি জ্বালানোর সাথে সাথে সেটি ঝুনুর মশারিতে কেটে করে রাখা ফুটোর ভিতর দিয়ে বের হয়ে লাফাতে লাফাতে নিতুর কাছে চলে এল এবং পা বেয়ে তার শরীরের উপর দিয়ে একেবারে ঘাড়ের কাছে হাজির হল। নিতু চাপা গলায় বলল, পাজী ছেলে। মানুষকে ঘুমের মাঝে এই ভাবে ডিস্টার্ব করে?
