নিতু আর মিতুল ভাবল তাদের শাস্তি বুঝি শেষ হয়েছে কিন্তু দেখা গেল সেটা শেষ হয় নি। খোরাসানী ম্যাডাম হুংকার দিয়ে বলল, সবাই ঘুম থেকে ওঠ।
ঘরে অন্য চারজন দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল, এবার তারা ফ্যাকাশে মুখে বিছানায় উঠে বসল।
খোরাসানী ম্যাডাম বলল, সবাই জুতা মোজা পর। পরে বাইরে আয়।
জুতো পরতে গিয়ে নিতুর মনে পড়ল সে তার জুতোর মাঝে চোখ না ফোটা ছোট নেংটি ইঁদুরের বাচ্চাটাকে রেখেছে। সে এখন জুতো পরবে কেমন করে? সে সাবধানে লুকিয়ে ভেতর থেকে ইঁদুরের বাচ্চাটাকে বের করার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না, কোনো একটা বিচিত্র কারণে খোরাসানী ম্যাডাম আর হোস্টেল সুপরি দুজনেই তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। নিতু কোনো উপায় না দেখে পা দিয়ে উঁদুরের বাচ্চাটাকে জুতোর সামনে ঠেলে দিয়ে জুতো পরে নিল। নেংটি ইঁদুরের বাচ্চাটা এত ছোট যে জুতোর সামনে ফাঁকা জায়গাটাতে বেশ আরামেই থাকতে পারবে, তবু নিতু পায়ের আঙুলগুলো ভাজ করে রাখল যেন তার কোনো অসুবিধে না হয়।
ছয়জন জুতো মোজা ঘরে রেডি হওয়ার পর খোরাসানী ম্যাডাম হুংকার দিল, কুইক মার্চ।
সবাই ঘর থেকে বের হয়ে আসে, নিতু আর মিতুল বের হল সবার শেষে কারণ খোরাসানী ম্যাডাম তাদের দুইজনের ঘাড় ধরে আলাদাভাবে টেনে টেনে বের করে আনল। তাদের কপালে আরো কিছু দুঃখ কষ্ট এবং অপমান রয়েছে এবং সেটা হবে মাঠে, সব মেয়েদের সামনে।
হোস্টেল থেকে মেয়েরা বের হয়ে মাঠে ইতস্ততঃ হাঁটাহাটি করছিল, খোরাসানী ম্যাডামকে এক হাতে নিতু অন্য হাতে মিতুলকে ধরে আনতে দেখে সবাই কেমন জানি ঠাণ্ডা মেরে গেল। খোরাসানী ম্যাডাম নিতু এবং মিতুলকে নিয়ে হোস্টেলের বারান্দায় দাঁড়াল এবং মাঠে দাঁড়ানো সব মেয়ে ভয়ার্ত মুখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের পিছনে হোস্টেল সুপার তার চিমশে মুখে আধা আধা একটা হাসি মাখিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে দেখে মনে হতে থাকে সে যেন খুব মজার একটি দৃশ্য দেখছে।
খোরাসানী ম্যাডাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা হুংকার দিল। এটেনশান।
মাঠের সবগুলি মেয়ে পা ঠুকে এটেনশান হয়ে দাঁড়াল। খোরাসানী ম্যাডাম গলা পরিষ্কার করে বলল, ইঁদুরের বাচ্চারা, এই যে দ্যাখছিস দুটি বদমাইস এদের একজন নাকি গায়িকা— এই পর্যন্ত বলে খোরাসানী ম্যাডাম মিতুলের ঘাড় ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে শূন্যে ঝুলিয়ে ফেলল। মিতুল সেভাবে হাত পা ছুঁড়তে থাকে তখন তাকে নামিয়ে এনে নিতুকে হ্যাচকা টান দিয়ে উপরে তুলে আনে।
অরি এটা হচ্ছে সেই গায়িকার সমঝদার। গান শুনে তার দিল ফানা ফানা হয়ে গেছে। শূন্যে ঝুলে থেকে নিতু তার হাত পা ছুঁড়তে থাকে তখন খোরাসানী ম্যাডাম তাকে নিচে নামিয়ে আনে। পুরো ব্যাপারটা দেখে হোস্টেল সুপার খিক খিক করে হাসতে থাকে, যেন সে টেলিভিশনে হাসির নাটক দেখছে।
খোরাসানী ম্যাডাম নিতু আর মিতুলের চুল ধরে দুজনের মাথা কাছাকাছি নিয়ে এসে নাক দিয়ে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে বলল, এখন এই দুইজন তোদের গান গেয়ে শোনাবে। যে গায়িকা সে গান গাবে, অন্যজন তাল ঠুকবে। খোরাসানী ম্যাডাম এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, রেডি-ওয়ান-টু-থ্রী কথা শেষ করেই সে দুজনের মাথা প্রচণ্ড জোরে ঠুকে দিল। নিতু অর মিতুল দুজনেই আর্ত চিৎকার করে উঠে, তাদের মনে হয় বুঝি মাথা ফেটে মগজ বের হয়ে এসেছে। দুজনেরই চোখ অন্ধকার হয়ে আসে এবং চোখের সামনে বিচিত্র রং, খেলা করতে থাকে—এটাকেই নিশ্চয়ই চোখে সর্ষে ফুল দেখা বলে!
খোরাসানী ম্যাডাম হুংকার দিল, শুরু কর ছাগলের বাচ্চারা।
মিতুল হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ দুটো মুছে নেয়। তারপর সামনে মাঠের দিকে তাকাল, সেখানে প্রায় শখানেক মেয়ে চুপ করে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। মিতুল নিতুর দিকে তাকাল, নিতুল চোখ নামিয়ে নিল সাথে সাথে। মিতুল তখন উপরের দিকে তাকাল এবং হঠাৎ করে সে চমকে উঠল। খোরাসানী ম্যাডাম যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার উপরে দোতলার জানালা, জানালা দুটি খোলা জানালার কাচ যদি কোনোভাবে ভেঙ্গে যায় সেই কাচ এসে পড়বে খোরাসানী ম্যাডাম আর হোস্টেল সুপারের মাথায়। গলায় সুর এনে মিল কাচের গ্লাস ভেঙ্গেছে, লাইট বা ভেঙ্গেছে, কখনো জানালার কাচ ভাঙ্গে নি। কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে তো ক্ষতি নেই। আজ সে চেষ্টা করে দেখবে।
খোরাসানী ম্যাডাম হুংকার দিয়ে বলল, শুরু কর মাকড়সার ডিম, গর্ধবের লেজ।
মিতুল শুরু করল। প্রথমে হালকাভাবে সে গলায় একটা সুরের ঝংকার তুলল, তার সমস্ত মনপ্রাণ ঢেলে দিল সেখানে। তার মিষ্টি গলার সুরে চারিদিক হঠাৎ যেন মায়াময় হয়ে উঠে, মনে হয় স্বর্গ থেকে বুঝি কোনো কিন্নরী এসে গান গাইছে। মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা শখানেক মেয়ে হতবাক হয়ে মিতুলের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারা বিশ্বাস করতে পারে না, এটা কী মানুষের গলার সুর না কী স্বপ্ন!
মিতুল তার গলার স্বর উঁচু করতে থাকে সাথে সাথে সে কাপন নিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করে দেয়। সে দেখতে চায় ঠিক কোন্ কম্পনে জানালার কাচ কাঁপিয়ে তুলতে পারবে। যে রকম অনুমান করেছিল ঠিক সে রকম নিচু একটা কাপনে জানালার কাচ থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। মিতুল একটি হাত তার কানের উপর নিয়ে এসে চোখ বন্ধ করে গলার স্বর উঁচু করতে থাকে, মনে হয় আকাশে বাতাসে বুঝি তার কণ্ঠস্বর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে আরো উঁচু করে তার গলার স্বর, সমস্ত স্কুল প্রাঙ্গন গম গম করে উঠে তার ভরাই গলার সুরে। আরো উঁচু করে তার কণ্ঠস্বর। তারপর আরো উঁচু, মিতুলের সমস্ত মুখ টকটকে লাল হয়ে ওঠে, মনে হয় নিশ্বাস আটকে সে বুঝি এই মুহূর্তে হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে যাবে, তবু সে নিরস্ত হয় না।
