নিতু ইঁদুরের বাচ্চাকে কার্ডবোর্ডের বাক্সে আটকে রেখে এবারে বাক্সটার ঢাকানাটি কয়েকটা ভারী বই দিয়ে চাপা দিয়ে রাখল যেন ভেতর থেকে বের হতে না পারে। বাকি রাতটুকু যেন সবাই শান্তিতে ঘুমুতে পারে।
শেষরাতের দিকে বিকট চিল্কার করে মিতুল তার বিছানা থেকে প্রায় হুড়মুড় করে নিচে এসে পড়ল, হোস্টেল সুপার কিংবা আশে পাশের রুমের মেয়েরা জেগে উঠেছে কী না সেটা চিন্তা করতে করতে নিতু প্রায় লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে আসে। অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে মিতুলের কাছে গিয়ে বলল, কী হয়েছে?
কী আবার হবে? মিতুল চাপা গলায় ফোঁস করে বলল, তোর পাজী ইঁদুরের বাচ্চা! কী সাহস আমার কানের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছে।
নিতু একটা নিশ্বাস ফেলল, এই ইঁদুরের বাচ্চা নিয়ে সত্যিই বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাবধানে উঠে লাইট জ্বালাতেই ইঁদুরের বাচ্চাটি মিতুলে বিছানা থেকে নেমে তির তির করে হেঁটে হেঁটে নিতুর কাছে হাজির হল। মিতুল এক ধরনের আতংক নিয়ে সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমি যদি আস্ত একটা থান ইট দিয়ে ইটার মাথা ঘেঁচে না দিই—
নিতু ইঁদুরের বাচ্চাটাকে হাতে তুলে নিয়ে ফিস ফিস করে বলল, ছিঃ! মিতুল হোস্টেল সুপারের মতো কথা বলিস না! ঘুমা গিয়ে। আমি দেখছি আর যেন এটা বের হতে না পারে।
কার্ডবোর্ডের বাক্সের কাছে গিয়ে দেখল ইঁদুরের বাচ্চাটা দাঁত দিয়ে কেটে প্রমাণ সাইজ একটা ফুটো করে বের হয়ে এসেছে। এইটুকু ছোট ইঁদুরের বাচ্চা এরকম ধারালো দাঁত হতে পারে কে জানত! নিতু আবার সেটাকে বাক্সে বুন্দি করে বই চাপা দেয়। দাঁত দিয়ে কেটে যেন বের হয়ে আসতে না পারে সেজন্যে পুরো বাক্সটা ঠেলে ঘরের এক কোনায় নিয়ে চারিদিকে বই খাতা দিয়ে ঢেকে দিল। তার পাঠ্যবই কেটে বের হয়ে এলে কী হবে সেটা নিয়ে এখন দুশ্চিন্তা করার সময় নেই।
ইঁদুরের বাচ্চাটি অবিশ্যি ভোর হওয়ার আগেই সেই দুর্ভেদ্য বাক্স থেকে বের হয়ে এল। ততক্ষণে সকাল হয়ে গেছে হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করে সবাই ক্লাশে যাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে তাই তাদের মাঝে উঁদুরের বাচ্চাটিও যে ছোটাছুটি করছে সেটি কারো চোখে পড়ল না।
রাতে ঘুমানোর সময় মিতুল এসে বলল, নিতু। আজ রাতে যদি তোর বাচ্চা আমার বিছানায় আসে আমি কিন্তু তার মাথা ছেচে ফেলব।
রুনু ঝুনু ও মাথা নাড়ল, বলল, কোনোদিন শুনেছিস ইঁদুরের বাচ্চা বিছানায় উঠে এসেছেঃ ছিঃ!
রেবেকা বলল, বাচ্চাটা দেখতে সুইট, তাই বলে বগলের তলায় ঘুমাবে? তানিয়া গম্ভীর হয়ে বলল, রোগ জীবাণুরও একটা ব্যাপার আছে।
নিতু দুর্বল ভাবে হেসে বলল, তোরা চিন্তা করিস না, আজ একটা পাকা ব্যবস্থা করছি।
কী করবি?
আমার একটা চকলেটের টিন আছে সেটার মাঝে আটকে রাখব, ওখান থেকে বের হতে পারবে না।
নিতু সত্যি সত্যি তার চকলেটের টিনের নিশ্বাস নেবার জন্যে কয়েকটা ফুটো করে ভিতরে ইঁদুরের বাচ্চার ঘুমানোর ব্যবস্থা করল। কয়েক টুকরো বিস্কুট, খাবার পানি ঘুমানোর জন্যে কম্বল, ধারালো দাঁত দিয়ে কাঁটাকুটি করার জন্যে কয়েকটা ভাঙা পেন্সিল, খেলার জন্যে একটা ছোট প্লাস্টিকের বল। রেবেকা মুচকি হেসে বলল, পড়ার জন্যে একটা গল্পের বই দিলি না? হাত মুখ ধোওয়ার জন্যে সাবান আর তোয়ালে?।
মিতুল হি হি করে হেসে বলল, দাঁত ব্রাস করার জন্যে টুথ ব্রাস?
নিতু বলল, ফাজলেমি করিস না। এইটুকুন একটা বাচ্চা একা একা থাকবে সারা রাত।।
গভীর রাতে নিতুর ঘুম ভেঙ্গে গেল। বিছানার নিচে রাখা চকলেটের টিনটাতে একটা শব্দ হচ্ছে। কুট কুট শব্দ, মনে হয় ইঁদুরের বাচ্চাটা বের হবার জন্যে চেষ্টা করছে। নিতুর ভাবল, আহা বেচারা, তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।
মাঝরাতে আবার নিতুর ঘুম ভেঙ্গে গেল, তখনো বিছানার নিচে চকলেটের টিনটাতে ইঁদুদেরর বাচ্চাটা কুটকুট করে শব্দ করছে। নিতুর এত মায়া লাগল যে বলার নয়। স্বাধীন একটা বাচ্চা, সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ানোর কথা অথচ একটা চকলেটের টিনে আটকা পড়ে আছে। যদি কোথাও কয়েক ঘণ্টার জন্যে ছেড়ে দিয়ে আসা যেত কী চমৎকারই না হতো। নিতু খানিকক্ষণ চিন্তা করে হঠাৎ চমকে উঠল, হোস্টেল সুপারের রুমে নিয়ে ছেড়ে দিলে কেমন হয়? হোস্টেল সুপার ইঁদুরকে যা ভয় পায় সেটি বলার মতো নয়, যখন নেংটি ইঁদুরের বাচ্চা তার মিশে যাওয়া নাকের ভিতরে কিংবা কামের ফুটো দিয়ে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করবে তখন যা একটা মজা হবে সেটি না দেখা পর্যন্ত বিশ্বাস করা যাবে । নিতু বিছানায় বসে একা একাই খিক খিক করে হাসতে থাকে।
পুরো ব্যাপারটা সে আরেকবার চিন্তা করে দেখল, এমন কিছু কঠিন নয় কাজটা। ঘুমানোর সময় হোস্টেল সুপারের বাশির মতো নাক ডাকে, কাজেই সে কি ঘুমিয়ে আছে না জেগে আছে বোঝা কঠিন নয়। যদি ঘুমিয়ে থাকে তাহলে জানালার ফাঁকে দিয়ে নেংটি ইঁদুরের বাচ্চাকে ছেড়ে দেবে, বাকিটুকু নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। ইঁদুরের বাচ্চাটা মানুষকে খুব ভালবাসে, সে ঠিক খুঁজে খুঁজে হোস্টেল সুপারের মশারি কেটে ভিতরে ঢুকে যাবে। তারপর যা একটা মজা হবে চিন্তা করে আবার নিতুর সবগুলি দাঁত বের হয়ে এল।
নিতু সাবধানে বিছানা থেকে নেমে আসে। চকলেটের টিনটা কোনো শব্দ না করে খুলতেই ইঁদুরের বাচ্চাটা দুটি ছোট ছোট লাফ দিয়ে নিতুর হাতে চলে এসে মুখ ঘষে আদর জানাতে থাকে। আবছা অন্ধকারে বাচ্চাটার পিঠে আঙুল বুলিয়ে সে একটু আদর করে উঠে দাঁড়ায়, সাবধানে দরজার কাছে গিয়ে ছিটকিনি খুলতেই খুট করে একটা শব্দ হল। মিতুলের ঘুম খুব হালকা সে সাথে সাথে জেগে উঠে বলল, কে?
